Menu

বাংলানিউজসিএ ডেস্ক :: কোনো রোগ যদি মহামারী আকারে দেখা দেয় এবং এর ফলে যদি বিশালসংখ্যক মানুষের মৃত্যু ঘটে, তাহলে সমাজব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ওপর তা বিশাল প্রভাব সৃষ্টি করে। ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপজুড়ে মহামারী আকারে প্লেগ ছড়িয়ে পড়েছিল। ওই সময় মানুষ জানত না কী করে প্লেগের হাত থেকে বাঁচা যায়।কারণ এ রোগের কোনো ওষুধ তখন মানুষ আবিষ্কার করতে পারেনি। একবার কেউ প্লেগে আক্রান্ত হলে ২৪ কিংবা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তার মৃত্যু ছিল অবধারিত। প্লেগজনিত কারণে ব্যাপক মানুষের মৃত্যু ইউরোপীয় সমাজব্যবস্থায় বিশাল পরিবর্তন এনে দেয়।

ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপে ভূমিদাস প্রথা (Serf system) প্রচলিত ছিল। ভূমিদাস প্রথার বৈশিষ্ট্য হল একজন ভূ-স্বামী বিশাল আয়তনের জমির মালিক ছিল। এ জমি চাষ করানোর জন্য অথবা অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করার জন্য ভূমিদাসদের ব্যবহার করা হতো।ভূমিদাসদের কোনোরকম স্বাধীনতা ছিল না। তারা ইচ্ছা করলে ভূ-স্বামীর এলাকা থেকে অন্য কোনো এলাকায় চলে যেতে পারত না। এমনকি বিয়ে-শাদির ব্যাপারেও ভূ-স্বামীর অনুমতি প্রয়োজন হতো।

ভূ-স্বামীরা ভূমিদাসদের জন্য তার তালুক থেকে ছোট এক টুকরা জমি ভূমিদাসদের ব্যবহারের জন্য দিত। এ জমি চাষ করে ভূমিদাসরা নিজেদের ভরণ-পোষণের জন্য কিছু ফসল উৎপাদন করত। ভূমিদাসরা ক্ষুদ্র এই ভূমি খণ্ড ব্যবহারের জন্য নিজস্ব শ্রম দিত।ভূ-স্বামীরা ভূমিদাসদের বলে দিত কী পরিমাণ শ্রম ভূমিদাসদের অনুমোদিত জমিতে ব্যবহার করা যাবে এবং কী পরিমাণ শ্রম ভূ-স্বামীদের জমিতে দিতে হবে। কার্যত সব জমির মালিকই ছিল ভূ-স্বামীরা। মার্কসবাদী বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একজন ভূমিদাস সপ্তাহের কিছুটা সময় তার জন্য বরাদ্দকৃত জমিতে শ্রমের আকারে ব্যবহার করত। একে বলা হয় Necessary Labour|

নিজের ভরণ-পোষণের জন্য এটুকু শ্রম-সময় ব্যবহার করতে না পারলে ভূমিদাসের মৃত্যু ঘটবে। সেই অবস্থায় ভূ-স্বামীর জমিতে কাজ করার জন্য কোনো ভূমিদাস পাওয়া যাবে না। ভূমিদাসরা বাকি সময়টা ভূ-স্বামীর জমিতে কাজ করত।ভূ-স্বামীর জমিতে কাজ করার ফলে যা কিছু উৎপাদিত হতো তা জমা হতো ভূ-স্বামীর গোলায়। ভূমিদাসরা যে সময়টুকু ভূ-স্বামীর জন্য দিতে বাধ্য থাকত তাকে বলা হয় উদ্বৃত্ত শ্রম (Surplus Labour)। এভাবে উদ্বৃত্ত শ্রম আত্মসাৎ করে ভূ-স্বামীরা ভোগ-বিলাসের জীবনযাপন করত।

