বাংলানিউজসিএ ডেস্ক :: আহমেদ পারভেজ, ঢাকার একটি বেসরকারি ফার্মের কর্মকর্তা। ঈদের আনন্দ স্বজনদের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে যাবেন গ্রামের বাড়ি রংপুরে। তাই ৭ আগস্টের টিকিটের জন্য কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের কাউন্টারে দাঁড়িয়েছিলেন রোববার সন্ধ্যায়, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গতকাল সোমবার বেলা ১১টায় হাতে পেয়েছেন কাক্সিক্ষত টিকিট নামের সোনার হরিণ।
এতেই তিনি মহাখুশি। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়ানোর পর হাতে টিকিট পেয়ে ভুলে গেছেন ক্লান্তির কথা। শুধু আহমেদ পারভেজ নয়, নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার জন্য টিকিট কিনতে রীতিমতো যুদ্ধে নেমেছেন হাজারো মানুষ। দীর্ঘলাইনে কেউবা আগের দিন কেউ ভোর থেকে অপেক্ষা করছেন টিকিটের জন্য। বন্যার কারণে উত্তরাঞ্চলের সড়কগুলোর বিভিন্ন অংশে ভাঙন ও গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় ট্রেনে যেতেই আগ্রহ বেশি সবার। এজন্য রোববার বিকেল থেকেই টিকিট প্রত্যাশীরা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। তবে গত ঈদুল ফিতরের মতো এবারো অঞ্চল ভেদে ঢাকার পাঁচটি স্থান থেকে অগ্রিম টিকিট বিক্রি হচ্ছে। তাই টিকিট প্রত্যাশীদের ভোগান্তি অনেকটা কমেছে। এবার রাজশাহী, খুলনা ও রংপুর বিভাগের টিকিট কমলাপুর থেকে দেয়া হচ্ছে। বিমানবন্দর থেকে দেয়া হচ্ছে নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের টিকিট। তেজগাঁও থেকে দেয়া হচ্ছে ময়মনসিংহ জামালপুরগামী ট্রেনের টিকিট। বনানী থেকে দেয়া হচ্ছে নেত্রকোনাগামী ট্রেনের টিকিট এবং ফুলবাড়িয়া পুরাতন রেলভবন থেকে দেয়া হচ্ছে সিলেট ও কিশোরগঞ্জের টিকিট।
আরেক বেসরকারি চাকরিজীবী মামুনুর রশীদ বলেন, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঈদে খুলনা যাব। ৭ আগস্টের টিকিটের জন্য ভোর ৫টার পর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। পৌনে ১০টায় টিকিট পেলাম। এবার টিকিট পেতে কোনো সমস্যা হয়নি। ঈদে বাড়ি যাওয়া নিশ্চিত হলো খুব ভালো লাগছে। সুজন আহমদ নামের আরেক যাত্রী বলেন, রোববার সন্ধ্যায় লাইনে দাঁড়িয়েছি। এখানে অনেকেই লাইনে ছিল। আমরা নিজেরাই লাইন ঠিক করেছি। আমার সিরিয়াল ছিল ১১ নম্বর। দীর্ঘ ১৮ ঘণ্টা অপেক্ষার পর আজকে সকাল ১০টায় এসি টিকিট পেয়েছি। চারটা টিকিট কিনেছি। খুব ভালো লাগছে। এ প্রসঙ্গে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের ম্যানেজার মোহাম্মদ আমিনুল হক জানান, ঈদ উপলক্ষে আমাদের পর্যাপ্ত টিকিট রয়েছে। সুশৃঙ্খলভাবে টিকিট বিক্রি হচ্ছে। প্রতি যাত্রীকে চারটি করে টিকিট দেয়া হচ্ছে।
