Menu

প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক ::‌ সিভিল অ্যাভিয়েশনের ইনস্ট্রাক্টর এবং রিজেন্ট এয়ারওয়েজের সাবেক প্রধান বৈমানিক (চিফ পাইলট) আজিজ আব্বাসী রফিক নিয়মিত বিমান চালান। বাংলাদেশের আকাশ তার খুব চেনা। ভূ-পৃষ্ঠের ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার ফুট উচ্চতায় প্রচুর মেঘের অবস্থান দেখতে পান তিনি। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, দেশে স্বাভাবিক মাত্রায় বৃষ্টিপাত হচ্ছে না। জুলাই মাসে ৫৭ শতাংশ, আগস্টে ৩৬ শতাংশের কম ও সেপ্টেম্বরে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। বায়ুমণ্ডলে বাড়ছে গরম, কমছে শীতের ব্যাপ্তি (সময়কাল)। আবহাওয়ায় বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে।

পাইলট আজিজ আব্বাসী রফিকের বক্তব্যের যথার্থতার প্রতিফলন দেখা যায় বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের পরিচালক এবং জলবায়ু বিজ্ঞানী প্রফেসর এ কে এম সাইফুল ইসলামের কথায়।তিনি বলেন, বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা এক ডিগ্রি বাড়লে ভাসমান ধূলিকণাগুলো ৭ শতাংশ বেশি পানি ধারণ করে রাখতে পারে। ঊর্ধ্বাকাশে বড় মেঘমালার বিচরণ প্রমাণ করে তাপমাত্রা বৃদ্ধির উপাত্ত সঠিক। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা আরও দুই-তিন ডিগ্রি বাড়তে পারে। তখন আরও বেশি মেঘ আকাশে উড়বে-ভাসবে, কিন্তু বৃষ্টি হবে না।

পরিবর্তন হচ্ছে আবহাওয়ার: সাগর থেকে জলীয় বাষ্প নিয়ে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব (কক্সবাজার-চট্টগ্রাম) দিক দিয়ে প্রতি বছর মৌসুমি বায়ু প্রবেশ করে জুনের প্রথম সপ্তাহে। জুনের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহে সারা দেশে এই বায়ু সঞ্চরিত হয় এবং বৃষ্টিপাত ঘটায়। কিন্তু এবার তা প্রবেশ করেছে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে। এবার জুলাই মাসে ৫৭ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। একই চিত্র দেখা গেছে আগস্টেও। এ মাসে ৩৬ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে দেশে বর্ষায় স্বাভাবিক বৃষ্টি হচ্ছে না।

অনেক সময় সেপ্টেম্বরের শেষে কিংবা অক্টোবরের শুরুতেও বর্ষার বৃষ্টি দেখা যায়। শীত অক্টোবর থেকে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও নভেম্বরের শেষে শুরু হচ্ছে। এ বিষয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক গণমাধ্যমকে বলেন, আবহাওয়ার উপাত্ত যা-ই হোক, বাস্তবে পার্থক্য ঠিকই অনুভব করা যাচ্ছে। আগে বর্ষাকালে টানা তিন-চার দিন বা এক সপ্তাহ বৃষ্টি হতো; এখন এক সপ্তাহের বৃষ্টি হচ্ছে এক-দুই ঘণ্টা সময়ে। বাকি সময়টা বৃষ্টিহীন থাকছে ও তাপমাত্রা বাড়ছে এবং আবহাওয়ার পার্থক্য অনুভ‚ত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে জীবনযাত্রা ও কৃষিতে। ওমর ফারুকের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির ওশানোগ্রাফি ও হাইড্রোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. আফতাব আলম খান। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, আমার বয়স ৭৫ বছর। এই দীর্ঘ জীবনে আবহাওয়ার উপাত্তগত তেমন পার্থক্য আমার চোখে পড়েনি। তবে আবহাওয়ার যে ধীরে ধীরে পরিবর্তন হচ্ছে, তা ঠিক অনুভব করা যাচ্ছে। বর্ষাকাল দীর্ঘায়িত হচ্ছে, আবার শীতকাল সংকুচিত হচ্ছে।

আবহাওয়ার পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে ওমর ফারুক বলেন, একসময় অক্টোবরে শীতের আভাস পাওয়া যেত। এখন শীত নভেম্বরের শেষে গিয়ে শুরু হয়। আবার ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে গরম শুরু হয়ে যায়। এগুলো ঠিকই আবহাওয়ার পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পড়েছি আমরা।

