Menu

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ফের অনিশ্চয়তা

বাংলানিউজসিএ ডেস্ক :: ফের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া। আজ বৃহস্পতিবার থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কথা রয়েছে। নাগরিকত্ব, নিরাপত্তাসহ অন্তত চারটি শর্ত না মানলে কোনোভাবেই তারা দেশে ফেরত যাবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। এতে দ্বিতীয়বারের মতো ভেস্তে যেতে পারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া। এদিকে প্রত্যাবাসনের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে বলে দাবি সরকারি কর্মকর্তাদের।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রত্যাবাসনের জন্য চোখে পড়ার মতো কোনো প্রস্তুতি দেখা যায়নি। এদিকে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত মঙ্গলবার থেকে তালিকাভুক্তদের সাক্ষাৎকার নেয়া শুরু করে জাতিসংঘ। তালিকায় নাম থাকলেও দেশে ফেরার ব্যাপারে কোনো আগ্রহ নেই রোহিঙ্গাদের। তারা কৌশলে ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

বুধবার পর্যন্ত সাড়ে ৩ হাজার রোহিঙ্গার মধ্যে মাত্র দুই শতাধিক রোহিঙ্গা স্বদেশে ফিরে যেতে মত দিয়েছেন। সাক্ষাৎকারদাতারা জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা স্বীকৃতি ও ভিটেমাটি ফিরে না পেলে ফেরত যাবেন না। একই সঙ্গে নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রসঙ্গটিও উচ্চারিত হচ্ছে তাদের মুখে মুখে। বৃহস্পতিবার প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে কিনা সে বিষয়ে মুখ খোলেননি জাতিসংঘ এবং শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার।

রোহিঙ্গারা কী মতামত দিয়েছে- তা জানতে চাইলে কথা বলতে রাজি হননি বাংলাদেশের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের প্রতিনিধি এবং ২৬ ও ২৭ নম্বর ক্যাম্পের ইনচার্জ মোহাম্মদ খালেদ হোসেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরত পাঠাতে সব ধরনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই সেখানে পাঠানো হবে। মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে কাউকে চাপ দেয়া হবে না।

অন্যদিকে রোহিঙ্গা প্রতিরোধ ও প্রত্যাবাসন সংগ্রাম পরিষদের অভিযোগ, প্রত্যাবাসন বাধাগ্রস্ত করতে পাঁয়তারা করছে জাতিসংঘসহ দেশি-বিদেশি এনজিওগুলো। পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাহমুদুল হক চৌধুরী বলেন, বিশেষ করে ক্যাম্পের ভেতরে-বাইরে ইউএনএইচসিআরসহ যেসব এনজিও কাজ করছে তারা রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরত না যাওয়ার জন্য ইন্ধন দিচ্ছে। এখানকার সুযোগ-সুবিধা ছেড়ে অনিরাপদ স্থানে যাবে কিনা তা চিন্তার বিষয়।

অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের খবরে উদ্বেগ ও শঙ্কা প্রকাশ করে গতকাল বুধবার যৌথ বিবৃতি দিয়েছে মিয়ানমার ও বাংলাদেশে কর্মরত ৬১টি স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও)। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, দুই বছরেও ন্যায়বিচার পায়নি মিয়ানমারে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। তারা সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে সুরক্ষা ও মর্যাদার জন্য। সেই সঙ্গে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন খবরে তারা শঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন এবং নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের অংশগ্রহণ খুবই সীমিত। তাই ভবিষ্যৎ ও স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে তাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার সুরক্ষিত হয় না বলে মনে করে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মুহিব উল্লাহ বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা চাই, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হোক। তবে স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন হলে আমরাও সহযোগিতা করতে রাজি আছি। তবে এই মুহূর্তে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার কোনো পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। কেননা এখন পর্যন্ত সে দেশে যেসব রোহিঙ্গারা রয়েছে, তারা বন্দিজীবন কাটাচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘সম্প্রতি মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ের নেতৃত্বাধীন পরিদর্শনে আসা প্রতিনিধি দল আমাদের সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে। তাদের সঙ্গে কথা হবে প্রত্যাবাসন বিষয়ে। তার আগে প্রত্যাবাসন হলে রোহিঙ্গারা যেতে চাইবে না বলেও ধারণা করেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রোহিঙ্গা সেল মহাপরিচালক দেলোয়ার হোসেন বলেন, যে যাই বলুক, ২২ আগস্ট রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে সরকারের পক্ষ থেকে যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ইউএনএইচসিআরকে তিন হাজার ৪৫০ জন রোহিঙ্গার তালিকা দেয়া হয়েছে। যারা যেতে প্রস্তুত তাদেরই আজ ফেরত পাঠানো হতে পারে। আজ হোক কাল হোক এক কথায় তাদের যেতেই হবে মিয়ানমারে। কারণ তারা এদেশের নাগরিক নয়। কাজেই এদেশে তাদের স্থায়ীভাবে থাকার প্রশ্নই আসে না।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র জোসেফ ত্রিপুরা বলেন, আমাদের কাজ শুরু হয়ে গেছে। যেটিকে আমরা ‘ইনটেনশন সার্ভে’ বলছি। আগামী ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসন হতে পারে কিনা বলা যাচ্ছে না, আরো অপেক্ষা করতে হতে পারে।

২৬ নম্বর ক্যাম্পের এ-ব্লকের রোহিঙ্গা আব্দুল জব্বার (৪৫) বলেন, ‘ডবিøউএফপি, ইউএনএইচসিআর ও এক্সফাম সংস্থা রয়েছে। তারা প্রত্যাবাসন নিয়ে আমাদের বলেছে সরকার তোমাদের চলে যেতে বলছে; তোমরা কিভাবে যাবে’।

২৬ নম্বর ক্যাম্পের ডি-২ ব্লকের রোহিঙ্গার রশিদ উল্লাহ (৩০) বলেন, ‘ডব্লিউএফপি, ইউএনএইচসিআর ও এক্সফামসহ শতাধিক এনজিও রয়েছে। তারা আমাদের বলছে; স্বাভাবিক সুন্দরভাবে যদি বিচার হয় তাহলে তোমাদের দেশে পাঠাব। না হয় তোমাদের এখানে না মরা পর্যন্ত আমরা সাহায্য করে যাব এই কথাগুলো বলেছে।’

একই ব্লকের রোহিঙ্গা রশিদ আমিন (৪০) বলেন, চারটি শর্ত মেনে নিলেই তারপর মিয়ানমারে ফেরত যাব। শর্তগুলো হলো: পূর্ণ নাগরিকতার অধিকার, কোনো ট্রানজিট ক্যাম্প নয়, নিজ ভিটেতে ফিরবে তারা, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনের উপস্থিতি নিরাপত্তার খাতিরে এবং অন্যান্য নাগরিকের মতো নিরাপত্তা দিতে হবে। তাহলেই স্বেচ্ছায় স্বদেশে ফিরে যাব।

প্রত্যাবাসনের জন্য সাক্ষাৎকার দিয়ে বের হয়ে যাওয়ার সময় মোহাম্মদ ইলিয়াছ বলেছেন, ‘দাবি মানা না হলে আমরা ফিরে যাব না। প্রয়োজনে এখানে গুলি করে মেরে ফেলেন, তবুও ওপারে যাব না।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন শুরু করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। প্রাণ বাঁচাতে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সব মিলিয়ে উখিয়া-টেকনাফের ৩০টি শিবিরে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৫৭ জন। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। জাতিগত নিধন ও গণহত্যার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়।

বাংলানিউজসিএ/ঢাকা/ ২২ আগস্ট ২০১৯ / এমএম


Array