Menu

প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক :: চীনের উহান থেকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯) ইতোমধ্যে ১২ লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা ৪ কোটি ৭৮ লাখ ৪৪ হাজার ছাড়িয়েছে। মহামারির শুরু থেকেই ভাইরাসটি বয়স্কদের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে মত দিয়েছিলেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ বয়স্কদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও নানান জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ফলে কোভিড-১৯ এর সঙ্গে লড়াই করা কঠিন।

এছাড়া নবজাতক বা শিশুদের ক্ষেত্রে ভাইরাসটি প্রাণঘাতী হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম মনে করছিলেন বিশেষজ্ঞরা। তবে বাংলাদেশের একটি সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, করোনাভাইরাস থেকে নবজাতকরাও নিরাপদ নয়। এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও রয়েছে। নবজাতকদের রক্ষায় নিরাপদ জন্মস্থান ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে বলা হচ্ছে।নবজাতকদের ওপর করোনাভাইরাসের প্রভাব নিয়ে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়।

গত বছরের শেষ দিন চীনে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর ২ ফেব্রুয়ারি চীনে নবজাতকদের মধ্যে প্রথম কোভিড-১৯ সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া যায়। পরে আনুমানিক আরও ৭০টি নবজাতকের মধ্যে মাঝারি থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া যায়। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ায় প্রায় চার কোটি ৩০ লাখ সংক্রমণ এবং প্রায় ৭৭ হাজার মৃত্যু ঘটলেও এই অঞ্চলে মাত্র দু’জন নবজাতকের সংক্রমণের তথ্য পাওয়া যায়।

তবে সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশেই ৮৩টি নবজাতকের নমুনা পরীক্ষা করে ২৬ জনের মধ্যে কোভিড-১৯ সংক্রমণ পাওয়া গেছে। সংক্রমিত নবজাতকদের ওপর কোভিড-১৯-এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব বিশ্লেষণের জন্য ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সে করা হয়েছে। একইসঙ্গে নবজাতকদের মায়েদের কোভিড-১৯ নমুনাও পরীক্ষা করে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

যৌথভাবে এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছে চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিএইচআরএফ) ও রাজধানীর শিশু হাসপাতাল। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ড. সমীর কুমার সাহা, অধ্যাপক ডা. মো. শহিদুল্লাহ, অণুজীব বিজ্ঞানী ডা. সেঁজুতি সাহা, শিশু হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. রিজওয়ানুল আহসান, ভাইরোলজিস্ট ডা. কিঙ্কর ঘোষ, ডা. এ এস এম নওশাদ উদ্দিন, প্রবীর কুমার সরকার, ডা. শেখ ওয়াসেকসহ আরও বেশ কয়েকজন গবেষক যুক্ত ছিলেন এই গবেষণায়।

গবেষণার অধীনে রাজধানীর শিশু হাসপাতালে ২৯ মার্চ থেকে ১ জুলাই পর্যন্ত যে নবজাতকরা চিকিৎসা নেওয়ার জন্য ভর্তি হয়েছিল, কোভিড-১৯ সংক্রমণ শনাক্তের জন্য তাদের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। ৮৩টি নবজাতকের নমুনা পরীক্ষা করে ২৬টির শরীরে কোভিড-১৯ সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া যায়। এদের সর্বোচ্চ বয়স ছিল আট দিন। এসব নবজাতককে কোভিড-১৯ সংক্রমণের আশঙ্কায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়নি। এদের মধ্যে ১১ জনকে নানারকম মারাত্মক অসংক্রামক রোগ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

সাত জনকে সেপসিসের শুরুর দিকে ভর্তি করা হয়, পাঁচ জনকে সেপসিসের শেষ ভাগে ভর্তি করা হয়। এছাড়াও দু’জনকে ভর্তি করা হয় নিউমোনিয়া থাকার কারণে। করোনা সংক্রমিত ২৩টি নবজাতকের মধ্যে ১২টি শারীরিকভাবে সুস্থ ছিল, আট জন মারা যায়, তিন জন এখনো চিকিৎসাধীন। যে আটটি নবজাতক মৃত্যুবরণ করে, তাদের মধ্যে দু’টির মৃত্যু হয় কোভিড-১৯ ভাইরাসের সংক্রমিত হওয়ার কারণে। বাকি ছয়টি নবজাতকের নানা ধরনের কো-মরবিডিটি ছিল।

