বাংলানিউজসিএ ডেস্ক :: বিশ্বের সর্বাধুনিক উড়োজাহাজ বোয়িং ৭৮৭-৮ এবং ৭৮৭-৯০০ ড্রিমলাইনার এখন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে। অনেক স্বপ্ন নিয়ে ২০০৮ সালে চারটি ড্রিমলাইনার কেনার চুক্তি করেছিল রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্স। অথচ এরই মধ্যে বিমান বহরে ছয়টি ড্রিমলাইনার যুক্ত হয়েছে। তবে এই স্বপ্নের উড়োজাহাজ চালনায় অনীহা তৈরি হয়েছে বিমান বাংলাদেশের সিনিয়র পাইলটদের। এসব কারণে বিমান সময়মতো পাইলটদের প্রশিক্ষণও সমাপ্ত করতে পারেনি।
দেশীয় অভিজ্ঞ পাইলটের অভাবে দূরপাল্লার রুটগুলোতে ড্রিমলাইনার চালাতে পারছিল না বিমান। এসব কারণে উপায় না পেয়ে উচ্চ বেতন আর সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বিদেশি ১০ পাইলট নিয়োগ দিয়েছে বিমান কর্তৃপক্ষ। চলতি মাসের ১ জানুয়ারি থেকে তাদের নিয়োগ কার্যকর হয়েছে। এ প্রসঙ্গে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ম্যানেজমেন্ট থেকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না নেয়ার কারণে কেবিন ক্রু ও পাইলট সঙ্কট দেখা দিয়েছে।
বিমান সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বিমানের বহরে নতুন প্রজন্মের ছয়টি ড্রিমলাইনার (বোয়িং-৭৮৭-৮০০ এবং ৭৮৭-৯০০ মডেল) উড়োজাহাজ রয়েছে। সর্বশেষ গত ৫ জানুয়ারি ৭৮৭-৯০০ মডেলের অত্যাধুনিক ড্রিমলাইনার দিয়ে ঢাকা-ম্যানচেস্টার সরাসরি ফ্লাইট চলাচল শুরু করে। এর আগে আরো পাঁচটি উড়োজাহাজ দিয়ে ফ্লাইট চালু করলেও এসব বোয়িং চালানোর জন্য পর্যাপ্ত এবং অভিজ্ঞ পাইলট বিমানে নেই। বর্তমানে ঢাকা-লন্ডন-ঢাকা, ঢাকা-ম্যানচেস্টার-সিলেট-ঢাকা, ঢাকা-দোহার-ঢাকা, কুয়েত, দাম্মাম, রিয়াদসহ বিভিন্ন রুটে ছয়টি ড্রিমলাইনার চলাচল করছে।
বিমানের বহরে বিদেশি ১০ পাইলট নিয়োগ দেয়া প্রসঙ্গে বিমানের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে অভিযোগ করে বলেন, বিমানের বহরে নতুন নতুন উড়োজাহাজ বাড়লেও সেইভাবে ককপিট এবং কেবিন ক্রু তৈরি করা হয়নি। বহরে উড়োজাহাজ বাড়লেও পাইলট স্বল্পতার কারণে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে বিদেশ থেকে উচ্চ বেতনে ১০ জন বিদেশি পাইলট নিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। তারা আরো জানান, ড্রিমলাইনার পরিচালনার জন্য বিমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ মাত্র ৬ সেট পাইলট প্রস্তুত করতে পেরেছিল। কিন্তু ঢাকা-লন্ডন রুটে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য কমপক্ষে ১২ সেট বৈমানিক প্রয়োজন। এক সেটে দুজন করে বৈমানিক থাকে। এর আগে বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর পরিচালনার ক্ষেত্রে সময়মতোই পাইলট তৈরি করতে পেরেছিল। কিন্তু এবার ড্রিমলাইনারের ক্ষেত্রে সিনিয়র পাইলটদের কাছে যখন প্রশিক্ষণ নেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়, তখন তারা এতে অনাগ্রহ দেখান। সবচেয়ে বেশি সিনিয়র ৫ পাইলট ড্রিমলাইনারে যাওয়ার প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিনিয়র পাইলটরা নিজেরাই না করেননি, জুনিয়র পাইলটদেরও ড্রিমলাইনারে যেতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিমানের একজন সিনিয়র পাইলট নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা জুনিয়রদের ড্রিমলাইনারে যেতে না করিনি। কিন্তু জুনিয়র পাইলটরা যদি বোয়িং ৭৩৭ ছেড়ে ড্রিমলাইনারে যায়, তাহলে এসব উড়োজাহাজ কারা পরিচালনা করবে সেটাও ভাবতে হবে। বিমানের আরেক পাইলট নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, নিঃসন্দেহে ড্রিমলাইনার আধুনিক উড়োজাহাজ।
