Menu

বাংলানিউজসিএ ডেস্ক :: বিশ্বব্যাপী মহামারী রূপ নেয়া করোনা ভাইরাসের সামনে নিষ্প্রভ অসহায় পুরো বিশ্ব। থমকে গেছে গোটা দুনিয়া। বিশ্বের বড় বড় চিকিৎসা বিজ্ঞান ও চিকিৎসকদের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভাইরাসটি যেন দিনকে দিন আরো জোরালো হয়ে উঠছে।

ইতোমধ্যে বাংলাদেশের কয়েক জেলায় পৌঁছে গেছে মরণঘাতী ভাইরাস করোনা। প্রতিদিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর তালিকা। সর্বশেষ তথ্যমতে দেশে ১৬৪ ব্যক্তির শরীরে পাওয়া গেছে করোনার উপস্থিতি। আর এতে মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের। সংখ্যায় কম হলেও আশঙ্কার কথা হচ্ছে মৃত্যুর হারে ইতালির পরেই বাংলাদেশের অবস্থান।

এ ছাড়াও ছড়িয়ে পড়েছে ভাইরাসটির ‘কমিউনিটি ট্রান্সমিশন’। সীমিত সম্বল নিয়ে করোনাকে মোকাবিলা করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে পুরো বাংলাদেশকে। খোদ স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ অতিমাত্রায় ছড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশের প্রস্তুতিতে তা মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না।

এদিকে মানুষের মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা নিয়েও দেখা দিয়েছে সংশয়। মহাবিপর্যয় রুখতে যৌথ উদ্যোগের কথা বলছেন বিশ্লেষকরা।করোনার প্রস্তুতি নিয়ে বাংলাদেশে আক্রান্ত হওয়ার আগ থেকেই বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে জোরালোভাবে। কিট সঙ্কট, চিকিৎসকদের পার্সোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট, হাসপাতালের প্রস্তুতি, আইসোলেশন, ভেন্টিলেটর ও আইসিইউ চরম মাত্রায় সঙ্কট, দেশের মানুষের মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা দিতে প্রস্তুতিসহ অনেক বিষয়েই সংশয় রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, করোনা ভাইরাস আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৭ হাজার ৬৯৩ আইসোলেশন শয্যা আইসোলেশন ও রাজধানীসহ সারাদেশে করানা ভাইরাসে আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সর্বসাকল্যে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) বেড মাত্র ১১২টি। মোট আইসিইউ বেডের মধ্যে রাজধানীতে ৭৯ ও ঢাকার বাইরে ৩৩টি।তবে করোনা মোকাবিলা করতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নেয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ।

অঘোষিতভাবে লকডাউন করা হয়েছে পুরো দেশকে। বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস, নৌ-সড়ক-বিমান পরিবহন, শিল্প-কারখানাসহ নানা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। এতে থমকে গেছে দেশের অর্থনীতির চাকা। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স আসাও প্রায় বন্ধ। উদ্বেগজন এ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কতদিন সময় লাগবে তা সঠিক বলতে পারছে না কেউই। ফলে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন বিশ্লেষক ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এসব বিষয় নিয়ে বলেন, বাংলাদেশে আসলে কী ঘটবে, তা এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। গণকের পক্ষে বলা সম্ভব হয়তো। তবে আমরা বুঝতে পারছি, করানো নিয়ে সরকারের দেয়া তথ্য বহুলাংশেই অসম্পূর্ণ। অথবা আংশিক। এটিই সরকারও হয়তো ক্ষেত্রবিশেষে স্বীকার করবে।

দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, করোনা আক্রান্তদের ব্যাপারে আর কীভাবে ধারণা করা যেতে পারে। পরীক্ষা তো সব জায়গায় হচ্ছে না। তাহলে জ্বর, সর্দি, কাশির উপসর্গ নিয়ে মানুষ মরছে কি-না, সে ব্যাপারে ধারণা রাখা। অর্থনীতির ভাষায় যাকে বলে প্রক্সি ইন্ডিকেটর। অর্থাৎ বিকল্প উপায়ে তথ্য সংগ্রহ করা। এক্ষেত্রে বেসরকারি সংগঠন বা সামাজিক শক্তিগুলোকে কাজে লাগিয়ে প্রক্সি ইন্ডিকেটরের মাধ্যমে মাঠের চিত্র তুলে আনা যায়। তাহলেই আমরা বুঝতে পারব বাংলাদেশ আসলে কোথায় আছে বা কোথায় যাচ্ছে।

তিনি বলেন, একইভাবে কর্তৃত্ববাদী নয়, সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তোলার জন্য বিশ্বাসযোগ্য উদ্যোগ জরুরি। আমলাতান্ত্রিক মনোভাব দিয়ে বিশ্বাস স্থাপন করা যায় না। করোনা কীভাবে মোকাবেলা করা যাবে তার উত্তর আমাদের কাছে জানা নেই। কিন্তু নৈতিক জায়গা থেকে বিশ্বাসযোগ্য পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারলে সবাই সমাধানের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বে। অনেক দেশে কিন্তু সেভাবেই হচ্ছে।

দেশে করোনায় আরো ৫ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত বেড়ে ১৬৪: বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাসে দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন আরো ৪১ জন। এ নিয়ে দেশে ভাইরাসটিতে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬৪ জনে। আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে আরো ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। ফলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ জনে।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদফতরের করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত নিয়মিত হেলথ বুলেটিনে এ তথ্য জানানো হয়। অনলাইনে বুলেটিন উপস্থাপনকালে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ এবং রোগতত্ত¡, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা।দেশে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি এবং বিশ্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পরিস্থিতি তুলে ধরার আগে ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় আরো ৭৯২ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জানান, এই নমুনা পরীক্ষায় আরো ৪১ জনের শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। ফলে দেশে করোনায় মোট আক্রান্ত হয়েছেন ১৬৪ জন। আক্রান্তদের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় আরো ৫ জন মারা গেছেন। এতে মৃতের সংখ্যা ১৭। নতুন করে কেউ সুস্থ হননি। অর্থাৎ করোনায় সুস্থ রোগীর সংখ্যা ৩৩-ই আছে।আইইডিসিআর পরিচালক জানান, আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ২৮ জন ও নারী ১৩ জন। নতুন করে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে পুরুষ চারজন, নারী একজন। দুজন ঢাকার, তিনজন ঢাকার বাইরের।

ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, অন্যান্য দিন এই অনুষ্ঠানকে আইইডিসিআরের অনলাইন প্রেস ব্রিফিং বলা হলেও এটিকে এখন থেকে দৈনন্দিন হেলথ বুলেটিন বলব আমরা। এখন থেকে আর গণমাধ্যমকর্মীদের কাছ থেকে কোনো প্রশ্ন গ্রহণ বা উত্তর দেয়া হবে না।

বিশ্বজুড়ে মৃত্যু ৭৬ হাজার ছাড়িয়েছে: করোনা ভাইরাসের আক্রমণে বিশ্বজুড়ে সোমবার গত ২৪ ঘণ্টায় প্রাণ হারিয়েছেন আরো ৫ হাজার ২২৭ প্রাণ। ফলে এই ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৭৬ হাজার ৪৮৩ জনে দাঁড়িয়েছে। করোনা ভাইরাসে মৃত্যুর তালিকায় এখনো বিশ্বের শীর্ষ স্থানটি ধরে রেখেছে ইতালি। তবে দেশটি তাদের রোজকার মৃত্যুর হারে কিছুটা লাগাম টেনেছে। গত সপ্তাহে মৃত্যুর সংখ্যাটা এক লাফে অনেকটাই নামিয়ে আনতে পেরেছে ইতালি। সোমবার সেখানে মারা গেছে ৬৩৬ জন এবং নতুন সংক্রমিত হয়েছে ৩ হাজার ৫৯৯ জন।

