বাংলানিউজসিএ ডেস্ক :: চলতি শতাব্দীর শেষে, বাংলাদেশের উপক‚ল বরাবর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ দশমিক ৫ মিটার বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। ২১০০ সালের মধ্যে প্রতিবছর ৩ থেকে ১৫ বার নিয়মিত সর্বনাশা ঝড় ও অস্বাভাবিক উচ্চতার জোয়ারের শিকার হতে পারে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের জন্য পাঁচটি ঝুঁকি অপেক্ষা করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিভিন্ন গবেষণা বলছে, বিশ্বে উষ্ণতা বাড়লে বাংলাদেশের দুই অঞ্চলে যে সমস্যার সৃষ্টি হবে, তার প্রভাব সারাদেশেই পড়বে। জলবায়ু এতবেশি প্রতিকুল হয়ে উঠছে যে, লোকজনের স্থানান্তর বা অভিবাসনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশে প্রতিবছর আনুমানিক এক লাখ লোক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্থানান্তরিত হচ্ছে গ্রাম থেকে শহরে। বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি নিয়ে বিবিসি গত সোমবার প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের দ্য ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির কৃষি, পরিবেশ এবং উন্নয়ন অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জয়েস জে চেনের বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণা মত তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের প্রথাগত জীবনযাপন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। গ্রামের মানুষেরা বেঁচে থাকার প্রয়োজনে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ের নেয়ার চেষ্টা করছে। বন্যা উপদ্রæত দেশটির মানুষ নতুন নতুন বিষয় প্রবর্তন, পরিবর্তন যোগ্যতা, প্রাণোচ্ছ¡াসের সমন্বয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে রয়েছে। জয়েস জে চেন জলবায়ু পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যকার জটিল সম্পর্কের ওপর গবেষণা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের দ্য ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির কৃষি, পরিবেশ এবং উন্নয়ন অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জয়েস জে চেনের বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণালব্ধ মত তুলে ধরা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। জয়েস জে চেন জলবায়ু পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যের জটিল সম্পর্কের ওপর গবেষণা করছেন। বাংলাদেশ বিষয়ে তার মতামত নিয়ে বিবিসির প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন উইলিয়াম পার্ক।
অধ্যাপক জয়েস জে চেনের এই গবেষণাকে যৌক্তিক ও বাস্তব অবস্থার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বলে মনে করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এবং জাতিসংঘের জলবায়ুসংক্রান্ত প্যানেলে (আইপিসিসি) বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিনিধি একেএম সাইফুল ইসলাম। তবে তিনি এও বলেছেন, চেনের গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঝুঁকির বিষয়ের একটি দিক তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু এর কারণে নদীর পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাপনেও প্রভাব ফেলবে। তিনি আরো বলেন, ‘চেনের গবেষণায় এটি না আসায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ যে কতটা ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে আছে, তা বোঝা যায় না। তাই বাংলাদেশ নিয়ে এই গবেষণাকে একটি দিকের বলা যেতে পারে। অন্য দিকটাও ভয়াবহ।’
জয়েস জে চেন তার গবেষণায় বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি বাংলাদেশের গ্রামের মানুষের ওপর পর্বতসমান চাপ সৃষ্টি করেছে। স্থানচ্যুত হচ্ছে উপক‚লীয় এলাকার মানুষ। চলতি শতাব্দীর শেষে বাংলাদেশের উপক‚ল বরাবর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ দশমিক ৫ মিটার বাড়বে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন। এই সময়ে উপক‚লে অস্থিরতা চরম আকার ধারণ করবে। ভয়ঙ্কর ঝড় এবং অস্বাভাবিক উচ্চতার জোয়ার, তথা জলোচ্ছ¡াস এখন বাংলাদেশে প্রতি দশকে একবার করে আঘাত হানছে। ২১০০ সালের দিকে সেটা প্রতিবছর ৩ থেকে ১৫ বার নিয়মিত আঘাত হানতে পারে। বাংলাদেশে উপক‚লীয় এলাকার বড় শহরে অনেক অভিবাসন ঘটছে।
চেন সতর্ক করেছেন, এখনো অনেক মানুষ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অস্বাভাবিক উচ্চতার জোয়ারের কারণে ওই শহরগুলো ভবিষ্যতে বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। এর কারণে লাখ লাখ মানুষকে নতুন আশ্রয়ের সন্ধান করতে হতে পারে। জমিতে লবণাক্ততার কারণে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হবে। এ কারণে মানুষ শহরমুখী হবে।
বাংলাদেশের জন্য ৫ ঝুঁকি অপেক্ষা করছে মন্তব্য করে অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘মার্কিন গবেষক চেন তার গবেষণায় দেড় মিটার পানির উচ্চতা বৃদ্ধির কথা বলেছেন। কিন্তু এটা আমাদের হিসাবে এক মিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। যেটাই বাড়ুক, দক্ষিণাঞ্চলের জন্য মূলত পাঁচটি ঝুঁকি অপেক্ষা করছে। এগুলো হলো ১. লবণাক্ততা বেড়ে ফসল উৎপাদন কমবে, সুপেয় পানির অভাব দেখা দেবে, ২. বিশাল ভুখণ্ড পানির নিচে তলিয়ে যাবে, ৩. সুন্দরবনের ৪২ শতাংশ বিলুপ্ত হবে, তলিয়ে যাবে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ ৪. ঝড় ও জলোচ্ছ¡াস বাড়বে এবং ৫. ঝড়ে বাতাসের গতিবেগ (ইনটেনসিটি) বাড়বে।’
জয়েস জে চেন তার গবেষণায় আরো বলেন, উত্তরে নদুনদীর পানি বেড়ে যাওয়া ও একটা সময় আবার কমে যাওয়ায় এ অঞ্চলের মানুষ বন্যা, খরা, নদীভাঙন, কীটপতঙ্গবাহী রোগবালাই এবং এ অঞ্চলগুলোয় ড্রেনেজ সুবিধা নষ্ট করবে।
সাইফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ কার্বন নির্গমন ততটা করে না। তারপরও ব্যক্তি ও রাষ্ট্রকে এ ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। নিজ নিজ অবস্থান থেকে কার্বন নির্গমন কমাতে হবে। সুপেয় পানি ধরে রাখতে হবে। লবণাক্ততা কমাতে সরকারকে জমিতে লোনাপানির মাছ চাষ বন্ধ করতে হবে। এই অধ্যাপক বলেন, বেশি ভ‚মিকা রাখতে হবে যেসব দেশ বেশি মাত্রায় কার্বন নিঃসরণ করে, তাদের। যদিও সেখানে সমস্যা হয়েছে; যুক্তরাষ্ট্র প্যারিস চুক্তি থেকে সরে যেতে চাইছে। এতে কার্বন নিঃসরণ এবং অভিযোজনের জন্য গঠিত গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডে ১০০ বিলিয়ন ডলার কম হতে পারে। ফলে, এই তহবিল ব্যবহার করে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলার আওতাও কমে যাবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি নাসের খান বলেন, এখানে জনসংখ্যা অনেক বেশি। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অভিবাসন ও জমি পানির নিচে তলিয়ে গেলে তা ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি করবে। দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কাক্সিক্ষত মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হবে না। শহর এলাকায় জনবসতি হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেও হিমশিম খেতে হবে।
জলবাযু বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত জানান, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি বাংলাদেশের গ্রামের মানুষের ওপর পর্বতসমান চাপ সৃষ্টি করেছে। স্থানচ্যুত হচ্ছে উপক‚লীয় এলাকার মানুষ। চলতি শতাব্দীর শেষে, বাংলাদেশের উপক‚ল বরাবর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দেড় মিটার বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই সময়ে উপক‚লে অস্থিরতা চরম আকার ধারণ করবে। ভয়ঙ্কর ঝড় এবং অস্বাভাবিক উচ্চতার জোয়ার তথা জলোচ্ছ¡াস এখন বাংলাদেশে প্রতি দশকে একবার করে আঘাত হানছে। ২১০০ সালের মধ্যে সেটা প্রতিবছর ৩ থেকে ১৫ বার নিয়মিত আঘাত হানার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি আরো বলেন, চলতি শতাব্দীর শেষে, বাংলাদেশের উপকূল বরাবর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ দশমিক ৫ মিটার বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
২১০০ সালের মধ্যে প্রতিবছর ৩ থেকে ১৫ বার নিয়মিত সর্বনাশা ঝড় ও অস্বাভাবিক উচ্চতার জোয়ারের শিকার হতে পারে বাংলাদেশ। অতীতে দেখা গেছে, বার্ষিক বন্যা, নদীভাঙনের কারণে লোকজন স্থানান্তরিত হতো। এখন দেখা যাচ্ছে, লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে তা পরিবেশের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করছে। লবণাক্ত পানির কারণে জমি স্থায়ীভাবে বদলে যাওয়ায় ফসল ফলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি আরো বলেন, জমি বন্যায় ডুবে গেলে আগে লোকজন কয়েক মাসের জন্য কাজ করতে শহরে চলে যেত। বন্যার পানি নেমে গেলে ফিরে আসত। এখন আর সেটা সম্ভব হয় না। মানুষ উপলব্ধি করতে পারছে, এভাবে বেশি দিন টেকা যায় না।
কিছু ক্ষেত্রে, লবণাক্ত পানি কখনো কখনো সুযোগ সৃষ্টি করে। যেখানে ধান জš§াত এক সময়, সেটি এখন চিংড়ি চাষিদের দখলে চলে গেছে। এ ব্যাপারে অর্থনীতিবিদ চেন বলেন, ‘যখন আমরা দেখি, মানুষ কৃষি উৎপাদন থেকে অন্য কিছুতে সরে যাচ্ছে, পরিবারের লোকজনকে দেখে মনে হয়, তারা ফসল উৎপাদন থেকে সরে গিয়ে মাছ চাষের মতো জল-কৃষিতে বেশ ভালো করছে। তাদের বেশ উচ্ছলও দেখায়। তবে উৎপাদনের এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় তারা আজ যে খুশি থাকছে, তা ভবিষ্যতে টেকসই হওয়া জরুরি।’ তিনি বলেন, যদি বেশিসংখ্যক মানুষ এই পরিবর্তন আনে এবং যদি আরো বেশি লবণাক্ত পানি জমিতে ঢুকে যায় তাহলে তা নতুন সঙ্কট তৈরি করবে এবং এমনভাবে তা অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে যা মানুষের অনুমান করতে পারছে না।
বাংলানিউজসিএ/ঢাকা/ ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯/ এমএম





