Menu


প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক ::‌  শেষমেশ বিএনপি নির্বাচনের ট্রেনে আর পা রাখলই না। আবারও তারা হরতাল-অবরোধ বা অগ্নিসংযোগের পথ বেছে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। সিলেটের গণসমাবেশে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেদিন তাদের এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। বলেছেন, দু-একটা মানুষ পুড়িয়ে সরকার ফেলে দেওয়া অত সহজ নয়। কিংবা এভাবে মানুষ পোড়াতে চাইলে তাদেরও হাত পুড়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, সরকার কোনো চাপে বা দুর্বল অবস্থানে নেই। থাকলেও তারা তা তোয়াক্কা করছে না।

২০১৪ সালেও বিএনপি একই ভুল করেছিল। তখনো তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের পরামর্শ দিয়ে একটি লেখা লিখেছিলাম। বিএনপি নির্বাচনে যোগদান না করলে পরবর্তীকালে রাজনৈতিকভাবে কী ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে তা-ও ওই লেখায় তুলে ধরেছিলাম। তারা যদি ওই ভুলটি তখন না করত, তাহলে দেশের রাজনৈতিক চেহারা আজ অন্যরকম হতে পারত। যা হোক, অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি না করাই ভালো। দেশ যেহেতু সামনের দিকে এগোচ্ছে, তাই সামনের বিষয়াদি নিয়েই কিছু বলার চেষ্টা করি।

আধুনিক প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নির্বাচনের বিকল্প নেই। তবে তা নামসর্বস্ব কোনো নির্বাচন হলে চলবে না, হতে হবে সবার অংশগ্রহণমূলক একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ৭ জানুয়ারি যে নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তা কতটুকু অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য বা ক্রেডিবল? একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের বৈশিষ্ট্য বা সংজ্ঞা কী? যে কোনো দেশে নিবন্ধিত সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে যে নির্বাচন, তা-ই সাধারণত গ্রহণযোগ্য বা ক্রেডিবল নির্বাচন বলে বিবেচিত। সে প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে বিএনপি ও তার সমমনা দলগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়া যে নির্বাচন হতে চলেছে, তা গণতন্ত্র রক্ষায় কতটুকু সফল বা কার্যকর হবে সেটাই ভাবার বিষয়।

নির্বাচন কার্যকর, সফল, অংশগ্রহণমূলক কিংবা গ্রহণযোগ্য হোক বা না হোক, আওয়ামী লীগ আবারও ক্ষমতায় আসবে, সরকার গঠন করবে এবং বহাল তবিয়তে দেশ পরিচালনা করবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। গত দুই টার্মের নির্বাচন ও সরকার গঠন আমাদের তা-ই বিশ্বাস করিয়ে দেয়। এমন নিষ্কণ্টক ও সহজ পথে ক্ষমতায় পৌঁছানোর কাজটি বস্তুত বিএনপিই আওয়ামী লীগকে করে দিয়েছে। নির্বাচনবিমুখতা শুধু অন্য দলকেই ক্ষমতায় নিয়ে যেতে সাহায্য করে না, নিজের দলকেও ধ্বংস করে দেয়। নেতানেত্রী ও কর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ততা ও জাগরণকে দমিয়ে দেয়।