ওই সময় শোষণ করা হতো ভূমিদাসদের উদ্বৃত্ত শ্রম। এটাই ছিল ভূমিদাস প্রথার মূল বৈশিষ্ট্য। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় উদ্বৃত্ত শ্রম থেকে উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি করে পুঁজিপতিরা শোষণ চালায়। ভূমিদাস প্রথার যুগে বাজার ছিল খুবই অ-বিকশিত।বিনিময় ব্যবস্থায় পণ্যের সঙ্গে পণ্যের বিনিময় হতো। কিন্তু পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বাজার এতটাই বিকশিত হয় যে, ক্রেতা কিংবা বিক্রেতা কেউই জানে না বাজারজাত পণ্য কোন শ্রমিকের হাতের স্পর্শে উৎপাদিত হয়েছে। পুরো বিনিময় ব্যবস্থা হয়ে ওঠে সম্পূর্ণভাবে নৈর্ব্যক্তিক।

মহামারীরূপে প্লেগ দেখা দেয়ার পর শত-সহস্র ভূমিদাস প্লেগে মৃত্যুবরণ করতে থাকে। দারিদ্র্যের ফলে ভূমিদাসরা স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন করতে পারত না। ফলে তারাই মৃত্যুবরণ করত অনেক বেশি হারে। এ রকম পরিস্থিতির উদ্ভবের ফলে ভূ-স্বামীরা দেখল ভূমিদাস প্রথা চলতে পারে না।ভূমিদাসদের মুক্তি প্রদান করা হল এবং শ্রমশক্তির একটা বাজারও সৃষ্টি হল। এক অঞ্চলের শ্রমিক অন্য অঞ্চলে গিয়ে কাজ করার অধিকার অর্জন করল। প্লেগ মহামারী ভূমিদাসের স্থানে মজুরিভিত্তিক শ্রমিক শ্রেণি সৃষ্টির পথ তৈরি হয়ে গেল।

এভাবে ইউরোপীয় সমাজব্যবস্থায় একটা বড় পরিবর্তন এলো। ভূমিদাস প্রথা বিলুপ্ত হয়ে সামন্ত প্রথার উদ্ভব হল। ইতিহাসের এ দৃষ্টান্ত থেকে আমরা বুঝতে পারি মহামারী-মন্বন্তর তাৎক্ষণিকভাবে যতই বেদনাদায়ক হোক না কেন, সমাজব্যবস্থা এর ফলে বিরাট ধরনের আলোড়নের মধ্যে পড়ে। বদলে যায় শাসন-শোষণের স্বরূপ। এমনকি মানুষের স্বাধীন জীবনযাপনের পথে অগ্রগতিও সাধিত করতে পারে। সুতরাং মহামারী অনেক সময় নতুন সমাজের ধাত্রীরূপে কাজ করে।সুরজিৎ দাশগুপ্ত ‘ভারতবর্ষ ও ইসলাম’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘সাম্প্রতিক ভারতবর্ষের ইসলাম সম্বন্ধে প্রচলিত বইগুলো থেকে মনে হয় যে, বাংলায় বহুকাল ধরেই ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা সংখ্যায় গরিষ্ঠ। কিন্তু অমলেন্দু দে ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘রুটস অফ সেপারিটিজম ইন নাইনটিন্থ সেঞ্চুরি বেঙ্গল’ গ্রন্থে এ বিষয়ে বহু কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য নিরপেক্ষভাবে উদঘাটন করেছেন।

‘নোটস অন দ্য রেসেস, কাস্টস অ্যান্ড ট্রেডস অফ ইস্টার্ন বেঙ্গল’ প্রণেতা ডক্টর জেমস ওয়াইজের সাক্ষ্য থেকে তিনি দেখিয়েছেন, ‘Previous to the eighteenth century the Hindu inhabitants of Bengal far exceeded the Muhammadan in numbers’. তখন পর্যন্ত আধুনিক পদ্ধতিতে লোক গণনা শুরু হয়নি, তাই প্রকৃত সংখ্যা পাওয়া যায়নি।কিন্তু এ ব্যাপারটা বিশেষ অভিনিবেশ দাবি করে যে, যখন ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সত্যই অনেক শক্তি ছিল তখন ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা সংখ্যায় লঘু ছিল। ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দেও দেখা গেছে, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা ১৮১ লাখ, পক্ষান্তরে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা ১৭৬ লাখ, অর্থাৎ দু’ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে জনসংখ্যাগত ব্যবধান অনেক কমে এসেছে।

