Menu

বাংলানিউজসিএ ডেস্ক :: প্রাণঘাতী নভেল করোনা ভাইরাস ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে পুরো বাংলাদেশে। ফলে ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে গণসংক্রমণ। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে আক্রান্তের তালিকা। মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন নাম। আগের দিনের রেকর্ড ভেঙে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে নতুন রেকর্ড। ঝুঁকির দিক থেকে সবচেয়ে কঠিন সময়ে এখন দেশ।এমন সংকটময় মুহূর্তে এসে অর্থনীতি ও গরিব মানুষের সংকট বিবেচনায় গত ১০ মে ও তার কিছুদিন আগে থেকে শিথিল করে দেয়া হয়েছে লকডাউন। একে একে খুলে দেয়া হয়েছে বন্ধ থাকা শিল্প-কারখানা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, হাটবাজার, বিপণীবিতান, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ নানা ব্যবসাকেন্দ্র।

দেদার চলছে হাটবাজার, শপিং আর ইফতার বেচাকেনা। প্রয়োজনের কথা বলে মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে পড়ছে। বাস ছাড়া সব গড়িই চলছে রাস্তায়। বেড়েছে জনসমাগম। সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি না মেনে কার্যক্রম পরিচালনা করায় পাল্লা দিয়ে বাড়ছে করোনার ঝুঁকিও। এই সময়ে প্রশাসনের তৎপরতাও নেই চোখে পড়ার মতো। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে করোনা ‘ঘনীভ‚ত মহামারীর’ দিকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলেন, অঘোষিত লকডাউনকে শিথিল করাতেই বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ভয়ানক হারে বেড়ে গেছে। এ কয়েক দিন যে হারে সংক্রমণ বাড়ছে, তা অব্যাহত থাকবে কি না, আগামী দুদিনের মধ্যেই তা বোঝা যাবে। তবে অবস্থার অবনতি হলে নিয়ন্ত্রণ করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। তাই স্বাস্থ্যবিধি এবং শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে সরকারকে কঠোর হওয়ার পরামর্শ তাদের।

বাংলাদেশে প্রথম তিনজন করোনা রোগী শনাক্ত করা হয় ৮ মার্চ। গতকাল বৃহস্পতিবার করোনা প্রাদুর্ভাবের ৬৭তম দিনে এসে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৮৬৩ জনের। এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে ২৮৩ জনের। আর সুস্থ হয়েছেন ৩ হাজার ৩৬১ জন।পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আক্রান্তের পর প্রথম এক মাস শেষে গত ৮ এপ্রিল যেখানে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২১৮ ও মৃত্যু ২০ জন, সেখানে এরপরের এক মাসে মোট আক্রান্ত বাড়ে ১৩ হাজার ৫৫২ ও মৃত্যু ১৯৪ জন। অর্থাৎ আক্রান্তদের ৯৮ শতাংশই শনাক্ত হয়েছে সংক্রমণের দ্বিতীয় মাসে। আক্রান্তের শীর্ষের দেশগুলোতেও প্রথম দুই মাসে মোট আক্রান্তদের ৯৮ শতাংশের বেশি শনাক্ত হয়েছিল দ্বিতীয় মাসে।

আক্রান্তের শীর্ষে থাকা দেশগুলোতেও সংক্রমণের তৃতীয় মাসে গিয়ে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে দেখা গেছে। বাংলাদেশেও রোগী বাড়ছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সংক্রমণের তৃতীয় মাসের প্রথম ৬ দিনে (৯ মে থেকে গতকাল ১৪ মে পর্যন্ত দেশে করোনায় আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে ৫ হাজার ৭২৯ জনকে। এ সময় মৃত্যু হয়েছে ৭৮ জনের।

এদিকে করোনা প্রাদুর্ভাবের শীর্ষে থাকা দেশগুলোর অনেক কিছুর সঙ্গেই সংক্রমণের মিল পাওয়া যাচ্ছে বাংলাদেশে। বিশেষ করে দুই শীর্ষ দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালিতে যেসব কারণে রোগটি বিস্তার লাভ করেছে, সেসব কারণের অধিকাংশ বাংলাদেশেও বিদ্যমান। সেসব দেশেও রোগটি নিয়ে প্রথমদিকে যেমন অবহেলা করা হয়েছে ও চিকিৎসা ব্যবস্থায় সংকট ছিল; বাংলাদেশেও একই কারণ লক্ষ করা যাচ্ছে।

তবে ব্যবধান রয়েছে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায়। সংক্রমণ-পরবর্তী শীর্ষ দেশগুলো যেভাবে লকডাউন মানতে মানুষকে বাধ্য করেছে এবং লকডাউন আরোপ ও শিথিল বৈজ্ঞানিকভাবে করা হচ্ছে, বাংলাদেশে তেমনটা হয়নি। বিশেষ করে আক্রান্তের শীর্ষে থাকা প্রথম পাঁচটি দেশে প্রথম দুই মাসে যে পরিমাণ আক্রান্ত ও মৃত্যু হয়েছে, ঠিক পরের মাসেই সে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে কয়েকশ গুণ বেশি।

তারপর লাফিয়ে দিয়ে বেড়েছে আক্রান্ত ও মৃত্যু নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল পরিস্থিতি। চার-পাঁচ দিন আগেও বাংলাদেশে করোনার বিস্তার ছিল সমতল। ধীরগতিতে বেড়েছে। কিন্তু গত চার-পাঁচ দিন হলো বৃদ্ধির যে হার, তা এখন আর সমতলে নেই। বরং লাফিয়ে বাড়ছে।যেভাবে সংক্রমণ বাড়ছে এটি আরো বাড়তে পারে ইঙ্গিত দিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, রোগটি একজন থেকে তিনজনে ছড়াচ্ছে। এছাড়া ভয়ের বিষয় হচ্ছে, ইদানীং কোনো উপসর্গ ছাড়াই রোগটি ছড়াচ্ছে। পরিস্থিতি যা দাঁড়াচ্ছে তাতে বোঝা যায়, রোগটি এখন রাইজিংয়ে আছে।

এ প্রসঙ্গে হেলথ অ্যান্ড হোপ স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক ডা. লেনিন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক নম্বর কৌশল হচ্ছে লকডাউন। কিন্তু বাংলাদেশে সরাসরি লকডাউন ঘোষণা না করে তেমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে। এর পরও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকার লেজেগোবরে অবস্থা করে ফেলেছে।

তিনি আরো বলেন, মূলত যে উদ্দেশ্যে লকডাউন করা হয়েছিল, তা বাস্তবে কার্যকর হচ্ছিল না। যার ফলে করোনার সংক্রমণ ক্রমাগত বাড়ছিল। হঠাৎ করে আমাদের নীতিনির্ধারকরা গাড়ির স্টিয়ারিং ভিন্ন-পথে ঘুরিয়ে দিল। অর্থাৎ যেভাবে লকডাউন পালন এবং শিথিল হওয়ার কথা, সে পথে না গিয়ে অঘোষিতভাবে লকডাউন তুলে দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে সাধারণ ছুটি বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আমরা যারা জনস্বাস্থ্য বিষয়ে কাজ করি তারা গোলকধাঁধায় পড়ে গেছি। এটা কোনো বৈজ্ঞানিক ধারাবাহিকতায় পড়ে না। যার ফলে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ বাড়বে এবং তা ক্রমবর্ধমান থাকবে। ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে, অচিরেই হয়তো তা ভেঙে পড়বে। দুঃখজনক হলেও আমাদের লাশের মিছিল দেখতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান বলেন, সংক্রমণের এখন চতুর্থ ধাপ যাচ্ছে বাংলাদেশে। এই চতুর্থ ধাপে রোগটি ব্যাপক হারে মানুষের মধ্যে ছড়ায়। এই সময়ে লকডাউন ঢিলেঢালা করার কোনো সুযোগ নেই। কঠোর নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক আরেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের এখানেও কয়েকটা অসুবিধা হয়েছে। লকডাউন ঠিকমতো কার্যকর হয়নি। আর চিকিৎসার ক্ষেত্রে আমাদের অনেক ঘাটতি আছে। কার্যকর চিকিৎসা ব্যবস্থা করা উচিত ছিল। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কভিড-১৯ চিকিৎসার ইউনিট খোলা হয়েছে, সেটা একরকম। আর কুর্মিটোলা হাসপাতালেরটা আরেকরকম। একজন করোনা রোগীর অনেক রকম অসুখ থাকতে পারে। ফলে অন্য অসুখ থাকলে ওরা কিছু করতে পারছে না। ফলে মারা যাচ্ছে বেশি।

বিশ্বের শীর্ষ আক্রান্ত দেশগুলো যেসব ভুল করেছে, আমরা সেসব ভুল করছি উল্লেখ করে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘ওরা যেগুলো করেছিল, আমরা সে ভুলগুলো কিছু কিছু করছি। ওরা অবহেলা করেছিল হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায়। ওখানেও ভেন্টিলেটর অক্সিজেন ঘাটতি ছিল। আইসিইউ সংকট ছিল। ওরা তরুণদের যত্ন বেশি নিয়েছে। কিন্তু বয়স্কদের অতটা যত্ন নেয়নি। ওখানে বয়স্কদের মৃত্যুর হার বেশি।তবে লকডাউনের ব্যাপারে আমেরিকা অবহেলা করেছে, ইতালি করেনি। ইউরোপিয়ান দেশগুলো লকডাউনের ব্যাপারে কঠোর ছিল। এসব অবহেলার কারণে ওদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়া সত্তে¡ও রোগী বেড়েছে।’

অন্যদিকে এমন ভয়ংকর পরিস্থিতিতে এসে আশার বাণী শুনিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৃহস্পতিবার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারীর কারণে সারা দেশের ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের মাঝে উপবৃত্তি ও টিউশন ফি বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, সরকারি নিষেধাজ্ঞা শিথিলতার জন্য হয়তো সংক্রমণ একটু বেড়ে গেছে। তবে আশা করি এটাও আমরা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারব। উন্নত দেশের সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। আমরা এটা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি। তবু দেশের জনগণকে বলব আরো একটু নিজেরা সুরক্ষিত থাকেন।

বাংলানিউজসিএ/ঢাকা/ ১৫ মে ২০২০/এমএম


Array