এর মাত্র একদিন আগে অর্থাৎ রোববার সেখানে মৃত্যু হয়েছিল ৫২৫ জনের। দেশে করোনা সংক্রমণের পর থেকে যা সর্বনিম্ন  বলেই জানিয়েছে স্থানীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ওই দিন নতুন করে সংক্রমিত হন চার হাজার ৩১৬। এর আগে প্রতিদিন যে সংখ্যাটা ছিল ৬ হাজার বা তারও বেশি।ইতালির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানানো হয়েছে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মৃত্যুর গ্রাফটা যে ভাবে ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছিল, তা অনেকটাই নামিয়ে আনা হয়েছে। সংক্রমণ যাতে আর বাড়তে না পারে তার জন্য কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে প্রশাসন।

জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই মুহূর্তে ইতালিতে আক্রান্ত প্রায় এক লাখ ৩৩ হাজার মানুষ। আর মারা গেছে মোট ১৬ হাজার ৫২৩ জন। জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের রিপোর্ট অনুযায়ী, গোটা বিশ্বে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ১৩ লাখ ৫৮ হাজার ৯৪৩ জন। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ।মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত তিন লাখ ৬৭ হাজার ৬৫০ জন। তার পরেই রয়েছে স্পেন, ইতালি ও জার্মানি। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়েছিল চীন থেকে। কিন্তু এই দেশ সংক্রমণ এবং মৃত্যুর হার অনেকটাই কমিয়ে এনেছে দ্রুত। ফলে সংক্রমণ ও মৃত্যুর তালিকায় অনেকটাই নিচে নেমে এসেছে তারা। এখন দেশটিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা হচ্ছে ৮১ হাজার ৭৪০ জন।

তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের দেশগুলো যেমন স্পেন, ইতালি, ফ্রান্স এবং জার্মানিতে সংক্রমণ এবং মৃত্যু লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। শুরুর দিকে সংক্রমণের তালিকার অনেকটাই নিচের দিকে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। চীন ছিল শীর্ষস্থানে। এই মুহূর্তে সংক্রমণের দিক থেকে সকলকে টপকে গিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেশ।সেখানে আক্রান্ত হয়েছেন তিন লাখ ৬৮ হাজারের বেশি মানুষ। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যুও, প্রায় ১১ হাজার। সংখ্যার হিসাবে ১০ হাজার ৯৪৩ জন। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা নিউইয়র্কের। তবে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন গভর্নর অ্যান্ড্রু কুয়োমো। গত দু’দিনে মৃত্যুর হার যেমন কমেছে, পাশাপাশি সংক্রমণেও অনেকটা রাশ টানা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। এই সংখ্যা কমার কারণ হিসাবে সামাজিক দূরত্বের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

করোনায় আক্রান্তের দিক দিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে স্পেন। সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৪০ হাজার ৫১০ জন। তবে স্পেনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সোমবার নতুন আক্রান্তের সংখ্যাটা অনেকটাই কমেছে। যা গত দু’সপ্তাহের মধ্যে সবচেয়ে কম। প্রতি দিনের মৃত্যুর হারও সামান্য কমেছে।জার্মানিতে মোট করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ৩ হাজার ৩৭৫ জন এবং মারা গেছেন ১৮১০ জন মানুষ। আক্রান্তে সংখ্যায় লাখের ঘরের দিকে ছুটেছে ফ্রান্সও। দেশটিতে এই মুহূর্তে মোট আক্রান্তের পরিমাণ ৯৮ হাজারের বেশি মানুষ। আর মোট মৃত্যু ৮ হাজার ৯১১ জন। এদের মধ্যে সোমবার গত ২৪ ঘণ্টাতেই মারা গেছে ৮৩৩ জন, যা ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি।

বাংলানিউজসিএ/ঢাকা/ ০৮ এপ্রিল ২০২০/এমএম


Array