বাংলানিউজসিএ ডেস্ক :: প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস রোধে গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও ঈদ করতে স্রোতের মতো গ্রামে ছুটতে শুরু করেছেন রাজধানীর বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ। যাত্রীবাহী বাস, লঞ্চ ও ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ করে দিলেও বিকল্প পথে হাজারো মানুষ বাড়ি ফিরছেন।কেউ খোলা ট্রাকে, কেউবা কুরিয়ার সার্ভিসের গাড়ি, আবার কেউ পণ্যবাহী পরিবহনে করে ঈদ করতে গ্রামে যাচ্ছেন। চেকপোস্টে পুলিশ তল্লাশি করলেও নানা বাহানা দেখিয়ে যাচ্ছে লোকজন। হাজারো মানুষ গ্রামে ফিরে যাওয়ার এই দৃশ্য অনেকটা ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরার মতো। সড়ক-মহাসড়কে ট্রাক-লরি ও পণ্যবাহী পরিবহনের দীর্ঘ জট।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা মহাসড়কে আটকে আছে তাদের বহনকারী যানগুলো। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ ও মধ্য অ লের মানুষ এসব যানবাহনে চড়ে বেশি গ্রামে যাচ্ছেন বলে জানা যায়। তাছাড়া গত কয়েকদিনে দেশের অনেক জায়গায় হোম কোয়ারেন্টাইনের শর্ত না মানায় বহু মানুষকে জরিমানা করা হয়েছে।এরপর সরকার বিদেশ ফেরতদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের খুঁজে বের করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু বিদেশ ফেরতরা ঠিকানা হিসেবে যেসব স্থানের নাম উল্লেখ করেছেন, সেখানে গিয়ে তাদের পাওয়া যায়নি। এরমধ্যে ছুটি পেয়ে ঢাকার রাজপথ পুরোপুরি ফাঁকা করে হাজারো মানুষ গ্রামে ফিরছেন। এতে তারা গ্রামকেও অনিরাপদ করে তুলছেন।
এখন গ্রামে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, যেভাবে গ্রামে মানুষ ফিরেছে, সেটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যেখানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হলো, সেখানে গাদাগাদি করে বিভিন্ন পরিবহনে মানুষ গ্রামে ফিরেছেন, সেটিতে আরো ঝুঁকি তৈরি হলো। এসব মানুষ গ্রামে গিয়ে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।এদিকে এতে করে গ্রামে করোনার ঝুঁকি বাড়ছে বলেও জানান সংশ্লিষ্টরা। যেসব ট্রাক রাতে রাজধানীতে সবজি ও মাছ নিয়ে আসে, সেই ফিরতি ট্রাকে করে গাদাগাদি করে গ্রামে যাচ্ছেন মানুষ। এ কারণে গ্রামের মানুষের মাঝেও আক্রান্তের ঝুঁকি বাড়ছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যারা রাজধানী ছাড়বেন তাদেরও হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লকডাউনের মধ্যেও মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের শিমুলিয়া ঘাটে গতকাল ফেরি পারাপারের অপেক্ষায় ছিল কমপক্ষে ৫০০ যান। এছাড়া যাত্রীর চাপ তো ছিলোই। এত গাড়ির চাপ সামলাতে হিমশিম ঘর্মাক্ত হতে হয়েছে ঘাট কর্তৃপক্ষকে। আরিচা ঘাটেও ছিল যাত্রীদের ভিড়।সিরাজগঞ্জের বাসিন্দা আব্দুল হকও ট্রাকে করে গ্রামে ফিরছিলেন। ঝুঁকি নিয়ে গ্রামে ফিরছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তার সোজাসাপ্টা জবাব, এই মৃত্যুপুরীতে (ঢাকা) থাকার চেয়ে ঝুঁকি নিয়ে গ্রামে ফেরাই ভালো। ৬০০ টাকা ভাড়ায় তিনি তাড়াশ যাচ্ছেন বলেও জানান। শুধু এ যুবক নয়, প্রতিনিয়ত অনেক মানুষ ঢাকা ছাড়ছেন এভাবে।
সরেজমিনে রাজধানীর গাবতলী, সায়েদাবাদ, মহাখালী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মোটরসাইকেল, পিকআপভ্যান ও অ্যাম্বুলেন্সে করে মানুষ ছুটছেন। ভেঙে ভেঙে আরিচা ঘাটে যাচ্ছেন কুষ্টিয়া, যশোর, মাগুরা, মেহেরপুরসহ খুলনা অ লের মানুষ। সেখান থেকে ঘাট পার হয়ে অন্য যানবাহনে গন্তব্যে ছুটছেন এসব লোকজন।আবার কেউ মোটরসাইকেলে করে সরাসরি চলে যাচ্ছেন। তবিবুল নামে এক তরুণ ছয়শ’ টাকা ভাড়ায় ঝিনাইদহে পিকআপভ্যানে বাড়ি ফিরছেন। গন্তব্য ভেদে এক হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া নিচ্ছে এসব যানবাহন। রহমান শিকদার নামে এক যাত্রী বলেন, তিনি আটশ’ টাকা ভাড়ায় মেহেরপুরের গাংনী যাচ্ছেন।
ঠিক একইভাবে অনেকে গুলিস্তান থেকে মাওয়া ঘাটে গেছেন পিকআপভ্যান, মোটরসাইকেল ও অ্যাম্বুলেন্সে করে। বিশেষ করে ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ ও বরিশাল অ লের মানুষ। ভাড়া গন্তব্য ভেদে ৪০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত।রাজধানীর আব্দুল্লাহপুর গিয়ে দেখা যায়, দূর-দূরান্তের যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করছেন মোটরসাইকেল চালকরা। সেখান থেকে রাজশাহী, নাটোর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা ও রংপুর বিভাগেও যাত্রী নিয়ে যাচ্ছে অনেকে। গন্তব্য ভেদে ভাড়া সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা পর্যন্ত। ট্রাকে বসা যাত্রী রফিক মিয়া ব্যবসা করেন।
চালকের সঙ্গে ৫০০ টাকার চুক্তি করে মানিকগঞ্জ যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ব্যবসার কাজে ঢাকা এসেছিলাম, বাড়িতে যাওয়া জরুরি তাই ট্রাকে যাচ্ছি। ঝুঁকি থাকলেও নিরুপায় হয়ে যাচ্ছেন বলেও জানান তিনি। ট্রাকচালক আজগর মিয়া বলেন, নাটোর থেকে কাঁচা সবজি নিয়ে ঢাকায় এসেছিলাম, ফেরার সময় মানুষ ভর্তি করে ফিরছি।বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের শিমুলিয়া ঘাটের উপমহাব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা জেনেছি যে পুলিশ অনেক গাড়ি ঢাকার দিকে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে। তারপরেও শিমুলিয়া ঘাটে গাড়ির অনেক চাপ। ১৩টি ফেরি নিয়েও যান পারাপারে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সাধারণত ঈদের সময় ঘাটে পুলিশের বিশেষ ব্যবস্থা থাকে। ঘাটে যাত্রীদের নিরাপত্তা ও সুষ্ঠুভাবে ফেরি পারের জন্য ৬০-৭০ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা দরকার। সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) নাজমুর রায়হান জানান, শুক্রবারের চেয়ে শনিবার ঘাট থেকে ঢাকার দিকে বেশি সংখ্যক গাড়ি ফেরত পাঠানো হচ্ছে। তারপরও ঘাটে গাড়ির জট।ট্রাফিক পুলিশ সদস্য কম হওয়ায় তাদের সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আগে ঈদের সময় অন্য জেলা থেকে রিজার্ভ পুলিশ এনে ঘাটে দেয়া হত। এবছর ঈদের সময় ঘাটে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন সম্ভব হবে কিনা তা এখনো বলতে পারছি না।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, করোনা ভাইরাস ইস্যুতে সরকারের সিদ্ধান্তগুলো অনেক বিলম্বে এসেছে। বিদেশফেরতদের কোয়ারেন্টাইনে রাখতে না পারা সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের চরম অবহেলা ও ব্যর্থতা।প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে সবাইকে যেহেতু রাখা যাবে না, সুতরাং তাদের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন ছিল। সেটিতেও ব্যর্থতার পরিচয় মিলেছে। এখন ঈদের এই সময়টাতে মানুষ ইচ্ছামতো গ্রামে ছুটছেন। যেন বাধা দেয়ার কেউ নেই।
গ্রামে যাওয়ার পথে এসব মানুষ অন্যদের সঙ্গে মিশেছেন, আবার গ্রামে ফিরেও পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদের সংস্পর্শে যাবেন। এভাবে কী করোনা পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব হবে? এখন গ্রামেও ঝুঁকি তৈরি হলো। তবে এখন জরুরি ভিত্তিতে গ্রামে ফেরা এসব মানুষের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করার তাগিদ দেন তিনি।বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন ও করোনা প্রতিরোধ জাতীয় কমিটির সমন্বয়ক অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, গ্রামে হাজারো মানুষ ফিরে যাওয়ার ঘটনা নিঃসন্দেহে আতঙ্কের। তবে এখন তাদের সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদফতর করোনা প্রতিরোধে যেসব নির্দেশনা দিয়েছে, সেগুলোর যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে। অর্থাৎ, বাড়িতে ফিরে নিজেকে অন্যদের কাছ থেকে দূরত্বে রাখতে হবে। তাদেরকে আলাদা কক্ষে অবস্থান করতে হবে। পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে নিজেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রাখুন। অন্তত ১৪ দিন বাইরে ঘোরাঘুরি করবেন না। এসব বিষয় না মানলে নিজের পাশাপাশি পরিবারের সদস্য মা-বাবা, ভাইবোন, স্ত্রী, ছেলেমেয়েসহ প্রতিবেশী সবার জন্য ঝুঁকি তৈরি হবে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, পুরো বিশ্বই করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে। আমরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। কিন্তু সরকারের একার পক্ষে সবকিছু সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষকে সরকারের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। যদি এসব নির্দেশনা মেনে না চলেন, তাহলে ঝুঁকি তৈরি হবে। সেটি সবাইকে বুঝতে হবে।
তিনি বলেন, সরকার সবাইকে রক্ষা করতে চায়। যেমন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশনা দেয়া হলো, কিন্তু অনেকে তা মানলেন না। এর মধ্য দিয়ে নিজের পাশাপাশি পরিবার, প্রতিবেশী ও দেশের মানুষকে ঝুঁকির মধ্যে ফেললেন। এরপর পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পাঠিয়ে খুঁজে বের করতে হচ্ছে। অনেককে জরিমানা করা হয়েছে। এটি সত্যিই দুঃখজনক। সবার প্রতি আহ্বান থাকবে, আপনারা প্রত্যেকে হোম কোয়ারেন্টাইনে শর্ত মেনে চলুন।
বাংলানিউজসিএ/ঢাকা/ ১৭ মে ২০২০/এমএম





