Menu

প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক :: দেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের মধ্যে বসে নিবন্ধটি লিখতে গিয়ে স্বভাবতই দৃষ্টি যাচ্ছে বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে। এপ্রিলের শুরু থেকেই কমবেশি তাপপ্রবাহ চলছে দেশে এবং করতে হচ্ছে লোডশেডিং। এর আগে সেটা থাকলেও ছিল সহনীয় পর্যায়ে। তখন বিদ্যুতের চাহিদাও ছিল কম। বেশ ক’বছর ধরে মার্চ থেকেই অনুভূত হচ্ছে গ্রীষ্মের উত্তাপ। এপ্রিলে সেটা তীব্র রূপ নিচ্ছে। এ অবস্থায় বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে উঠছে এমনকি গ্রামেও।

এ সময়ে মাঠে থাকে প্রধান ফসল বোরো আর তাতে সেচের চাহিদা। কোথাও কোথাও অন্যান্য ফসলও থাকে। এ সময়টায় গ্রীষ্মকালীন সবজি ফলায় অনেকে। ফলের বাগান করার প্রবণতা বেড়েছে। তাতেও আছে সেচের চাহিদা। গরু-ছাগল, মাছ আর মুরগির খামারেও বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। গ্রামের দিকে আছে চালকল, বরফকল, হিমাগার, হাটবাজার। দ্রুত বেড়েছে কেব্ল নেটওয়ার্কে টিভি দেখা; সেলফোন আর তাতে ইন্টারনেটের ব্যবহার। রাস্তাঘাটে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের দাপট। অনেক সময় দুর্ঘটনার কারণ হলেও গ্রামজীবনের সচলতায় হালে এগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। আর এর সবকিছুতেই বেড়ে চলেছে বিদ্যুতের চাহিদা।

এ অবস্থায় সমস্যার দিক হলো, যখনই ‘লোডশেডিংয়ের প্রয়োজন’ উপস্থিত হয়, তখন গ্রামকে করা হয় বিদ্যুৎবঞ্চিত। দেশের সিংহভাগ এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান আরইবি বরাবরই জানায়, তাদের চাহিদামতো বিদ্যুৎ জোগানো হচ্ছে না। লোডশেডিং কখনো কখনো হয়ে উঠছে অসহনীয়। ব্যবসাবিষয়ক একটি সংবাদপত্র সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, উৎপাদিত বিদ্যুতের ৩৫ শতাংশই এখন জোগানো হচ্ছে ঢাকা অঞ্চলে। রাজধানীকে আবার দেওয়া হচ্ছে সবিশেষ গুরুত্ব। ঢাকা তো শিল্প-ব্যবসারও কেন্দ্র। রাজধানীর আশপাশে গড়ে উঠেছে অনেক শিল্পাঞ্চল। সেগুলোয় শুধু বিদ্যুৎ নয়; গ্যাস সরবরাহও ঠিক রাখতে চায় সরকার। কিন্তু পারে না। গ্যাসেও বড় ঘাটতি রয়েছে। চাহিদামতো গ্যাস জোগানো যাচ্ছে না দেশের ভেতর ও বাইরে থেকে এর প্রাপ্তি কম বলে। প্রাপ্তি অনিশ্চিতও। অথচ গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎও উৎপাদন করা হয়ে থাকে। সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ এখনো আসে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে।

গ্রিডের বিদ্যুৎ না পেলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও নিজস্ব প্লান্টে গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে কাজ চালায়। বাসাবাড়িতে অনেকে যেমন ডিজেল জেনারেটর ব্যবহার করে, তেমনি। সোলার প্যানেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে কিছু কাজ চালানোর প্রয়াসও রয়েছে। এটা ‘ক্লিন এনার্জি’ এবং ২০৩০ সাল নাগাদ এমন উৎস থেকে উৎপাদন বাড়িয়ে একটি লক্ষ্য অর্জনের ঘোষণা রয়েছে। এ মৌসুমে সূর্য যেভাবে দীর্ঘ সময় ধরে কিরণ ঢেলে চলেছে, তাতে যথাযথ প্রস্তুতি থাকলে এটাকে বিদ্যুতে রূপান্তর করে অনেক লাভবান হওয়া যেত। আমরা নেপাল, ভুটান থেকে আরেক ক্লিন এনার্জি জলবিদ্যুৎ আনারও চেষ্টায় রয়েছি। ভারতের ওপর দিয়ে আনতে হলেও এতে দাম অনেক কম পড়ার কথা। তবে নিশ্চয় ভালো হয় এমন সব ক্ষেত্রে আমদানির বদলে নিজ সক্ষমতা গড়ে তুলে তার ভিত্তিতে এগোনো গেলে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের ‘ক্যাপাসিটি’ কিন্তু যথেষ্ট পরিমাণে বাড়াতে সক্ষম হয়েছে সরকার। পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের মতো উচ্চাভিলাষী কাজেও নিয়োজিত হয়েছে। এসব কারণে সরকারের ব্যয়ভার এবং ঋণ পরিশোধের চাপও বেড়ে উঠছে ক্রমে। তা নিয়ে বাড়ছে আবার বিতর্ক। টানা তাপপ্রবাহে লোডশেডিংও যখন বেড়ে উঠছে এবং ‘এর’ চাহিদা পূরণ করে ‘ওকে’ বঞ্চিত করা হচ্ছে, তখন বিতর্কটা সামনে আসছে নতুন করে। বলা হচ্ছে, সরকার ক্যাপাসিটি অনেক বাড়িয়ে ফেললেও তা ব্যবহার করে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ জোগাতে পারছে না।

সরকার অবশ্য এর উৎপাদন থেকে ক্রমে সরে এসে বেসরকারি খাতকে জায়গা করে দিচ্ছে। সেটা নিয়েও বিতর্ক হতো না বা কম হতো চাহিদামতো বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে পারলে। শীতেই কেবল এটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে, তখন বিশেষত আবাসিক খাতে বিদ্যুৎ কম লাগছে বলে। কিন্তু শীতকাল তো ছোট হচ্ছে ক্রমে। দীর্ঘ হচ্ছে গ্রীষ্ম। বর্ষায়ও বিদ্যুতের চাহিদা তেমন কমে না গরম থাকে বলে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বৃষ্টিপাত কমে আসার প্রবণতাও রয়েছে। ফল-ফসল, বিশেষত দানাদার খাদ্যশস্য উৎপাদনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলেই ধারণা। এ অবস্থায়, বিশেষত খরা চলাকালে জমিতে পর্যাপ্ত সেচের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে বেশি।

বৃহদায়তন সেচকাজে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। মাটির অনেক গভীরে চলে যাওয়া পানি তুলতে সাবমার্সিবল পাম্প ব্যবহারেও বাড়ছে বিদ্যুৎ চাহিদা। এর বিকল্প হিসাবে ডিজেলের যে ব্যবহার রয়েছে, তাতে আবার আছে খরচ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি। ডিজেলের দাম ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছিল। সাম্প্রতিককালে ‘মূল্য সমন্বয়ের’ ধারায় অল্প পরিমাণে দাম কমলেও উৎপাদন ব্যয়ে এর দৃশ্যমান প্রভাব নেই। তাপপ্রবাহে বোরোসহ ফল-ফসল রক্ষায় সেচের নির্দেশনা থাকলেও চাষিরা স্পষ্টত বিপদে রয়েছে লোডশেডিং আর ডিজেলের উচ্চ দাম নিয়ে। এ সময়টায় স্বাভাবিক উষ্ণতা মোকাবিলায় অভ্যস্ত হলেও হালে যে ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে, তার প্রস্তুতি তো চাষিদের ছিল না।

যাদের জমির ধান পেকে এসেছে, তারাও মাঝারি থেকে তীব্র ও তীব্র থেকে অতি তীব্র তাপপ্রবাহে স্বাভাবিকভাবে ফসল তুলতে পারছেন না। জমিতে কৃষিশ্রমিক নিয়োজিত করা কঠিন এখন এবং তাদের দিতে হচ্ছে বাড়তি মজুরি। ধানের ভালো দাম পেলে অবশ্য চাষিদের পুষিয়ে যাবে। কিন্তু যাদের ধান এখনো পাকার অপেক্ষায়, তাদের কী হবে? কিছু জেলার বিপুলসংখ্যক মানুষ আমচাষের ওপর নির্ভরশীল। তাদের আমবাগানেরও বড় ক্ষতি হচ্ছে তাপপ্রবাহে। গাছের গোড়ায় এবং এর গায়ে তাদেরও পানি দিতে হবে বিপজ্জনকভাবে নেমে যাওয়া স্তর থেকে সেটা তুলে। এক্ষেত্রে বিদ্যুৎ পেলে সুবিধা হতো। যে ধরনের গরু ও মুরগির খামারে আমরা মনোযোগ নিবদ্ধ করেছি উৎপাদনশীলতার বিবেচনায়, সেখানে লোডশেডিংয়ে পড়ে খামারিদের কী অবস্থা, তারও বর্ণনা রয়েছে সংবাদপত্রে।

এরই মধ্যে তাপপ্রবাহে কুরবানির হাটে তোলার জন্য অপেক্ষমাণ অনেক গরু মারা গেছে। মোটাতাজা হওয়ার বদলে সেগুলোর ওজন কমছে। দেখা দিয়েছে রোধব্যাধি। অনেক গাভীর গর্ভপাত হয়েছে তীব্র গরমে। খামারে কমে গেছে দুধের উৎপাদন। দুধ আহরণকারী প্লান্টগুলোও পূর্ণ ক্ষমতায় পরিশোধন করতে পারছে না। যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সব খাতে স্বাভাবিকভাবে জোগানো গেলে এ পরিস্থিতি মোকাবিলা সহজ হতো। মুরগির খামারেও পড়েছে এর প্রভাব। ডিম উৎপাদন হ্রাসের আশঙ্কাও করা হচ্ছে। রেণুপোনা আর মাছ উৎপাদনে তাপপ্রবাহের ক্ষতিকর প্রভাবের খবরও কম মিলছে না। এ অবস্থায় খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার ইচ্ছা থাকলেও এর বাস্তবায়ন সহজ নয়।

গ্রামে যেসব সেবা খাতের বিকাশ ঘটেছিল, সেগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে লোডশেডিংয়ে। দৃশ্যত লেখাপড়ারও বড় ক্ষতি হচ্ছে। এ অবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখার চেষ্টায় সাফল্য মিলত সেখানে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা গেলে। ‘হিট স্ট্রোকে’ শিক্ষকের মৃত্যু ঘটলে শিক্ষার্থী নিয়ে দুশ্চিন্তা তো আরও বাড়ে। অনেক স্থানে পরিস্থিতি এমন যে, রাতেও তাপমাত্রা তেমন কমছে না এবং আর্দ্রতা বেশি থাকায় অধিক গরম অনুভূত হচ্ছে। তখন না যাচ্ছে সেচে, না যাচ্ছে ঘরে বিদ্যুৎ জোগানো। সেচ সংকটে সবজির সঙ্গে কাঁচামরিচের উৎপাদন ব্যাহত হয়ে গেলবারের মতো পরিস্থিতি হয় কিনা, সেটাই বা কে জানে!

আলু, পেঁয়াজ উত্তোলনের পর এর যথাযথ সংরক্ষণের প্রশ্ন কিন্তু রয়েছে। যেসব খাদ্যপণ্য আমদানি হয়ে পাইকারি পর্যায়ে আসছে, সেখানে সিলিং ফ্যান না চললে পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইউনিয়ন পর্যায়েও বিক্রি বেড়েছে চার্জার ফ্যান আর আইপিএসের। কিন্তু এগুলো দিয়ে তো খাদ্যপণ্যের গুদামে সংরক্ষণ সুবিধা নিশ্চিত করা যাবে না। গেলবারও তাপপ্রবাহ চলাকালে ‘কোল্ড চেইন’ নিয়ে আলাপ হয়েছিল। টানা তাপপ্রবাহে ওষুধের গুণমান রক্ষায় এটা জরুরি। অথচ গ্রামসহ দেশের শহরাঞ্চলেও বহু ওষুধের দোকান একটা কিংবা দুটি সিলিং ফ্যাননির্ভর। লোডশেডিংয়ে সেগুলোও বন্ধ থাকলে কী দাঁড়াবে পরিস্থিতি? ইনসুলিনসহ কিছু ওষুধ তো ফ্রিজে সংরক্ষণ করতে হয়। সরকারি হাসপাতাল আর ক্লিনিকেও ওষুধ সংরক্ষণ সুবিধা নির্ভরযোগ্য নয় বলে খবর মিলছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব জায়গায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে হবে।

সরকার বিদ্যুতের দাম অব্যাহতভাবে বাড়িয়ে এ খাতের ভর্তুকি থেকে রেহাই চাইছে। এটা হয়ে উঠেছে তার নীতি। কিন্তু সংকটকালেও যথেষ্ট পরিমাণ বিদ্যুৎ জোগাতে পারছে না। সাম্প্রতিককালে অবশ্য কয়লা ও গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ বৃদ্ধির পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববাজারে কয়লার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসায় সরকার চাইছে বেশি করে কয়লা এনে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পূর্ণ ক্ষমতায় চালিয়ে যতটা সম্ভব বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণ করতে। তাপপ্রবাহে কিন্তু শহরাঞ্চলেও বেড়েছে বিদ্যুতের চাহিদা। এসির ব্যবহারই শুধু বাড়েনি; খাদ্যপণ্য সংরক্ষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদ্যুতের প্রয়োজন বেড়েছে।

গার্মেন্টসহ রপ্তানি খাত সচল রাখতে হবে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রেখে। বিদেশি ক্রেতাদের দিক থেকে নাকি বাড়ছে দ্রুত পণ্য সরবরাহের তাগিদ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পণ্যের দাম কমে যাওয়ার চ্যালেঞ্জেও পড়ছে উদ্যোক্তারা। আর সার্বিকভাবে সব খাতের ব্যবসায়ীরা আছে ঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়ার সংকটে। তাপপ্রবাহে শিল্প-বাণিজ্য খাত কৃষির মতো করে ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও এর উদ্যোক্তারা যেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে নাকাল না হয়, সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। লোডশেডিং মোকাবিলায় শপিং সেন্টার খোলা রাখার সময় সংকুচিত করা হতে পারে বলে খবর রয়েছে। টানা তাপপ্রবাহে সেবা খাতের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পর্যটনও। এটা প্রলম্বিত হলে এ খাতে বিদ্যুতের চাহিদা তথা ব্যবহার অবশ্য কমবে। এসব সংকোচনের প্রভাব আবার থাকবে জিডিপিতে।

হাসান মামুন : সাংবাদিক, বিশ্লেষক

প্রবাস বাংলা ভয়েস /ঢাকা/ ০৫ মে ২০২৪ /এমএম