কুড়ি বছরের মধ্যে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেল- ১৮৯১’র লোক গণনার হিসাবে দেখা যায় যে, হিন্দু ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা যেখানে ১৮,০৬৮৬৫৫, সেখানে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা বহুল পরিমাণে বর্ধিত হয়ে দাঁড়িয়েছে ১৯,৫৮২,৩৪৯ এবং এ প্রসঙ্গে অমলেন্দু দে ‘সেনসাস অফ ইন্ডিয়া ১৮৯১’-এর প্রণেতা সি. জে. ও ডোনেলের যে মন্তব্য উদ্ধার করেছেন এখানেও সেটা উদ্ধার করার প্রলোভন সংবরণ করা অসম্ভব।

ডোনেল সাহেব লিখেছেন, The slight increase of Hindus between 1872 and 1881, amounting to only 141, 135 persons or 0.8 percent, that of Musalmans being 7.1 percent, was a sufficiently noticeable fact, but from the foregoing figures it appears that nineteen years ago in Bengal Proper Hindus numbered nearly half a million more than Musalmans did, and that in the space of less than two decades, that Musalmans have not only overtaken the Hindus, but have surpassed them by a million-and-a-half.

মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে মুসলিম জনগণের বিশাল হারে সংখ্যা বৃদ্ধি এবং অন্যদিকে হিন্দু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধিতে প্রচণ্ড স্থবিরতা একটি বড় প্রশ্নের জন্ম দেয়। তা হল কীভাবে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধি সম্ভব হল।বঙ্গদেশের ভূ-প্রকৃতিকে মোটা দাগে দুই ভাগে ভাগ করা যায়- এর একটি হল সক্রিয় ব-দ্বীপ এবং অন্যটি হল মৃত ব-দ্বীপ (Moribund Delta)। সক্রিয় ব-দ্বীপটি ছিল সুরমা, কুশিয়ারা, মেঘনা, যমুনা ও পদ্মা বিধৌত অঞ্চল।

এ অঞ্চলে স্ফটিক স্বচ্ছ নদীর প্রবাহ ছিল। অন্যদিকে মৃত ব-দ্বীপ অঞ্চলটি যশোর-খুলনা ও বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি জেলা নিয়ে গঠিত হয়েছিল। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ইরা ক্লায়েনের গবেষণা থেকে জানা যায় মৃত ব-দ্বীপ অঞ্চলের নদীগুলো মৃতপ্রায় হয়ে পড়ার ফলে স্রোতহীন হয়ে যায়।এর ফলে এখানকার জলাভূমিতে মশার বংশ বিস্তারের বিরাট সুযোগ ঘটে, মশকের বংশ বৃদ্ধির সঙ্গে ম্যালেরিয়া জ্বর এবং বর্ধমান জ্বরের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব ঘটে।ফলে এ অঞ্চলে মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পায় এবং এ অঞ্চলে বসবাসরত হিন্দু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সামান্যই বাড়ে।

অপরদিকে সক্রিয় ব-দ্বীপে পানির প্রবাহ চলমান থাকায় মশার বংশ বৃদ্ধি সম্ভব হয়নি এবং মানুষের স্বাস্থ্যগত অবস্থা ভালোই ছিল। কিন্তু এ অঞ্চলে মূলত মুসলিম জনগোষ্ঠীর আবাস ছিল। এদের দ্রুত বংশ বৃদ্ধি ঘটে।এভাবে বঙ্গদেশে মুসলিম জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়। হিন্দু এবং মুসলমানদের মধ্যে সংখ্যার পার্থক্য পরবর্তীকালের রাজনীতিকে বিশালভাবে প্রভাবিত করে।

ইতিহাসের এ জনমিতিক ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করলে আমরা বুঝতে পারব কেন এ অঞ্চলে বঙ্গভঙ্গ হয়েছিল, কেন বঙ্গভঙ্গ রদ করার জন্য বড় ধরনের আন্দোলন হিন্দু ভদ্রলোকদের নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছিল এবং চল্লিশের দশকে এসে পাকিস্তানের দাবি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।এ দৃষ্টান্ত থেকে আমরা বুঝতে পারি শুধু রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কারণেই ইতিহাসে বিভিন্ন ঘটনা ঘটে, তার অনেক সময়ই আংশিক ব্যাখ্যা হয় মাত্র। জনমিতিক বিন্যাসও ইতিহাসের গতিকে প্রভাবিত করতে পারে। জনমিতিক বিন্যাস কখনও কখনও মারী-মন্বন্তর এবং রোগ শোকের দ্বারা প্রভাবিত হয়।

চীনে গত বছরের ডিসেম্বরে যে কোভিড-১৯ মহামারী আকারে দেখা দেয় সেই মহামারীর বিরূপ প্রতিক্রিয়া কেবল চীনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এই ছোঁয়াচে রোগটি বিশ্বের শতাধিক দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে বিশ্বায়নের পৃথিবী, সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা যার অন্যতম বৈশিষ্ট্য, বাধ্য হয়েছে যোগাযোগ ছিন্ন করে দিতে।অনেক দেশ কোভিড-১৯ ভাইরাসে আক্রান্ত দেশের সঙ্গে আকাশপথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে।

এ রোগের প্রাদুর্ভাবের ফলে চীনের কলকারখানাগুলো স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে কম হারে উৎপাদন করছে। চীনের কাঁচামাল এবং যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে যেসব দেশের শিল্পকারখানা চলে সেসব দেশ ভীষণ ক্ষতির মুখে পড়েছে।বাংলাদেশের পোশাকশিল্প চীন থেকে আমদানি করা কাঁচামাল এবং যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরশীল। চীনে কোভিড-১৯ মহামারী দেখা দেয়ায় সেখান থেকে স্বাভাবিক হারে আমদানি সম্ভব হচ্ছে না। অর্থনীতির আকারের দিক থেকে চীন পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি।

চীনে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে পড়লে তার প্রভাব সামগ্রিকভাবে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর পড়ে। এই প্রভাব উৎপাদন, আমদানি, রফতানি, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিকভাবে জীবনযাত্রার মানকে প্রভাবিত করে। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল বাংলাদেশেও এ রোগ দেখা দিয়েছে।রোগাক্রান্ত লোকের সংখ্যা যতই কম হোক কেন, এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব অপরিসীম। সব মানুষই কম-বেশি আশঙ্কা ও ভয়-ভীতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডকে যতটুকু পারা সম্ভব কমিয়ে আনার চেষ্টা করছেন।

এর ফলে অর্থনৈতিক অগ্রগতির চাকা বেগ হারিয়ে ফেলবে। ফলে কাক্সিক্ষত মাত্রায় প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে না। বাংলাদেশের শেয়ার মার্কেট ভয়াবহ সংকট ও দুর্বল অবস্থার মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশে এ ভাইরাস রোগটি উদঘাটিত হওয়ার পর শেয়ার মার্কেটের ওপর প্রচণ্ড নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।

দেশের স্কুল-কলেজগুলো এখনও বন্ধ করা হয়নি। তবে সাধারণ মানুষকে জনসমাগম এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এ রোগের কোনো সুনির্দিষ্ট ওষুধ নেই। তবে সঠিক ব্যবস্থাপনার দ্বারা এর প্রকোপ হ্রাস করা সম্ভব।বাংলাদেশে আমরা কতটা কোভিড-১৯-এর গ্রাস থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে পারব তা নির্ভর করে জাতি হিসেবে আমরা কতটা সুশৃঙ্খল। কোভিড-১৯-এর মহামারীর তীব্রতা অনেকাংশে হ্রাস করা সম্ভব যদি আমরা কিছু নিয়ম বিধি মেনে চলি।

