প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক :: একদিকে সংসদের দীর্ঘ বাজেট অধিবেশন, অন্যদিকে নানামুখী রাজনৈতিক কর্মসূচি সামাল দিতে গিয়ে রীতিমতো ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন সরকারের অধিকাংশ এমপি-মন্ত্রী। কখনো নিজস্ব চেম্বার, কখনো সচিবালয় কিংবা সংসদে ছোটাছুটি করতে হয়েছে। ফলে নিজ নির্বাচনি এলাকার মানুষ ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক ধরনের সাময়িক দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। তবে ২৬ কার্যদিবস ধরে চলা অধিবেশন গত বুধবার শেষ হওয়ার পরপরই গ্রামীণ জনপদের উদ্দেশ্যে রাজধানী ছাড়ার ধুম পড়ে এমপি-মন্ত্রীদের মধ্যে।
অনেকেই সড়ক, রেল কিংবা আকাশপথে নিজ নিজ এলাকার উদ্দেশে রওনা হন। কিছু এমপি-মন্ত্রী ও উপদেষ্টা সরকারি কাজে বিদেশ সফরেও রয়েছেন। জানা গেছে, আপাতত জাতীয় সংসদের কোনো অধিবেশন না থাকা এবং কেন্দ্রীয় দলীয় কর্মসূচির চাপ তুলনামূলক কম থাকায় নিজ নির্বাচনি এলাকার দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন তারা। তারা স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে এলাকায় গিয়ে সরাসরি যুক্ত হচ্ছেন নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে। সেইসঙ্গে বন্যার্তদের সহায়তায় ত্রাণ নিয়ে ছুটে যাচ্ছেন সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায়। যেন নিজ নিজ এলাকার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের তদারকি এবং বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়াতে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন এমপি-মন্ত্রীরা। কেউ কেউ নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকেও সময় দিচ্ছেন এবং খোঁজখবর নিচ্ছেন, যা বেশ কয়েক মাস ঠিকমতো করতে পারেননি।
এদিকে এমপি-মন্ত্রীদের এলাকায় ফেরাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মাঝেও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন পর ঘরের মানুষকে কাছে পেয়ে খুশি সাধারণ ভোটাররাও। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশন শুরু হয় গত ৭ জুন, যা গত বুধবার (১৫ জুলাই) ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল অধিবেশন সমাপনী-সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ঘোষণা পাঠের মাধ্যমে সমাপ্তি ঘোষণা করেন। এর আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১১ জুন জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন।
এ অধিবেশনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট পাস হয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত বর্তমান বিএনপি সরকারের এটি প্রথম বাজেট। উল্লেখ্য, বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা ১৪ কার্যদিবসে মোট ৪৮ ঘণ্টা ৫১ মিনিট স্থায়ী হয়। এতে ৩১৬ জন সংসদ-সদস্য অংশ নেন। এ ছাড়া ১০টি বিল পাস হয়েছে। কার্যপ্রণালি-বিধির ৭১ বিধি অনুযায়ী ৭১৫টি নোটিশ পাওয়া যায়। এর মধ্যে ২৪টি গৃহীত হয় এবং ২২টি নোটিশের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ৭১(ক) বিধি অনুযায়ী ১২৫টি দুই মিনিটের নোটিশ আলোচিত হয়েছে। ১৩১ বিধি অনুযায়ী চারটি সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের ওপর আলোচনা ও নিষ্পত্তি হয়েছে। এ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর উত্তরদানের জন্য ২৭৮টি প্রশ্ন জমা পড়ে। এর মধ্যে ৩৫টি প্রশ্নের উত্তর টেবিলে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের জন্য ৫ হাজার ৩১টি প্রশ্ন জমা পড়ে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৪৭৪টি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে।
এ অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিসহ মোট ১১টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া কার্য উপদেষ্টা কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে এমপি-মন্ত্রীরা বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় জনপ্রতিনিধিদের বড় একটি অংশ ত্রাণ কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। এরই মধ্যে সরকারের পক্ষে বন্যাদুর্গত এলাকা ও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই সার্বক্ষণিক বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। বন্যাকবলিত মানুষের পাশে ত্রাণ নিয়ে সশরীরে যাচ্ছেন কোনো কোনো এমপি-মন্ত্রী।
শুধু তাই নয়, বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে সরকারি বরাদ্দের পাশাপাশি এমপি-মন্ত্রীরা তাদের নিজস্ব তহবিল থেকে চাল, ডাল, শুকনা খাবার, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট এবং জীবন রক্ষাকারী ওষুধ বিতরণ করছেন। অনেক স্থানে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে রান্না করা খাবার পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন ও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ সংস্কার এবং আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে তদারকি বাড়িয়েছেন তারা। বন্যার্তদের সহায়তার পাশাপাশি এলাকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের অগ্রগতি পরিদর্শন এবং স্থানীয় সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ শুনছেন এমপি-মন্ত্রীরা।
জানা গেছে, বন্যার পানিতে ভেঙে যাওয়া বাঁধ এবং গ্রামীণ রাস্তাঘাট সংস্কারের জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিচ্ছেন জনপ্রতিনিধি ও মন্ত্রীরা। শুধু নিজেরা সশরীরে উপস্থিত থাকাই নয়, এমপি-মন্ত্রীদের অনুসারী, স্থানীয় বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন। দুর্গম ও প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে নৌকা নিয়ে ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছেন তারা। আলাপকালে কয়েকজন এমপি-মন্ত্রী জানান, সাধারণত শুক্র ও শনিবার তারা নিজ নিজ এলাকায় সময় দিয়ে থাকেন; কিন্তু গত কয়েক মাস সরকারি কাজ, সংসদ অধিবেশনসহ বিভিন্ন কারণে ঠিকমতো যেতে পারেননি। আপাতত কিছুদিন রাজনৈতিক উত্তাপ ও সংসদীয় কর্মব্যস্ততা এড়িয়ে নিজ নিজ এলাকার উন্নয়ন ও মানুষের সুখ-দুঃখে অংশীদার হতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন সরকারের এমপি-মন্ত্রীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কয়েকদিন ধরেই নিজের নির্বাচনি এলাকায় বিভিন্ন সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন শরীয়তপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংদের হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু। পাশাপাশি সরেজমিনে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের তদারকি করছেন। মাঝেমধ্যে শিশু ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খোশগল্প ও সেলফি তুলে তাদের আনন্দ দিচ্ছেন মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু। কয়েক দিনে তিনি তার নির্বাচনি এলাকার বিভিন্ন স্থানে ছাগল ও রেইনকোট বিতরণ করেছেন। এ ছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশুদ্ধ পানির ফিল্টার স্থাপন, আত্মকর্মসংস্থানের লক্ষ্যে অটোরিকশা বিতরণ এবং কৃষি উপকরণ বিতরণ করেছেন। পাশাপাশি তিনি সাধারণ মানুষের নানারকম সমস্যার কথা শুনে সেগুলো সমাধানের আশ্বাস দিচ্ছেন।
দিনাজপুর-৬ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন কালবেলাকে বলেন, সাধারণত তিনি শুক্রবার ও শনিবার নিয়মিত এলাকায় সময় দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে মাঝেমধ্যে সেটি বিঘ্ন ঘটলে অন্যান্য দিন তিনি এলাকায় যান। এখন সংসদ অধিবেশন না থাকায় এলাকার মানুষকে তিনি আরও সময় দিতে পারবেন বলে জানান।
চট্টগ্রাম-৫ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন কালবেলাকে বলেন, এমনিতেই ঢাকায় বিভিন্ন কাজের ব্যস্ততা ছিল। তার ওপর ভারী বর্ষণ এবং উজানের ঢলে পার্বত্যাঞ্চলে ব্যাপক বন্যা দেখা দিয়েছে। আমি কালবিলম্ব না করে এলাকায় চলে এসেছি। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে নানামুখী সরকারি উদ্যোগের তদারকির পাশাপাশি ত্রাণ পৌঁছানোর কাজ অব্যাহত রেখেছি।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হলো, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনা। বন্যাদুর্গতদের পুনর্বাসনের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনঃনির্মাণ এবং কৃষি খাতের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে সরকার। এ ছাড়াও সরকার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত নারী উদ্যোক্তাদের এক মাসের ক্ষুদ্র ঋণের অর্থ (কিস্তি ও সুদের টাকা) মওকুফ করেছে এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় এটি আরও কয়েক মাস বাড়ানোর পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।
বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান ভুইয়া মিল্টন কালবেলাকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্প্রতি বন্যা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। তার নির্দেশনায় সরকারের উচ্চ পর্যায়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করছেন ও বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। আমি নিজেও চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে বন্যাকবলিত এলাকায় সাধ্যমতো ত্রাণ বিতরণ করেছি। কেননা, আমাদের প্রধানমন্ত্রী চান বাংলাদেশের ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও শ্রেণিসহ সব পেশার মানুষ সমান উন্নয়ন ও সমান অধিকার ভোগ করবে। পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির দেশ হিসেবে পরিচিতি পাবে। ত্রাণ বিতরণে বিত্তবানদেরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান মিল্টন ভুইয়া।
নেত্রকোনা-২ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডা. মো. আনোয়ারুল হক কালবেলাকে বলেন, ঢাকায় গত কয়েক মাস টানা সংসদ অধিবেশন ও অন্যান্য কাজের কারণে এলাকায় কম যাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও সময় দিতে পারেননি। এখন সংসদ অধিবেশন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি নির্বাচনি এলাকায় ছুটে গেছেন। সেখানে বিভিন্ন সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন। ময়মনসিংহে নিয়মিত রোগীও দেখছেন।
নরসিংদী-৫ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য প্রকৌশলী আশরাফ উদ্দিন বকুল কালবেলাকে বলেন, একজন জনপ্রতিধির নানারকম দায়িত্ব থাকে। গত কয়েক মাসে সেটি ঠিকমতো করতে পারিনি। এখন ঢাকায় দলীয় কাজ ও সংসদ অধিবেশন না থাকায় এলাকার মানুষের মাঝে সময় বেশি দিতে পারব। এরই মধ্যে যখনই সময় পেয়েছি বিভিন্ন স্থানে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা চাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি সত্যিকারের সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদীয় ব্যস্ততার বাইরে গিয়ে এভাবে সরাসরি জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া এবং দুর্যোগের সময় পাশে দাঁড়ানো জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্বেরই অংশ। এতে করে একদিকে যেমন গ্রামীণ পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক ভিত শক্ত হয়, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরকারের সরাসরি যোগাযোগের পথ সুগম হয়।
প্রবাস বাংলা ভয়েস/কানাডা/১৮ জুলাই ২০২৬/এএ





