Menu

ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৬০ হাজার!

বাংলানিউজসিএ ডেস্ক :: মশা নিধনে নানা কর্মকাণ্ডের মধ্যেও সারাদেশে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার ছুঁইছুঁই করছে। এর মধ্যে ৯৪ ডাক্তারসহ ৩০০ স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন। পাশাপাশি আরেক প্রাণঘাতী অ্যানোফিলিস মশার কামড় থেকে ছড়ানো ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে দেশের ১৩টি জেলার প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ মানুষ। আর স্যান্ডফ্লাই বা বেলেমাছির মাধ্যমে ২৬ জেলায় কালাজ্বরের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম এ তথ্য জানিয়েছে।

অধিদফতর সূত্র জানায়, বছরের শুরু থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৯ হাজার ৫৯২ জন। এর মধ্যে রোগীদের সেবায় নিয়োজিত ৯৪ ডাক্তারসহ ৩০০ স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছে। যাদের বেশি সংখ্যা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডাক্তার-নার্স। একক হিসেবে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী সামলানো এই সরকারি হাসপাতালের ২৫ জন ডাক্তারসহ ৬২ জন স্বাস্থ্যকর্মী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। বর্তমানে ডেঙ্গু আক্রান্ত ৬ জন ডাক্তার এবং ১২ জন নার্স রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এদিকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ৭৬১ জন, ঢাকার বাইরে ভর্তি হন ৮৩৬ জন। আগের দিন ঢাকায় ৭১১ এবং ঢাকার বাইরে ৯১৫ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ২৪ ঘণ্টায় এক হাজার ৫৯৭ জন মানুষ ডেঙ্গু নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৪৭ জনের মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। তবে বেসরকারি সূত্র থেকে অন্তত ১৭৪ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু ম্যালেরিয়া কিংবা কালাজ্বরের উপসর্গে অনেকটা মিল রয়েছে। এর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ম্যালেরিয়া কিংবা কালাজ্বরকেও ডেঙ্গু বলে প্রাথমিকভাবে চিকিৎসা দেয়া হলে তা রোগীর জন্য বিপদ বয়ে আনতে পারে। তাই ডেঙ্গু ম্যালেরিয়া ও কালাজ্বরের পৃথক চিকিৎসার বিষয়ে চিকিৎসকদের সতর্ক রাখা উচিত।বিগত বছরগুলোতে ডেঙ্গুর তুলনায় কালাজ্বরে আক্রান্তের সংখ্যাও ছিল বেশি। ফলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশি হলেও আগামী দুই মাস ডেঙ্গুর ঝুঁকির পাশাপাশি ম্যালেরিয়া ও কালাজ্বরের ঝুঁকির কথাও ভুললে চলবে না। কারণ দেশে বাহকবাহিত ভাইরাসের মধ্যে এই তিন রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার সব সময় বেশি হয়। ফলে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনার মধ্যে অন্য দুই রোগ নিয়ন্ত্রণে আগাম প্রস্তুতি না রাখলে পরে ডেঙ্গুর মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার কেন্দ্রীয় পর্যায়ের অন্যতম পরামর্শক অধ্যাপক ড. মাহামুদুর রহমান বলেন, ‘ডেঙ্গুর জন্য এখন পর্যন্ত আলাদা কোনো চিকিৎসা নেই, কিন্তু ম্যালেরিয়া ও কালাজ্বরের আলাদা চিকিৎসা আছে। চিকিৎসকদের সেই দক্ষতা থাকতে হবে যাতে তারা ডেঙ্গু নেগেটিভ হলেই বাসায় পাঠিয়ে না দিয়ে কালাজ্বর, ম্যালেরিয়াসহ অন্য কিছু রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুসারে দেশের রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, শেরপুর ও কুড়িগ্রাম এই ১৩টি জেলায় ম্যালেরিয়ার প্রকোপ রয়েছে বেশি। এই জেলাগুলোর মধ্যে তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি হচ্ছে দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তবর্তী পাহাড় ও বনাঞ্চলবেষ্টিত। ফলে এসব অঞ্চলে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেশি। দেশের মোট ম্যালেরিয়া রোগীর ৯১ শতাংশ ওই তিনটি অঞ্চলে।বান্দরবানের সিভিল সার্জন ডা. অং সু প্রæ বলেন, ‘গত বছরের চেয়ে এ বছর ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে। জুলাই মাসেই জেলায় তিন হাজারের বেশি মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। চলতি মাসে এ পর্যন্ত আরো প্রায় এক হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত আমার এখানে ম্যালেরিয়ায় কেউ মারা যাওয়ার খবর পাইনি।’

জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির অন্যতম বেসরকারি অংশীদার ব্র্যাকের পরিচালক ড. আকরামুল ইসলাম বলেন, ‘যে মৌসুমে আমাদের দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি থাকে ঠিক একই সময় দেশের ১৩টি জেলায় ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় প্রতিবছর। ফলে সেদিকেও আমাদের নজর রাখা জরুরি।’স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা বলেন, ‘ম্যালেরিয়া নির্মূলে আমাদের জাতীয় পর্যায়ের কর্মসূচি রয়েছে। সরকারের উদ্যোগে মশারি বিতরণ, রোগ নির্ণয়, মশা নিয়ন্ত্রণে কীটনাশক স্প্রে, বাড়ি বাড়ি পর্যবেক্ষণ, আক্রান্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থাসহ আরো কিছু কার্যক্রম চলছে।’

আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআরবি) ম্যালেরিয়া কার্যক্রমের গবেষক ওয়াসিফ আলী খান বলেন, ‘ম্যালেরিয়া নির্মূলে সরকারি ও বেসরকারি যেসব উদ্যোগ চলছে তা বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঠিকই আছে, তবে ভবিষ্যতের পরিস্থিতি নিয়ে আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুসারেই ঢাকাসংলগ্ন, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, ময়মনসিংহসহ দেশের ২৬টি জেলার ১০০টির বেশি উপজেলায় কালাজ্বরের ঝুঁকি রয়েছে। ২০১৭ সালের পূর্ববর্তী পাঁচ বছর ধরে প্রতিবছরই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যার তুলনায় কালাজ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি ছিল। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় ২০১৬ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ছিল ৪০০ জন আর কালাজ্বরে আক্রান্ত ছিল এক হাজারের বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের কালাজ্বর নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের ডিপিএম ডা. আবু নাঈম বলেন, ‘বাহকবাহিত রোগ এখন বেড়ে যাচ্ছে, তাই অন্যগুলোর মতো কালাজ্বরের দিকেও আমাদের গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। এবার এ পর্যন্ত কালাজ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা ১১৮ জন আর দুজনের মৃত্যুর তথ্য পেয়েছি।’অধ্যাপক ডা. বেনজীর আহম্মেদ বলেন, ‘এবারো ঢাকায়ই আমি কালাজ্বরের রোগী পেয়েছি। অবশ্য তার একজন এসেছে ধামরাই থেকে আরেকজন খুলনা থেকে। দুটি এলাকাই কালাজ্বরের ঝুঁকির আওতায় রয়েছে।’

বাংলানিউজসিএ/ঢাকা/ ২৩ আগস্ট ২০১৯ / এমএম


Array