তবে এটি একটি ছোট উড়োজাহাজ। এর আসন সংখ্যা মাত্র ২৭১টি। আর বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর এর আসন সংখ্যা ৪১৯। বিশ্বের বেশিরভাগ বড় বড় এয়ারলাইন্সে ড্রিমলাইনার গুরুত্বপূর্ণ উড়োজাহাজ নয়। ওইসব এয়ারলাইন্সে বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর বড় উড়োজাহাজ। তাছাড়া বিশ্বব্যাপী বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর এর পাইলটদের চাহিদাও বেশি। চাকরির বাজারে বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর পাইলটরাই এগিয়ে থাকেন। এসব বিবেচনায় বিমানের সিনিয়র পাইলটরা ড্রিমলাইনারে যেতে ততটা আগ্রহী না বলে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে বিমানের মার্কেটিং বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বিমানের ম্যানেজমেন্টে যারা আছেন, তাদের কর্মকাণ্ডের মধ্যে দূরদর্শিতার অভাব রয়েছে। নিয়ম হচ্ছে আগামী পাঁচ বছর বিমানের বহরে মোট কতগুলো রুট বাড়বে, কয়টা নতুন অথবা লিজ উড়োজাহাজ যোগ হতে পারে এগুলোর একটা এসেসমেন্ট আগে ভাগে করতে হয়। এর জন্য কতজন পাইলট কেবিন ক্রু দরকার সেটির ধারণা থাকতে হবে। পরিকল্পনা না নেয়ার কারণে এখন আমাদের বহরে অত্যাধুনিক ড্রিমলাইনার (বোয়িং-৭৮৭-৮০০) চারটি এবং ৭৮৭-৯০০ দু’টি যোগ হলেও ক্রু সঙ্কট দেখা দিয়েছে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ আশীষ রায় চৌধুরী বলেন, সময়মতো পাইলট তৈরি করতে না পারায় বিমানকে বেসরকারি এয়ারলাইন্স থেকে পাইলট ভাড়া ও বিদেশি পাইলট নিয়োগ দিতে হচ্ছে চড়া দামে। এটা বিমানের ফ্লাইট অপারেশন শাখার চূড়ান্ত ব্যর্থতা। একজন ক্যাডেট পাইলটকে গ্রাউন্ড ট্রেনিং, সিমুলেটর ট্রেনিং ও রুট চেক করতে কিছুতেই ৭ মাসের বেশি সময় লাগে না। তিনি বলেন, পাইলট হচ্ছে উড়োজাহাজের প্রাণ। শত শত মানুষের জীবন ও হাজার কোটি টাকার এয়ারক্রাফট নিয়ে তাদের আকাশে পাড়ি দিতে হচ্ছে। কাজেই পাইলট নিয়োগে অবশ্যই বিমানকে স্বচ্ছ থাকতে হবে। ড্রিমলাইনার কেনার আগে বিমান ম্যানেজমেন্ট থেকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না নেয়ার কারণে কেবিন ক্রু ও পাইলট সঙ্কট দেখা দিয়েছে।
বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোকাব্বির হোসেন বলেন, পাইলট সঙ্কটের কারণে আমরা বিদেশি পাইলট নিয়োগ দিয়েছি। তবে সংখ্যাটা ১০ জনের বেশি হতে পারে। সেটি পরে দেখে বলতে হবে। এর মধ্যে কারো দুই মাস বা কারো চার মাস মেয়াদ আছে। বিদেশি পাইলটদের বেতন দেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি আমরা ডিসক্লোজ করতে চাচ্ছি না। ফ্লাইট অপারেশন বিভাগে ককপিট ক্রু সিডিউলার পদটি শূন্য থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি দেশে ছিলাম না। এই পদটি সেনসিটিভ। তাই বুঝেশুনে দিতে হবে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সভাপতি ক্যাপ্টেন মাহবুব বলেন, ড্রিমলাইনারের প্রশিক্ষণে যেতে রাজি নয়, বিষয়টি এরকম নয়। কারণ পাইলটদেরকে বিকল্প দেয়া হয়েছিল, তারা ড্রিমলাইনারে যেতে চায় নাকি চায় না। সুতরাং কেউ যদি না যেতে চান তা দোষের কিছু নয়।
বাংলানিউজসিএ/ঢাকা/ ১৩ জানুয়ারি ২০২০ /এমএম