আবহাওয়াগত পরিবর্তন কেন হচ্ছে: আবহাওয়ার তথ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্রের এস এম কামরুল হাসান। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ফল ভোগ করছি আমরা। প্রতি বছর বিশ্বের গড় তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ৭৪ ডিগ্রি বাড়ছে। বাংলাদেশে বাড়ছে শূন্য দশমিক ৭০ ডিগ্রি হারে। তাপমাত্রা এখন বেশি রেকর্ড হচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণ কী?জবাবে এস এম কামরুল বলেন, বিশ্বজুড়ে জীবাস্ম জ্বালানির ব্যবহার, নগরায়ন এবং গ্রিন হাউস প্রভাবের কারণে তাপমাত্রা বাড়ছে।

এ বিষয়ে বুয়েটের প্রফেসর এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রাকৃতিক ও মানুসিক উভয় কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। প্রাকৃতিক কারণের ওপর মানুষের হাত নেই। তবে মনুষ্যজনিত কারণগুলোকে আমরা কমিয়ে আনতে পারি।তাপমাত্রা বাড়ার পেছনে মানুষের চেয়ে প্রাকৃতিক কারণ বেশি ভূমিকা রাখছে উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ‚গোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ড. শহীদুল ইসলাম বলেন, পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে প্রাকৃতিক কারণে উষ্ণ যুগ, বরফ যুগ-নানা যুগ দেখা দিয়েছে। তখন মানুষ কম ছিল। তাহলে পরিবর্তন কেন হলো?

তিনি বলেন, পৃথিবীতে বিভিন্ন এলাকায় আবহাওয়ার প্রকৃতিগত কিছু পরিবর্তন হয়। এসব পরিবর্তন চার-পাঁচ বছর মেয়াদি হয়ে থাকে। বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলে এখন তেমনই একটি পরিবর্তন ঘটছে।আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্রের এস এম কামরুল হাসান বলেন, আমাদের কাছে জলবায়ুগত উপাত্তের অভাব রয়েছে। এ বিষয়ে কথা বলতে হাজার হাজার বছরের উপাত্ত প্রয়োজন, অথচ বিশ্বে মাত্র ২০০ বছরের উপাত্ত রয়েছে নেদারল্যান্ডসের কাছে। তাই সঠিকভাবে কিছু বলা আসলেই কঠিন। তবে আবহাওয়ার যে পরিবর্তন হচ্ছে তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই।

সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে কৃষিতে: গরমের তীব্রতা বেড়ে যাওয়া, বর্ষায় বৃষ্টি কমে যাওয়া কিংবা শীতের ব্যাপ্তিকাল কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে কৃষিতে। বুয়েটের প্রফেসর এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, জলবায়ুর এই পরিবর্তনে কৃষিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশ পরিবর্তিত আবহাওয়ার উপযোগী শস্য উদ্ভাবন করছে যদিও, তারপরও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের অভিযোজিত হতে হবে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান বলেন, আমরা বন্যা, খরা ও লবণসহিষ্ণু জাতের ধান উদ্ভাবন করেছি। এই ধারা অব্যাহত থাকবে। যুগ যুগ ধরে পরিবর্তন ঘটেছে। আগে যেসব ফসল ছিল, সেসব বিলুপ্ত হয়ে গেছে; আবার নতুন জাতের আগমন ঘটেছে। পরিবর্তন মেনে নিতে হবে। নতুন নতুন জাতের উদ্ভাবন প্রমাণ করছে, জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে। এই পরিবর্তনের কারণেই আগের জাতের ধানগুলো ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বর্তমান আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খায় এমন জাতের ধান উদ্ভাবন করতে হচ্ছে।

আবার আমরা বরফ যুগে প্রবেশ করব: আবহাওয়ার পরিবর্তন ধারাবাহিক প্রক্রিয়া উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির ওশানোগ্রাফি ও হাইড্রোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. আফতাব আলম খান বলেন, পৃথিবী এখন সূর্যের কাছাকাছি আসছে, তাই তাপমাত্রা বাড়ছে। পৃথিবীতে অনেক যুগ এসেছে। এক যুগ থেকে আরেক যুগের ব্যাপ্তি ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ বছর। আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় আরও ৩৮ হাজার বছর পর আমরা বরফ যুগে প্রবেশ করব।প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে প্রধানত চারটি মৌসুম রয়েছে। প্রাক-বর্ষা (মার্চ-মে), বর্ষা (জুন-সেপ্টেম্বর), বর্ষা-পরবর্তী (অক্টোবর-নভেম্বর) এবং শীত (ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি)। বর্তমান ধারায় অনেক পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে।

প্রবাস বাংলা ভয়েস / ঢাকা / ০৮ জুন ২০২৩ /এমএম

 

 


Array