বাংলানিউজসিএ ডেস্ক :: মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে দিতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে প্রত্যাবাসন বাধাগ্রস্ত করতে পাঁয়তারাসহ অপকর্মে লিপ্ত থাকার অভিযোগে ৪১টি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও) কার্যক্রম প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। অন্যদিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপও সৃষ্টি করতে চাচ্ছে সরকার। সেই লক্ষ্যে চীনের মধ্যস্থতায় চলতি মাসে মিয়ানমারের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকও অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশে আসা নতুন রাষ্ট্রদূত লি জিমিংয়ের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। এ সময় চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং জানান, তার দেশও চায় রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যাক। আর এক্ষেত্রে তারা ‘গঠনমূলক ভ‚মিকা’ রাখবে।
মানবিক কারণে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় দিয়ে অনেকটা নিজের বিপদ ডেকে আনে বাংলাদেশ। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার ফলে চরম বিপর্যয় ঘটেছে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানের পরিবেশের ওপর। বিলীন হয়ে গেছে পাহাড়ের লাখ লাখ বিঘা বন। বেড়েছে অপরাধ কর্মকাণ্ড। ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টাও করেছে তারা। ফলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাধ্য হয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে কথা বলে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা নেন। ইতোমধ্য দু’দফা ফিরিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েও ভেস্তে যাচ্ছে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া। সর্বশেষ গত ২৯ জুলাই ২য় দফায় ৬ হাজার পরিবারের ২৫ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করে বাংলাদেশ। এর মধ্যে ৩ হাজার ৪৫০ জনকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয় মিয়ানমান। সব প্রস্তুতি শেষে গত ২২ আগস্ট ১৫টি পরিবারকে ফিরিয়ে নেয়ার দিনক্ষণ ঠিক হয়। কিন্তু রোহিঙ্গারা ফিরে যায়নি। তারা নাগরিকত্ব, নিরাপত্তাসহ অন্তত চারটি শর্ত না মানলে কোনোভাবেই দেশে ফেরত যাবে না বলে সাফ জানিয়ে দেয়। এ জন্য মিয়ানমার সরকারের স্বেচ্ছাচারিতাকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা।
এরপর থেকে বিকল্প পথে হাঁটতে শুরু করে বাংলাদেশ। সহযোগিতা চাওয়া হয় চীনের। এতে সাড়াও দেয় তারা। বাংলাদেশে আসা নতুন রাষ্ট্রদূত লি জিমিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন। এ সময় চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং জানান, তার দেশও চায় রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যাক। এক্ষেত্রে তারা ‘গঠনমূলক ভ‚মিকা’ রাখার কথা জানায়। প্রত্যাবাসন শুরু করার জন্য ২৯ আগস্ট নোট ভারবালের মাধ্যমে নতুন প্রস্তাব পাঠায় চীন। সেখানে তারা জানায়, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠকের আয়োজন করবে। যেখানে বাংলাদেশ বৈঠক করতে রাজি হবে সেখানেই হবে ত্রিপক্ষীয় এই বৈঠক। তবে এখনো ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের দিনক্ষণ চ‚ড়ান্ত হয়নি। চলতি মাসেই এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র।
অন্যদিকে এর আগে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার একাধিক চুক্তি করেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে না পারার পর চীনের মধ্যস্থতায় নতুন উদ্যোগে সফলতার আশা করছে বাংলাদেশ। চীনের এ সম্পৃক্ততায় পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছেন বিশ্লেষকরা।এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, ভারত ও চীন রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে সেভাবে বাংলাদেশের পাশে আসেনি। বিশেষ করে চীন বড় দেশ, তাদের সমর্থন আমাদের দরকার। কারণ দেশটি নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। চীনকে পাশে পাওয়া গেলে, নিরাপত্তা পরিষদে যদি সর্বসম্মত কোনো সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে পরিস্থিতি পাল্টে যাবে।
রোহিঙ্গারা যেসব দেশে অবস্থান করছে, সে সব দেশকেও পাশে টানার পরামর্শ দিয়েছেন এ বিশ্লেষক। তিনি বলেন, ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, আমেরিকা, জাপানসহ ১৮-১৯টি দেশে বর্তমানে রোহিঙ্গারা অবস্থান করছে। সঙ্কট সমাধানে তাদেরও এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে। তাহলে রোহিঙ্গা সঙ্কট তখন শুধু বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তখন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার সিরিয়াস হতে বাধ্য হবে।
রোহিঙ্গা সঙ্কটের সবশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরে বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় ক‚টনীতিকদের ব্রিফ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন। এ সময় চলমান সঙ্কট সমাধানে ক‚টনীতিকদের আরো জোরালো ভ‚মিকা রাখার আহŸান জানান তিনি।অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের জন্য এ পর্যন্ত বিদেশ থেকে ২ হাজার ৮শ’ কোটি টাকা পেয়েছে দেশি-বিদেশি ১৩৯টি এনজিও। তবে সম্প্রতি কয়েকটি এনজিওর বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাধা সৃষ্টির অভিযোগ ওঠে। এরপর থেকে এনজিওগুলোর কাজে কড়া নজরদারি শুরু করেছে সরকার। এতে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেয়ে থেকে ৪১টি এনজিওকে রোহিঙ্গা কার্যক্রম থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। শনিবার তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা ১৩৯টি এনজিওর মধ্যে অভিযোগের তালিকা করে তাদের প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ ছাড়াও যদি অন্য কোনো এনজিও বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যায়, তাদের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরো বলেন, ‘এখনো বিভিন্ন এনজিও একই কাজ করছে। সে ধরনের তথ্য প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। যদিও বিভিন্ন দেশি ও বিদেশি এনজিও নানাভাবে তদবির করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ার।
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন শুরু করে মিয়ানমার সেনরাবাহিনী। প্রাণ বাঁচাতে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। পুরনো ও নতুন মিলিয়ে এখন উখিয়া-টেকনাফের ৩০টি শিবিরে জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ১১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৫৭। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। জাতিগত নিধন ও গণহত্যার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়। এরপর গত বছরের নভেম্বর মাসে প্রথম দফা ও ২২ আগস্ট দ্বিতীয় দফা উদ্যোগ নিলেও রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে ব্যর্থ হয় মিয়ানমার।
বাংলানিউজসিএ/ঢাকা/ ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯/ এমএম





