বাংলানিউজসিএ ডেস্ক :: ইউরোপে গিয়ে ভাগ্য বদলাতে প্রতিবছর বাংলাদেশের হাজার হাজার তরুণ দেশ-বিদেশি মানব পাচারকারীদের প্রলোভনের শিকার হচ্ছেন। স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে তারা দালালদের কাছ থেকে কিনছেন ‘মৃত্যু পরোয়ানা’। ঝুঁকিপূর্ণ সাগরপথে ইউরোপে যাওয়া কিংবা পাচারের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বারবারই আসছে বাংলাদেশিদের নাম। কেন এ দেশের মানুষ এত ঝুঁকি নিচ্ছে সে প্রশ্ন অনেকের।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার দৃষ্টিতে লিবিয়া থেকে ভ‚মধ্যসাগর হয়ে ইউরোপে যাওয়ার পথটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। অথচ সেই ঝুঁকিপূর্ণ পথেই নিয়মিত ইউরোপে পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করছে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি। যাদের বড় অংশই সিলেটের। দালালদের হাত ধরে বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে দুর্গম পথে পা বাড়ায় তারা। ইউরোপ যেতে এমন ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ পথ বেছে নেয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, ইউরোপের দেশগুলো বিশেষ করে ব্রিটেনে যাওয়ার নিয়মকানুনে অতিরিক্ত কড়াকড়ি, দালালদের প্রলোভন, অভিবাসী আইন সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা, দেশে কর্মসংস্থানের অভাব, শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, চাকরি পেলেও চাহিদামতো বেতন না পাওয়াÑএসব নানা কারণে জীবনের ঝুঁকি নিতে পিছপা হচ্ছে না অনেকে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ইউরোপে যাওয়ার জন্য একটা সময় ‘স্পাউস ভিসা’ ছিল বড় সমাধান। ব্রিটেনে জš§ নেয়া ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তারা পাড়ি জমাতেন দেশটিতে। কিন্তু কয়েক বছর ধরে এই পথ অনেকটা বন্ধ হয়ে গেছে ব্রিটেনের কঠোর অভিবাসী আইনের কারণে। একই অবস্থা স্টুডেন্ট ভিসা, ভিজিট ভিসার বেলায়ও। তাছাড়া ব্রিটিশ ইমিগ্রেশন সেন্টার দিল্লিতে স্থানান্তরের পর ভিসা প্রাপ্তির পরিমাণ কমেছে। ফলে সিলেটের মানুষ বিকল্প উপায় হিসেবে এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছে।
ব্রিটেন থেকে দীর্ঘদিন ধরে এসব বিষয়ে কাজ করছেন ইমিগ্রেশন ল ইয়ার জাকির সাইমন। তিনি জানান, আগে নানাভাবে মানুষ ব্রিটেনে আসতে পারত। বিশেষ করে স্পাউস ভিসায় আসাটা ছিল তুলনামূলক সহজ। ভিজিট ভিসায়ও আসাটা তুলনামূলক সহজ ছিল। ব্রিটেনে বসবাসরত স্বজনদের কেউ স্পন্সর করলেই হতো। স্পন্সর দেখিয়ে অনেকে এখানে এসে পালিয়ে যেত। পরে নানাভাবে স্থায়িত্ব পেত। স্টুডেন্ট ভিসায়ও অনেকে আসতে পারত। কেউ কেউ রাজনৈতিক আশ্রয়ও নিত। এখন এসব সুযোগ আর নেই বলা যায়। কিন্তু ইউরোপে আসার যে প্রবণতা তা থেমে নেই। যে কারণে জীবনের শঙ্কা জেনেও তারা ঝুঁকি নিচ্ছে।অভিবাসন আইন নিয়ে নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য তরুণদের সর্বনাশা পথে পা বাড়াতে উদ্বুদ্ধ করছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘দালালরা বলছে ফ্রান্স, ইতালির মতো দেশগুলোর মাটিতে কষ্ট করে একবার পা ফেলতে পারলেই হলো। এসব দেশ তাড়িয়ে দেয় না। সহজেই নাগরিকত্ব দিয়ে দেয়। এসব শুনে চোখে রঙিন স্বপ্ন নিয়ে প্রতিনিয়ত মানুষ দালালদের পাতা ফাঁদে পা দিচ্ছে।
ভ‚মধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে বসবাসপ্রত্যাশী যেসব দেশের নাগরিক রয়েছেন, সেই তালিকার প্রথম দশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম এশিয়ার দুর্গম মরুপথ ও ঝুঁকিময় নৌপথ হয়ে অবৈধ উপায়ে ইউরোপে পাড়ি দিতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হওয়া মানুষের মধ্যে বাংলাদেশের নাগরিকের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্যানুযায়ী, ভ‚মধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে যত মানুষ ইউরোপে অনপ্রবেশ করেছেন, সেই তালিকার শীর্ষ দশ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ আছে ৮ নম্বরে।এ ছাড়া যেসব দেশ রয়েছে সেগুলো হচ্ছে গৃহযুদ্ধকবলিত সিরিয়া, নাইজেরিয়া, গায়ানা, আইভরি কোস্ট, মরক্কো, ইরাক, আলজেরিয়া, ইরিত্রিয়া ও গাম্বিয়া। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) তথ্যমতে, ইউরোপে এখন কাগজপত্রহীন অবস্থায় অর্থাৎ অবৈধভাবে বসবাস করছেন প্রায় এক লাখ বাংলাদেশি।
ইউএনএইচসিআরের ভাষ্য, ভ‚মধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপের পথে পা বাড়াতে গিয়ে চলতি বছরের প্রথম চার মাসে প্রতি তিনজনের একজন মারা গেছেন।
