Menu

বাংলানিউজসিএ ডেস্ক :: একাত্তরের ১৫ ডিসেম্বর, দিনটি ছিল বুধবার। কনকনে শীতের মধ্যে শ্বাসরুদ্ধকর চরম উৎকণ্ঠার একটি দিন। মিত্র-মুক্তিবাহিনী চারদিক দিয়ে ঢাকাকে ঘেরাও করে রেখেছে। পালাবার কোনো পথ নেই, অবরুদ্ধ ঢাকা অচল, নিথর, থমথমে হয়ে পড়েছে। ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় বিভিন্ন সামরিক স্থাপনার ওপর মিত্রবাহিনীর মিগ-২১ বিমানের বোমাবর্ষণে পাকিস্তানিরা বিধ্বস্ত। বাঙালির চূড়ান্ত বিজয়ের সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি কখন আসবে!

দেশজুড়ে বিশেষ করে অবরুদ্ধ ঢাকাবাসীদের নানা উৎকণ্ঠার মধ্যে বিভিন্ন প্রশ্ন মার্কিন সপ্তম নৌবহর কি আসবে? এলে কী হবে? নিয়াজী কি সত্যিই সারেন্ডার করবে? নাকি সপ্তম নৌবহরের অপেক্ষায় সারেন্ডারের কথা বলে কালক্ষেপণ করছেন? চীন কি পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করার জন্য বা সমর্থন করার জন্য এগিয়ে আসবে? নাকি জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির জন্য নাটকীয় কিছু ঘটে যাবে? নাকি ঢাকার অবস্থা বার্লিন হবে?

দেশবাসী আর অবরুদ্ধ ঢাকাবাসীর ভরসা তখন বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা, আকাশবাণী কলকাতা আর স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে এম আর আখতার মুকুল পাঠ করছেন উত্তেজনাময় ‘চরমপত্র’, আর বাজানো হচ্ছে রক্তগরম করা দেশাত্মবোধক বিজয়ের গান ও বিজয়ের রণসঙ্গীত।

এদিকে দুইটি ভাগে ভাগ হয়ে মার্কিন নৌবহর এগিয়ে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগরে অনপ্রবেশকারী মার্কিন সপ্তম নৌবহর। এই বহরে রয়েছে আটটি যুদ্ধ জাহাজ। এর একটির নাম ‘ত্রিপলী’, এতে আছে ২৩টি হেলিকপ্টর। আজ বিবিসি ও রেডিও অস্ট্রেলিয়ার খবরে বলা হয়, ভারত মহাসাগরের দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বাধুনিক আণবিক অস্ত্রে সমৃদ্ধ নৌবহরের দুইটি ক্ষেপণাস্ত্রবাহী জাহাজ জাপান সাগর অতিক্রম করে দ্রুতগতিতে ভারত মহাসাগরের দিকে ছুটে আসছে। এই বহর ভারত মহাসাগরে অপেক্ষমাণ সোভিয়েত নৌবহরের সঙ্গে যুক্ত হবে এবং বঙ্গোপসাগরে মিলিত হবে। চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি।

বঙ্গোপসাগরে রওনা দেয়া যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহর যখন বঙ্গোপসাগর থেকে মাত্র ২৪ ঘণ্টার দূরত্বে গভীর সমুদ্রে এসে অবস্থান করছিল, তখন ভারতীয় নৌবাহিনীর সহায়তায় ১৫ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়নের রণতরীর ২০টি জাহাজ ভারত মহাসাগরে অবস্থান নেয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহর যুদ্ধে অংশ নেয়া থেকে নিজেদের বিরত রাখে। ফলে পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত সপ্তম নৌবহর সাহায্যটুকু পাওয়ার যে আশা করেছিল, তা নিরাশায় পরিণত হয়।
পরদিন অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টার মধ্যে বাংলাদেশে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী যদি নিঃশর্তে নিকটস্থ ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ ও পূর্ণ অস্ত্র সম্বরণ না করে, তবে তাদের আর কোনো সময় দেয়া হবে না যৌথবাহিনী প্রধান জেনারেল মানেকশের আদেশ। ভারতীয় বাহিনীর কাছে কিংবা মুক্তি বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করলে জেনেভা কনভেনশনের পূর্ণ সুযোগ দেয়া হবে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও একই ধরনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের কমান্ডার জেনারেল নিয়াজীর সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না।

বার্মা দিয়ে পালাতে চেয়েও পালানোর পথ ফাঁস হয়ে যাওয়াতে মিত্রবাহিনী সেটাও বন্ধ করে দেয় এবং ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ সকালে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে পাঠানো এক প্রস্তাবে নিয়াজী বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ বন্ধ করেছি। তবে বাংলাদেশে অবস্থানরত গোটা পাকবাহিনীকে চলে যেতে দিতে হবে, কাউকে গ্রেফতার করা চলবে না।’ ঢাকার মার্কিন দূতাবাস কর্মীরা দিল্লির মার্কিন দূতাবাসে সেই প্রস্তাব পাঠালে সেটি পাঠানো হয় ওয়াশিংটনে। ওয়াশিংটন নিয়াজীর এই প্রস্তাব নিয়ে দূতিয়ালি করতে গেলে সেটিকে সাময়িক যুদ্ধবিরতির কৌশল মনে করে ভারত সরকার নাকচ করে দেয়।

নিয়াজীর প্রস্তাবের জবাবে ১৫ ডিসেম্বর বিকেলে মিত্রবাহিনীর প্রধান জেনারেল মানেকশ জানান, শর্তহীনভাবে আত্মসমর্পণ করতে হবে। পরদিন ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সকাল ৯টার মধ্যে বেতারে জানাতে হবে বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ করছেন কিনা। তবে আন্তরিকতার নিদর্শন হিসেবে ১৫ ডিসেম্বর বিকেল ৫টা থেকে ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টা পর্যন্ত ঢাকার ওপর বিমান হামলা বন্ধ রাখতে হবে বলে পাকিস্তানি জেনারেলকে জানান মিত্রবাহিনী প্রধান।

এ সময় হানাদার বাহিনীকে হুঁশিয়ারি দিয়ে আরো জানানো হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শর্তহীন আত্মসমর্পণ না করলে ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টা থেকে সর্বশক্তি নিয়ে আক্রমণ করা ছাড়া মিত্রবাহিনীর কোনো গত্যন্তর থাকবে না।

বিষয়টি জেনারেল নিয়াজী তাৎক্ষণিকভাবে রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তান হেডকোয়ার্টারকে অবহিত করেন। তখনো জেনারেল নিয়াজী মার্কিন সপ্তম নৌবহরের সাহায্যের আশা করছিলেন এবং প্রহর গুনছিলেন। কিন্তু নিয়াজী যখন বুঝতে সক্ষম হন মার্কিন সপ্তম নৌবহর তার কোনো কাজে আসবে না, তখন আত্মসমর্পণের বিষয়ে অগ্রসর হন।

বাংলানিউজসিএ/ঢাকা/ ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ /এমএম


Array