এদিকে গত ঈদুল ফিতরের মতো এবারো মোবাইল অ্যাপে টিকিট বিক্রি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। যাত্রীদের কেউ কেউ বলছেন সার্ভার সেøা। টিকিট কেনা যায় না। আবার কেউ কেউ সহজেই টিকিট পাওয়ার কথা বলছেন। যারা অ্যাপের মাধ্যমে টিকিট কাটার জন্য ঢু মেরেছিলেন তারা বলছেন, সকাল ৬টায় মোবাইল অ্যাপস চালুর পর ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেষ্টা করেছেন। কিন্তু টিকিট সংগ্রহ করতে বা কাটতে পারেননি অনেকেই। কমলাপুরে রেলওয়ের স্টেশনে কয়েকজন যাত্রী ভোগান্তির অভিযোগ করেন। নটরডেম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আশরাফ সিদ্দিকী অভিযোগ করেন, সকাল ৬টার দিকে মোবাইল অ্যাপের সার্ভারে প্রবেশ করেছেন কিন্তু টিকিট সংগ্রহ করতে পারেননি। এক সময় সার্ভার ডাউন দেখাচ্ছে তো আর এক সময়ে দেখাচ্ছে সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। মোবাইল অ্যাপে টিকিট না পেয়ে তিনি সকাল সাড়ে ৮টায় কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে এসেছেন। তার ধারণা, মোবাইল অ্যাপের যারা এডমিন তারা নিজেরাই টিকিট কেটে নিয়েছেন। আর এসব টিকিট কালোবাজারে বিক্রি করবেন। আশরাফ আরো বলেন, সকাল ৬টা থেকে যখন সাড়ে ৮টা পর্যন্ত টিকিট কাটতে চেষ্টা করছিলেন তখন দিনাজপুরগামী একটি ট্রেনের টিকিট তিনি অবিক্রীত অবস্থায় পেয়েছিলেন। সেটা তিনি কাটতে গিয়ে পারেননি। কারণ মোবাইলে বারবার লোডিং লোডিং দেখাচ্ছিল। আর একপর্যায়ে সেই টিকিটি বিক্রি হয়েছে বলে অ্যাপে দেখাচ্ছে। কাকলী দেব নামের শিক্ষার্থী চুয়াডাঙ্গায় যাবেন। তিনি বলেন, মোবাইল অ্যাপে গতবার ঈদের যে অভিজ্ঞতা হয়েছে সে ভোগান্তি এড়াতে তিনি আর সে পথ মাড়াননি। গত রোববার রাত সাড়ে আটটায় তিনি কমালপুরে এসেছেন। সোমবার সকাল ১১টায় তিনি টিকিট পেয়েছেন।
অন্যদিকে বেলা ১১টার দিকে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে আসেন রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন। তিনি যাত্রীদের কাছে টিকিট বিক্রি ও পরিস্থিতির খোঁজ-খবর নেন। এ সময় টিকিট প্রত্যাশীরা ‘সার্ভার ডাউন’, ‘লাইন এগোচ্ছে না’সহ নানান অভিযোগ তুলে ধরেন। এরপরই মন্ত্রী গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন।
অ্যাপসের ভোগান্তির বিষয় নিয়ে রেলমন্ত্রী বলেন, অবস্থা দেখে মনে হয়েছে গতবারের চেয়ে এবারের চিত্রটা কিছুটা উন্নত হয়েছে। তিনি সাংবাদিকদের জানান, অ্যাপে দিনে কত টিকিট বিক্রি হচ্ছে, তা মনিটর করে অ্যাপেই জানিয়ে দেয়া হচ্ছে। ফলে আপনি আগেই জেনে নিতে পারবেন আজ কিংবা যেদিন আপনি টিকিট কিনবেন, ওইদিন কতটি টিকিট খালি আছে। মোবাইল অ্যাপ এবং অনলাইনে প্রতিদিন ১০ হাজার ৭৭৪টি টিকিট বিক্রি হবে। এর মধ্য সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত মোবাইল অ্যাপে ৩ হাজার ৬৭৪টি টিকিট বিক্রি