তবে বাংলাদেশের সব এলাকার লোক নয়, বিশেষ করে শরিয়তপুর, মাদারীপুর, নোয়াখালী, সিলেট এই অঞ্চলগুলোর লোকজনই অবৈধ পথে ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টা করে। ইতালিতে তাদের অনেক আত্মীয়-স্বজন থাকেন। তাই তারা মনে করেন, তাদের বোঝানো হয় কোনোভাবে একবার যেতে পারলেই আর কোনো সমস্যা নেই। তিনি বলেন, এটা শুরু হয় ২০১০ সালে, যখন লিবিয়ায় যুদ্ধাবস্থা ছিল। তখন সেখানে ৫০ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি ছিলেন। তাদের মধ্যে ৩৭ হাজার বাংলাদেশিকে দেশে নিয়ে আসা হয়। বাকি যারা থাকেন, তারা নানাভাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলে যান। আর সিরিয়া যুদ্ধের সময় আরো অনেক দেশের লোক ইউরোপমুখী হয়।
মানব পাচারকারীদের খপ্পর থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বিদেশগামী বাংলাদেশিরা বলছেন, মূলত উন্নত জীবনের আশায় এসব ঝুঁকিপূর্ণ পথে তারা দেশের বাইরে পা রাখেন। তবে সরকারের তথ্য অনুযায়ী দেশে দারিদ্র্যের হার কমেছে। ২০০৫ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪০ শতাংশ। বর্তমানে তা কমে হয়েছে ২১ শতাংশ। মোট দেশজ উৎপাদন গত চার বছরে অব্যাহতভাবে ৭ থেকে বেড়ে ৮ শতাংশ হয়েছে। একই সময় মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৪৬৫ ডলার থেকে বেড়ে ১ হাজার ৯০৯ ডলার হয়েছে। তবে এ সময়ে বেকারত্বের হার কমবেশি একই রকম থেকে গেছে। পছন্দমতো কাজ পাচ্ছেন না অন্তত ৬৬ লাখ নারী-পুরুষ।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, ভ‚মধ্যসাগর পেরিয়ে লিবিয়া থেকে ইউরোপে যাওয়ার পথটি হচ্ছে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ওই পথ দিয়ে ইতালি যাওয়ার সময় প্রতি ৫০ জনের ১ জন মারা গেছে। আর এ বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত অন্তত ১৭ হাজার অবৈধ অভিবাসী ভ‚মধ্যসাগর দিয়ে ইউরোপে ঢুকে পড়েছে। এ সময়ে সাগরে হারিয়ে গেছে অন্তত ৪৪৩ জন।
এর আগে ২০১৮ সালের অক্টোবরে মেক্সিকোর দুর্গম পথে প্রায় ২০০ বাংলাদেশি আটক হন। তাদের গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র। লসঅ্যাঞ্জেলেস টাইমস্ এর গত বছরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র পৌঁছাতে আগ্রহী অবৈধ অভিবাসীদের দুবাই থেকে ব্রাজিলে নেয়া হয়। এরপর বলিভিয়া, পেরু, ইকুয়েডর, পানামা সিটি আর গুয়াতেমালা হয়ে নেয়া হয় মেক্সিকোতে। এ বছরের ফেব্রæয়ারিতে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপে আটক করা হয় ১৯২ জন বাংলাদেশিকে। তাদের গন্তব্য ছিল মালয়েশিয়া। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ দপ্তরের (ইউনিডক) ২০১৮ সালের মানব পাচারবিষয়ক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিম ও দক্ষিণ ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্তত ৫ শতাংশ নাগরিককে পাওয়া গেছে। দক্ষিণ এশিয়া থেকে মানব পাচারের শিকার হওয়া এসব লোক মূলত ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের নাগরিক। এ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার লোকজন বিশ্বের ৪০টি দেশে মানব পাচারের শিকার হয়।ইউরোপের সীমান্তরক্ষী বাহিনীগুলোর সংগঠন ফ্রন্টেক্স-এর হিসাব অনুযায়ী গত এক দশকে ইউরোপের দেশগুলো থেকে ৫২ হাজার বাংলাদেশি বিভিন্ন রুট দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩২ হাজার ভ‚মধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ঢোকার চেষ্টা করেছে।
এ প্রসঙ্গে ব্র্যাকের অভিবাসন বিষয়ক কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় বিশ লাখ মানুষ ভ‚মধ্যসাগর পাড়ি দিয়েছেন। এভাবে সাগরপথে আসতে গিয়ে অন্তত ১৯ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন যার মধ্যে অনেক বাংলাদেশি রয়েছেন। কাজেই আমাদের এই মরণযাত্রা থামাতেই হবে। শুধু সমুদ্রপথ নয়, দুর্গম মরুপথে, তুষারপথে ও বনজঙ্গল পার হয়ে বিদেশে যেতে গিয়ে অনেকে জেলে যান। অনেকে মারা যান। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এভাবে বিদেশে যাওয়া বন্ধ করতেই হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্ন্তাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মুহা. রুহুল আমীন বলেন, মরিয়া হয়ে যারা বিদেশ যাচ্ছেন, তাদের অধিকাংশই বয়সে তরুণ। তাদের অনেকেই হয়তো স্কুল কিংবা কলেজের পাট চুকিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশে চাকুরির অভাব। কিন্তু তারা নিজেদের জন্য উন্নত ভবিষ্যৎ চান। মর্যাদাসম্পন্ন কাজ চান। আমরা কি সেটা দিতে পারছি? তাই ঝুঁকি নিয়ে তারা বিদেশে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রবৃদ্ধির উচ্চ হার দিয়ে এটা পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।
বাংলানিউজসিএ/ঢাকা/ ২২ নভেম্বর ২০১৯ /এমএম