ঢাকা শিশু হাসপাতালে পরবর্তী সময়ে তাদের চিকিৎসা বিষয় তথ্য-উপাত্ত এবং এক্সরে ও অন্যান্য ল্যাবরেটরি রিপোর্ট পর্যবেক্ষণ করা হয়। পরে জিনোম সিকোয়েন্সও করা হয়। এ ক্ষেত্রে রোগীদের ২৭ থেকে ৭৫ দিন পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা হয়। এ সময় নবজাতকদের অভিভাবক ও তাদের ৯ জন পরিচর্যাকারীর নমুনা পরীক্ষা করে আট জনের মাঝে কোভিড-১৯ সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে।

৮৩টি নবজাতকের ৩১ শতাংশ, অর্থাৎ ২৬ জনের মধ্যে কোভিড-১৯ সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া যায়। করোনা পজিটিভ নবজাতকদের মধ্যে ১২ জনের বয়স আট দিন (৪৭%) ও ১৪ জনের বয়স ছিল পাঁচ দিন। এই নবজাতকদের হাসপাতালে ভর্তি সময়ে গড় ওজন ছিল ২ দশমিক ৯ কেজি। ২৮ জুলাই পর্যন্ত কেস ফলোআপ করা হয়।

চারটি নবজাতক হাসপাতালে মারা যায়, বাকিদের জীবিত অবস্থায় ডেডিকেটেড হাসপাতালে রেফার করা হয়। এই ২২টি শিশুর মধ্যে ১২টি সুস্থ ছিল। তিনটি শিশুকে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দিতে হয়, চার জন মারা যায়। ২০ জন মায়ের সাক্ষাৎকার নিয়ে জানা যায়, তাদের মাঝে ছয় জনের কোভিড-১৯ উপসর্গ ছিল শিশু জন্মদানের আগে।

শিশু হাসপাতালের এপিডেমিওলজিস্ট ডা. কিঙ্কর ঘোষ বলেন, গবেষণাতে আসলে আমরা দেখেছি নবজাতকদের জন্য কোভিড-১৯ কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। কেবল নবজাতকরাই নয়, শিশুরা আসলে এই কোভিড-১৯ সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকছে সবসময়েই, যা এখন আর অস্বীকার করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে এই সংক্রমণ ঝুঁকি এড়ানোর জন্য করণীয় একটাই— যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সেন্ট্রাল ফর মেডিক্যাল বায়ো-টেকনোলজি বিভাগের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. মারুফুর রহমান অপু বলেন, গবেষকদের ধন্যবাদ, তারা শিশুদের ওপরে ভাইরাসটি কী ধরনের প্রভাব ফেলছে সেটি সামনে এনেছেন।

এই গবেষণা থেকে আমরা দু’টি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচ্ছি— শিশুরাও যথেষ্ট পরিমাণে আক্রান্ত হচ্ছে, যাদের অনেকেই সরাসরি করোনাভাইরাসের কারণে মারা যাচ্ছে। এছাড়া শিশুদের অনেকেরই ঝুকিপূর্ণ অন্যান্য রোগ রয়েছে, যেগুলো করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর মৃত্যুঝুঁকি বাড়াচ্ছে। সুতরাং শিশুদের সুরক্ষায় আমাদের বিশেষভাবে মনোযোগী হতে হবে।

চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (সিএইচআরএফ) নির্বাহী পরিচালক ড. সমীর কুমার সাহা বলেন, বাংলাদেশে নবজাতকদের মাঝে কোভিড-১১ সংক্রমণের এমন চিত্র পাওয়া যাবে, এমনটি আমরা চিন্তা করিনি। ধারণা করা হচ্ছিল, শিশু, বিশেষ করে নবজাতকদের (১ থেকে ২৮ দিন বয়স) মধ্যে করোনাভাইরাস সংক্রমণের সম্ভাবনা কম।