হয়েছে। আর অনলাইনে বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার ৭৮৯টি। এই দুই মিলে মোট টিকিট বিক্রি হয়েছে ৭ হাজার ৪৬৩টি। ৩ হাজার ৩১১টি টিকিট অবিক্রীত আছে। রেলপথমন্ত্রী জানান, কাউন্টারের মাধ্যমে ৩ হাজার ৩৭টি টিকিট বিক্রি হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, ঈদ শেষে ট্রেনে ঢাকায় ফেরার টিকিট বিক্রি শুরু হবে ৫ আগস্ট থেকে। চলবে ৯ আগস্ট পর্যন্ত। ৫ আগস্টে দেয়া হবে ১৪ আগস্টের ফিরতি টিকিট। আর ৬ আগস্ট ১৫ আগস্টের, ৭ আগস্ট ১৬ আগস্টের, ৮ আগস্ট ১৭ আগস্টের এবং ৯ আগস্ট ১৮ আগস্টের টিকিট দেয়া হবে।
মন্ত্রী বলেন, একজন সর্বোচ্চ চারটি টিকিট কিনতে পারবেন। জাতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়ে টিকিট নিতে হবে। তিনি জানান, ১১ ও ১৪ আগস্ট ঢাকা-কলকাতা-ঢাকা মৈত্রী এক্সপ্রেস চলাচল করবে না। রেলের শিডিউল বিপর্যয় প্রসঙ্গে রেলমন্ত্রী বলেন, এখন এক লাইন দিয়ে ট্রেন চলছে। যতদিন এক লাইন দিয়ে ট্রেন যাবে, আর আরেক লাইন দিয়ে ট্রেন আসবে, এমন ব্যবস্থা না হবে অর্থাৎ ডাবল লাইন না হওয়া পর্যন্ত শিডিউল বিপর্যয় বন্ধ করা যাবে না। ঈদের সময় রেলে ভ্রমণের জন্য ভিআইপি নিজে বা তার পরিবারের সদস্য ছাড়া অন্য কারো জন্য সুপারিশ করলে তা রাখা হবে না বলেও জানিয়েছেন রেলমন্ত্রী। মন্ত্রী আরো জানান, ঈদুল আজহা উপলক্ষে রেলওয়ের আট জোড়া বিশেষ ট্রেন চলাচল করবে। ঈদের ৫ দিন আগে থেকে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর কোনো সাপ্তাহিক বন্ধ থাকবে না।
এর আগে গত শুক্রবার সকাল থেকে শুরু হয়েছে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলগামী বাসের অগ্রিম টিকিট বিক্রি। ১২ আগস্ট সম্ভাব্য ঈদ ধরে বাসের অগ্রিম টিকিট বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ বাস ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। কাক্সিক্ষত টিকিটের জন্য যাত্রীরা ভিড় করছে বাস টিকিট বিক্রির কেন্দ্রগুলোতে। সংগ্রহ করছেন কাক্সিক্ষত টিকিট। সংগঠনটির চেয়ারম্যান রমেশ চন্দ্র ঘোষ জানান, খুলনা, বরিশালসহ উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলগামী বাসের অগ্রিম টিকিট গাবতলী এবং কল্যাণপুরের কাউন্টার থেকে পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি অনলাইনেও টিকিট পাওয়া যাচ্ছে।
রমেশ চন্দ ঘোষ জানান, এবারো বরাবরের মতো টিকিট বিক্রি হবে সরকার নির্ধারিত মূল্যে। টিকিট বিক্রি মনিটরিং করা হবে। কেউ যেন নির্ধারিত ভাড়ার বেশি নিতে না পারে, সেজন্য বাস কোম্পানিগুলোকে দূরত্ব অনুযায়ী ভাড়ার তালিকা টাঙিয়ে দিতে বলা হয়েছে। কেউ নির্ধারিত ভাড়ার বেশি নিলে প্রমাণ সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে।
বাংলানিউজসিএ/ঢাকা / ৩০ জুলাই ২০১৯/ এমএম





