Menu

প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক ::‌  রাজধানী ঢাকায় প্রতিবছর তিন থেকে চার লাখ নতুন মানুষ যোগ হচ্ছে। এদের অধিকাংশই হতদরিদ্র। বাসাবাড়িতে থাকার আর্থিক সাধ্য না থাকায় তাদের থাকতে হয় বস্তিতে। পরে তাদের অনেককেই বস্তি থেকে উচ্ছেদ হয়ে ঠাঁই নিতে হয় ফুটপাতে। আর বাসা বাড়িতে যাদের বসবাস তাদের ৭০ শতাংশই নিজস্ব আবাসন না থাকায় ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকছেন। মাত্র ৩০ শতাংশ থাকছেন নিজের বাড়িতে। এ হিসাবে শেষ আদমশুমারি অনুযায়ী রাজধানীর জনসংখ্যা ২ কোটি ১০ লাখ ধরলে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ নিজস্ব আবাসনের বাইরে রয়ে গেছেন।

বিভিন্ন দেশে স্বল্পসুদে সরকার আবাসনের জন্য কম আয়ের মানুষকে ঋণ দিয়ে থাকে। বাংলাদেশে তা থাকলেও নানা জটিলতার কারণে এ ঋণের সুবিধা নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা পান না। এ কারণে সবার জন্য আবাসন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হলেও নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা আবাসন পাচ্ছেন না।সরকারের বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প থাকলেও এর সুবিধাভোগীরা হলেন— সরকারি কর্মকর্তা, সম্পদশালীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। বাস্তুহারা, দরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্তরা এসব সুবিধা পাচ্ছেন না। তবে বিভিন্ন কারণে বাস্তুহারা মানুষের জন্য রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্প।

আজ বিশ্ব বসতি দিবস। ১৯৮৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধীবেশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিবছরের অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘স্থিতিশীল নগর অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ও পুনরুদ্ধারে টেকসই নগরসমূহই চালিকাশক্তি’। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি উপলক্ষে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।

দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাণীতে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সংবিধানের ১৬ অনুচ্ছেদের আলোকে নগর ও গ্রাম অঞ্চলের জীবনযাত্রার মানের বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে আমাদের সরকার নানামুখী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। দেশের গৃহহীন-ভূমিহীনদের ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’ এর মাধ্যমে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। দেশে আর কোনো গৃহহীন-ভূমিহীন মানুষ থাকবে না।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙনসহ বিবিধ কারণে রাজধানীতে ঘরহীন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এসব মানুষের রাজধানীতে মাথা গোঁজার ঠাঁই হচ্ছে না। তারা বস্তি, ফুটপাত, বাস-লঞ্চ-ট্রেন স্টেশনে বাস করছেন। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট, রিহ্যাবসহ আবাসন খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙনসহ বিবিধ কারণে রাজধানীতে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এসব মানুষের রাজধানীতে মাথা গোঁজার ঠাঁই হচ্ছে না। তাঁরা বস্তি, ফুটপাত, বাস-লঞ্চ-ট্রেন স্টেশনে বাস করছেন।

তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে ৪০ লাখ মানুষ বস্তিতে বাস করেন। সরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গার ওপর ঘর তুলে বসবাস করেন তারা। এ রকম লোকের সংখ্যা রাজধানীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ।নগর গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘রাজধানীতে ৪০ লাখ মানুষ বস্তিতে বাস করেন। সরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গার ওপর ঘর তুলে তারা বাস করেন। এ রকম লোকের সংখ্যা রাজধানীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ। এ ছাড়া নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের প্রায় কারোরই রাজধানীতে নিজস্ব মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই।মানুষের আয়ের ৪০-৫০ শতাংশই চলে যাচ্ছে আবাসন খরচে। ফলে তারা যুগের পর যুগ নিজস্ব আবাসনের বাইরেই থেকে যাচ্ছেন।’

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন ঢাকায় নিজস্ব বাসস্থান গড়া এখন প্রায় অসম্ভব। ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘রাজধানীতে কিছু মানুষ ভাড়া বাসায় থাকবেন- এটাই স্বাভাবিক। তবে ঢাকায় এটা একেবারেই ভারসাম্যহীন। এখানে নিজস্ব বাসস্থানহীন মানুষ ৭০ শতাংশেরও বেশি। এসব মানুষের পক্ষে নিজস্ব আবাসনের ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তাদের আয়ের ৪০-৫০ শতাংশই চলে যাচ্ছে আবাসন খরচে। সরকারের যে হাউজিং পলিসির প্রয়োজন ছিল সেখানে একটি ঘাটতি রয়ে গেছে।’

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) গবেষণায় দেখা গেছে, গত ২১ বছরে ঢাকায় জমির দাম ২৭৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, যা ২৭ গুণেরও বেশি। একই সময়ে ফ্ল্যাটের দাম বেড়েছে ৭১৬ শতাংশ বা সাতগুণের ওপরে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটরি পলিসি রিভিউ রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালে গুলশান এলাকার এক কাঠা জমির দাম ছিল ২৫ হাজার টাকা। ১৯৯০ সালে এই দাম লাখের ঘরে চলে যায়। আর এর ৩০ বছর পর অর্থাৎ ২০২০ সাল নাগাদ এই এলাকার জমির দাম কাঠা প্রতি এসে দাঁড়িয়েছে পাঁচ কোটি টাকায়। যা বর্তমানে প্রায় ৬ দশমিক ২৫ কোটি টাকা।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘গত ২০ বছরে ঢাকা শহরে বাড়ি ভাড়া বেড়েছে প্রায় পাঁচগুণ। নগরীতে বসবাসকারী শতকরা ৮০ ভাগ মানুষের আয়ের ৬০ শতাংশের বেশি ব্যয় করতে হয়েছে বাড়ি ভাড়া বাবদ। অন্যদিকে জমি ও ফ্ল্যাটের দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। এ কারণেই সঞ্চয় করে ফ্ল্যাট কিনতে পারছেন না অধিকাংশ মানুষ।’

নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘এই ভারসাম্যহীন অবস্থা পরিবর্তনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য জমি বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন। অথচ দেখা গেছে, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য পূর্বাচলে ২ শতাংশ প্লট রাখা হয়েছিল। এটা অন্তত ২০ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন ছিল। এ ছাড়া স্বল্প সুদে ঋণ দিতে পারে সরকার। প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপে হাউজিং করতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকার অর্থায়নের মাধ্যমে সহযোগিতা করতে পারে।’

রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি কামাল মাহমুদ জানান, সরকার স্বাস্থ্য-চিকিৎসা-শিক্ষা খাতে ভর্তুকি দিয়ে থাকে। এসব মৌলিক চাহিদার মতো বাসস্থানও একটি। রাজধানীবাসীর আবাসনের জন্য সরকার এ খাতে কখনও ভর্তুকি দেয়নি। এমনকি স্বল্প সুদে কখনও দেয়নি ঋণ। সরকারের উচিত, স্বল্প সুদে ঋণ ও লো কস্ট হাউজিং নির্মাণ করে বরাদ্দ দেয়া।

প্রবাস বাংলা ভয়েস /ঢাকা/ ০২ অক্টোবর ২০২৩ /এমএম


Array