কিন্তু বর্তমানে আমরা বাচ্চাদের মধ্যেও প্রচুর পরিমাণে জটিলতা পাচ্ছি। তবে এটা নবজাতকদের মধ্যে অনেক কম হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে অবশ্য একটি বিষয় উল্লেখ করার মতো— যেসব নবজাতককে নিয়ে এই গবেষণাটি করা হয়েছে, তারা শিশু হাসপাতালে এসেছিল কিন্তু ভিন্ন কারণে।

তিনি বলেন, এই গবেষণার আওতায় যেসব নবজাতক ছিল, তাদের মধ্যে মাত্র দুই জনের শরীরে করোনার উপসর্গ ছিল। নবজাতকদের ক্ষেত্রে আমরা যদি খেয়াল করি, তাদের বয়স কিন্তু ছিল অল্প মাত্র কয়েকদিন। পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত এমন কিছু পাওয়া যায়নি যে ভার্টিক্যাল ট্রান্সমিশন হয়েছে। ভার্টিক্যাল ট্রান্সমিশন হচ্ছে এমন একটি বিষয়, যেখানে গর্ভবতী মায়ের কাছ থেকে সন্তানের প্রসবের মুহূর্তে বাচ্চার মাঝে সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকা।

এমন কোনো কিছু কিন্তু আমরা এখনো পাইনি। আমাদের দেশের বাইরেও এখন পর্যন্ত তেমন কেউ এই ভার্টিক্যাল ট্রান্সমিশন পায়নি। শিশু হাসপাতালে কিন্তু কোনো বাচ্চার ডেলিভারি হয়নি। তাই এ ক্ষেত্রে আমরা এই ভার্টিক্যাল ট্রান্সমিশনটি বোঝার বিষয়টি খুবই কম হয়ে ওঠে।

তিনি বলেন, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এমন অনেক স্থান আছে যেখানে সন্তান ডেলিভারির স্থান তেমন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে না। ডেলিভারি সময় সচেতনতার অভাবে কোভিড-১৯ বিষয়ক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা হয় না। এ কারণেও দেখা যাচ্ছে, বাচ্চাদের মধ্যে সংক্রমণটা আসছে।

ড. সমীর সাহা বলেন, আমরা কিন্তু এদের ক্ষেত্রে সিকোয়েন্সিংও করেছি। এ সময় আমরা দেখেছি যে হাসপাতালে আসার পরে তাদের একজন থেকে যে আরেকজনের মাঝে সংক্রমণ হয়েছে, তেমন কোনো বিষয় নেই। এক্ষেত্রে আমরা সব আলাদা সিকোয়েন্সিং পেয়েছি। এটা নিয়ে আরও বিস্তারিত কাজ করব আমরা।

আমরা নবজাতকদের মায়েদের কাছ থেকে ও নবজাতকদের যারা দেখাশোনা করেছে, তাদের নমুনা সংগ্রহ করেছি। সেক্ষেত্রে আমরা তাদের মাঝে কোভিড-১৯ সংক্রমণ পেয়েছি, কিন্তু তারা উপসর্গহীন ছিল। এক্ষেত্রে আমরা ধারণা করছি— মা যখন নবজাতককে নিয়ে আসছেন বা শিশুকে ক্যারি করছেন, তাদের কাছ থেকে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে বাচ্চার মধ্যে।

তিনি আরও বলেন, নবজাতকরা এমনিতেই অনেকটা ঝুঁকির মধ্যে থাকে সবসময়েই। কারণ অনেক সময় তাদের মাঝে উপসর্গ দেখা না গেলেও দেখা যায় তাদের সেলগুলো ভালোভাবে গ্রো করে না। এক্ষেত্রে ভাইরাসটা কী করছে, সেটা বিস্তারিতভাবে হয়তো আমরা ভবিষ্যতে জানার সুযোগ পাব। সুতরাং আমাদের সবাইকে সাবধানে থাকতে হবে। নবজাতকদের ক্ষেত্রে অবশ্যই নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রবাস বাংলা ভয়েস/ঢাকা/ ০৪ নভেম্বের ২০২০/এমএম


Array