বিএনপি বারবার সেই কাজটিই করে যাচ্ছে। ২০১৪ সালে নির্বাচনে অংশ না নেওয়া, ২০১৮ সালে আংশিক প্রত্যাহার ও আংশিক অংশ নেওয়া এবং নির্বাচিতদের কয়েকজন সংসদে যোগ দিয়ে আবারও পদত্যাগ করে বেরিয়ে আসা, এবার নির্বাচনে অংশ না নিয়ে আবারও হরতাল-অবরোধের রাজনীতিতে নিজেদের সম্পৃক্ত করা, নির্বাচন প্রক্রিয়া ভণ্ডুল করার চেষ্টা বা ক্ষমতার মসনদে যেতে বিদেশি প্রভু-মোড়লদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা-এ ধরনের আরও কিছু ভুল নিঃসন্দেহে বিএনপির ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএনপি শুধু সিরিজ ভুল করেই যাচ্ছে, কিন্তু ভুল থেকে কোনো শিক্ষা নিতে পারছে না। এটাই তাদের ট্র্যাজেডি। তবে আমি চাই, দলটি ভুলের পুনরাবৃত্তি থেকে বেরিয়ে এসে ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে ঘুরে দাঁড়াক। বিএনপির মতো শক্তিশালী দল ক্ষমতায় যাক বা না যাক, গণতন্ত্রকে আরও কার্যকর ও বলিষ্ঠ করে তোলার জন্য হলেও তাদের বিরোধী দলে থাকা অতীব বাঞ্ছনীয়।

বিএনপি ও তার সমমনা দলগুলোর অংশগ্রহণবিহীন যে নির্বাচন ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তা কোনো উৎসবমুখর নির্বাচন হবে বলে আমার মনে হয় না। এ নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক বা গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য যত চেষ্টাই করা হোক না কেন, বাস্তব সত্য এই যে, তা প্রকৃত অর্থে পূর্ণ অংশগ্রহণমূলক বা পূর্ণ গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আওতায় পড়বে না। তাছাড়া যে নির্বাচনে কোন দল ক্ষমতায় যাবে বা সরকার গঠন করবে, তা নিয়ে যখন কোনো শঙ্কা, ভয়ভীতি কাজ না করে অর্থাৎ আগে থেকেই সবাই জেনে যায় কোন দল ক্ষমতায় আসছে, সে নির্বাচন জনমনে খুব বেশি রেখাপাত করে না। সমমানের কুস্তিগির না হলে কি কুস্তি জমে? সে কুস্তি দেখে না জনগণ মজা পায়, না কুস্তিগির নিজে তৃপ্তি পায়!

বিএনপি অংশ নিলে নির্বাচনটি আরও জনসম্পৃক্ত, জমজমাট, উৎসবমুখর ও অর্থবহ হতে পারত। জনগণের ঘামে অর্জিত যে দেড় হাজার কোটি টাকা নির্বাচনি ব্যয় হিসাবে খরচ হচ্ছে, তা-ও কাজে লাগত। ভালো হোক, মন্দ হোক, যেহেতু বিএনপি তার সিদ্ধান্তে অনড় অর্থাৎ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না এবং সরকারও বিএনপির অংশগ্রহণ বা অংশগ্রহণকে তেমন গুরুত্ব বা পাত্তা না দিয়ে তাদের ছাড়াই নির্বাচনের পাল উড়িয়েছে, তাই আমরা আশা করব, অন্তত নির্বাচনটি যেন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রশ্নবিদ্ধবিহীন হয়। অসমান বা দুর্বল প্রতিপক্ষের সঙ্গে খেলতে গিয়েও যদি অনৈতিকতার আশ্রয় নিতে হয়, তাহলে তা হবে সত্যি পীড়াদায়ক।

ক’দিন আগেই বিজয়ের ৫২ বছর পূরণ করেছি আমরা। আমাদের পরিপক্ব হতে আর কত সময় লাগবে! মগজে, মননে কিংবা মাথায় আর অন্যায়লিপ্সা লালন না করে একটি সুন্দর নির্বাচন উপহার দিয়ে আমরা কি পারি না গণতন্ত্রের কলঙ্ক মোচন করে দিতে! তাই পূর্ণ অংশগ্রহণমূলক না হলেও আসছে নির্বাচনটিকে শতভাগ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করে তোলাই হোক বর্তমান সরকারের একমাত্র চ্যালেঞ্জ।

সাজেদুল চৌধুরী রুবেল : কবি ও প্রাবন্ধিক, লিমরিক, আয়ারল্যান্ড

প্রবাস বাংলা ভয়েস /ঢাকা/ ৩১ ডিসেম্বর ২০২৩ /এমএম