এ রকম একটি বিপদের সুযোগে মুনাফাখোর ব্যবসায়ীরা মাস্ক এবং হ্যান্ডওয়াশের দাম অযৌক্তিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। এগুলো বাজার থেকে প্রায় উধাও হয়ে গেছে। বাংলাদেশে ব্যবসায় নৈতিকতা বলে কিছু আছে কিনা সন্দেহ। সুযোগসন্ধানীদের কারণে কোভিড-১৯ বাংলাদেশেও দুর্যোগে পরিণত হতে পারে।অন্যদিকে এ ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতিরও চরম ঘাটতি রয়েছে। আকাশপথ ও স্থলপথে যারা যাতায়াত করে তারা এ রোগে আক্রান্ত কিনা বা আক্রান্ত হওয়া নিয়ে সন্দেহ করা যায় কিনা তা নির্ণয়ের জন্য যে স্ক্যানার মেশিন থাকার কথা তা অধিকাংশ স্থলবন্দর ও বিমানবন্দরে নেই।

আশ্চর্যের বিষয়, এ ধরনের একটি মহামারীকে রোধ করতে হলে যে ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নেয়া উচিত তা এ লেখা তৈরি হওয়ার সময় পর্যন্ত দেখা যায়নি। ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াতে এ রোগের ব্যাপারে কী সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে তাও জোরেশোরে প্রচার করা হচ্ছে না।চীনারা গোটা একটি প্রদেশকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে এ মহামারী মোকাবেলায় উচ্চ তৎপরতা প্রদর্শন করেছে। যার ফলে একমাত্র হুবেই প্রদেশ ছাড়া অন্য প্রদেশগুলোয় এ রোগের প্রাদুর্ভাব সামান্যই হয়েছে। তাদের চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য কর্মীদের আপ্রাণ চেষ্টার ফলে কোভিড-১৯ ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে এসে গেছে।

বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এ রোগে মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে। এ থেকে মোটামুটি মুক্ত থাকার উপায় হল জাতীয় শৃঙ্খলা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা। প্রয়োজন রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা, রোগীদের বিচ্ছিন্ন রাখার ব্যবস্থা এবং কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থা কীভাবে নিশ্চিত করা যায় তার জন্য সুচিন্তিত উদ্যোগ ও কর্মসূচি গ্রহণ।জনগণকে প্রতিনিয়ত আশ্বস্ত করতে হবে। মানুষ তখনই আশ্বস্ত হবে যখন তারা দেখতে পাবে সরকারের আন্তরিকতার অভাব নেই।

ইউরোপে প্লেগ ভূমিদাস প্রথার অবসান ঘটিয়েছিল। বঙ্গদেশে ম্যালেরিয়া ও বর্ধমান জ্বর জনসংখ্যার বিন্যাসে পরিবর্তন ঘটিয়ে পরবর্তীকালের রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছিল। বিশ্বায়নের এ পৃথিবীতে শুধু বাজারভিত্তিক বিশ্বায়নই ঘটেনি, ছোঁয়াচে রোগের বিশ্বায়নও ঘটেছে। কোভিড-১৯ নিয়ে পৃথিবীর সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা যদি বিশ্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থা দেখভাল করার জন্য নতুন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের জন্ম দেয় তাহলে সেটা মানবজাতির জন্য কল্যাণকর হবে।

বিদ্যমান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে আরও ক্রিয়াশীল ও ক্ষমতায়িত করার উদ্যোগ নিতে হবে, যেখানে ধনী বা দরিদ্র দেশের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যান্ডেট হওয়া উচিত কোভিড-১৯-এর মতো রোগের টিকা উদ্ভাবন এবং এ রোগ নির্ণয়ের অবকাঠামো বিশ্বের সব দেশে গড়ে তোলা।

বাংলানিউজসিএ/ঢাকা/ ১২ মার্চ ২০২০ /এমএম


Array