Menu

প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক ::‌ প্রচণ্ড শীতের কাঁপুনিতে দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের এখন জবুথবু অবস্থা। শীতবস্ত্রের অভাবে প্রচুর মানুষ ভীষণ কষ্টে আছেন। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষের পক্ষে এই শীতে জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে এবং দরিদ্র শ্রেণির মানুষদের আরও বেশি করে দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে। কারণ তাদের আয়-রোজগারের সবটুকু দিয়ে পেটের ক্ষুধা মেটাতে গিয়ে অবশেষে তারা শীতবস্ত্রের দিকে হাত বাড়াতে পারছেন না। এ অবস্থায় ধনসম্পদের অধিকারী মানুষদের কেউ কেউ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা নিতান্তই অপ্রতুল।

আমি নিজে উত্তরবঙ্গের মানুষ। সুতরাং শীতকালে এ অঞ্চলের মানুষকে যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়, আমি হাড়ে হাড়ে তা টের পাই। সেই ছোটবেলা থেকে এ অঞ্চলের শীতের সঙ্গে যুদ্ধ করা একজন মানুষ হিসাবে বুঝতে পারি কতটা অসহনীয় শীতের কষ্ট! আর বর্তমানে সেই কষ্টটাই উত্তরবঙ্গের খেটে খাওয়া মানুষের উপর আরও বেশি করে জেঁকে বসেছে। কারণ বিত্তবান শ্রেণির মানুষের পক্ষে শীতবস্ত্র সংস্থান করে শীত নিবারণ করতে পারা সম্ভব হলেও বিত্তহীনদের প্রচণ্ডভাবে শীতের কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে।

তা ছাড়া এ বছর শীতবস্ত্রের মূল্যও অত্যধিক বেড়ে গেছে। শীতবস্ত্র ব্যবসায়ীরাও এখন ডলারের মূল্যবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে চড়া মূল্য আদায় করছেন। ফলে দরিদ্র শ্রেণির মানুষের পক্ষে গরম কাপড় ক্রয় করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অথচ এক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা তেমনভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। আর এজন্য রাজনৈতিক দলাদলি-কোন্দলও কম দায়ী নয়।

কারণ বর্তমান অবস্থায় রাজনৈতিক ময়দানে যেসব তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে, তাতে একদল অন্য দলকে মোকাবিলা করতেই ব্যস্ত। অথচ এ প্রচণ্ড শীতের হাত থেকে অভাবী মানুষকে রক্ষা করতে রাজনৈতিক দলগুলোকে দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক অঙ্গীকার পূরণ করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তেমন কিছু না করে বরং তারা নিজেরাই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত আছেন।

যাক সে কথা। আমি আজ পনেরো দিন ধরে উত্তরবঙ্গে অবস্থান করায় শীতে মানুষের দুঃখ-কষ্ট দেখতে পেয়েছি বলেই কথাগুলোর অবতারণা করলাম। আর ডিসেম্বর মাস শেষ হলেও সরকারি সাহায্য বা সরকারি গুদামের কোনো শীতবস্ত্র দরিদ্র মানুষ পেয়েছেন বলে জানতে বা শুনতে পারলাম না। সরকারি রিলিফের কোনো কম্বল বিতরণের সংবাদও পেলাম না। আমার এলাকার কোনো ব্যক্তি বা পরিবার এমন সাহায্য পেয়েছেন বলেও শুনলাম না। অথচ প্রচণ্ড শীতে কাতর এসব অসহায় মানুষের এ সময়ে সরকারি সাহায্য প্রাপ্য ছিল।

রাস্তায় চলতে গিয়ে আজও অনেক নারী, পুরুষ, শিশুকে প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্র ছাড়াই চলাফেরা করতে দেখলাম। আরও দেখলাম, হ্রাসকৃত মূল্যের চালের দোকানে শত শত নারী-পুরুষের ভিড়। অথচ গত দুই তিন মাস আগেও সেখানে এতটা ভিড় দেখিনি। কারণ সে সময় পর্যন্ত কেবলমাত্র নিম্ন আয়ের দরিদ্র ব্যক্তিরাই ত্রিশ টাকা কেজির কমদামি চালের দোকানের লাইনে দাঁড়াতেন।

কিন্তু এখন নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তরাও একই লাইনে দাঁড়িয়ে হ্রাসকৃত মূল্যের চালের দোকানে লাইন দেওয়ায় দরিদ্রদের কোটা কমে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এ অবস্থা কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা বলা মুশকিল। কারণ পেটের ক্ষুধা, পেটের জ্বালা মিটিয়ে প্রচণ্ড শীতের কষ্ট মোকাবিলা করে এসব মানুষের টিকে থাকা যে কঠিন হয়ে পড়েছে, সে কথাটি বলাই বাহুল্য। অথচ এসব প্রান্তিক মানুষের জন্য কথা বলারও কেউ নেই। সবাই যে যার তালে ব্যস্ত আছেন!

আজকের দিনে তাই আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর কথা খুব বেশি করে মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে, মওলানা ভাসানী বেঁচে থাকলে এসব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দুঃখ-দুর্দশা দেখে হুংকার দিয়ে বলতেন, এসব মানুষের ভাত-কাপড়ের দায়ভার সরকারকেই নিতে হবে; তাদেরকে শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচাতে হবে।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, তিনিও নেই আর তার মতো কোনো নেতাও এখন নেই। আবার বঙ্গবন্ধুও দরিদ্র মানুষের দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে পারতেন না। তিনি বেঁচে থাকলেও এসব দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের পাশে নিজে এসে দাঁড়াতেন।

অসহায় দরিদ্র মানুষের দুঃখ-দুর্দশা স্বচক্ষে দেখার পর কথাগুলো না বলে থাকতে পারলাম না। আশা করি, কেউ ভুল বুঝবেন না। কারণ এখানে কাউকে খাটো করার উদ্দেশ্যে এসব বলা হয়নি। আজকের দিনে বঙ্গবন্ধুর কথা আরও বেশি করে উল্লেখের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছি। কারণ তিনি নিজেদের গোলার ধান উজাড় করে অসহায় দরিদ্র মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিতেন।

কিন্তু তার প্রতিষ্ঠিত দলের এমপি-মন্ত্রীদের কয়জনের মধ্যে সে গুণ আছে, সে প্রশ্নটি এখানে করাই যায়! আজ এ মুহূর্তে কোনো রাতে কোনো এমপি-মন্ত্রীর এলাকার কোনো পরিবার, কোনো মানুষ যদি ক্ষুধার্ত থাকেন, শীত বস্ত্রের অভাবে অসহনীয় কষ্ট পান, তাহলে সেই এমপি-মন্ত্রী কী জবাব দেবেন, সে প্রশ্নটিও প্রাসঙ্গিক বলেই মনে করি। কারণ যাদের ভোটে এমপি-মন্ত্রী হলাম, সেসব নীরিহ সাধারণ মানুষই যদি ক্ষুধার্ত থাকে, শীতে কষ্ট পায়, তাহলে তাদের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার কথা বলাও আত্মপ্রবঞ্চনাই বটে!

এক্ষেত্রে খলিফা ওমরের একটি দৃষ্টান্ত উল্লেখযোগ্য। খলিফা ওমর তার শাসনামলে রাতের বেলায় নিজে প্রজাদের সুখ দুঃখের খোঁজ নিতেন। সে অবস্থায় একরাতে তিনি একটি কুটির থেকে শিশুদের কান্নার আওয়াজ শুনে ভিতরে গিয়ে দেখতে পান, তাদের মা ক্ষুধার্ত শিশুদের সান্ত্বনা দিতে শূন্য পাতিলে পানি দিয়ে তা চুলায় বসিয়ে আগুনের তাপ দিচ্ছেন আর শিশুদের খাবার দিবেন বলে তাদের কান্না থামানোর চেষ্টা করছেন! সে অবস্থা প্রত্যক্ষ করে খলিফা ওমর বায়তুলমাল থেকে খাদ্য শস্য নিয়ে নিজের কাঁধে তা বহন করে ওই শিশুদের মায়ের কাছে পৌঁছে দেন এবং পরিবারটির দুর্ভোগের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

খেলাফায়ে রাশেদিনের যুগে খলিফা হজরত ওমরের (রা.) সেই ঘটনা আমরা সবাই জানলেও আমাদের এমপি মন্ত্রীদের কয়জন তা মনে রেখে দায়িত্ব পালন করেন, সেসব কথাও আমাদের জানা আছে; বরং উল্টো চিত্রটিই দেখতে পাওয়া যায়। নীরিহ ও দরিদ্র মানুষের ভোটে নির্বাচিত হওয়া এসব এমপি মন্ত্রীদের অনেকের বিরুদ্ধে টাকার পাহাড় গড়ে দেশ-বিদেশে তাদের আয়েশি জীবন যাপনের কথাও জানতে এবং শুনতে পাওয়া যায়!

উল্লেখ্য, যে মুহূর্তে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা কর্তৃক একদিকে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের অগ্রগতি সাধিত হচ্ছে, অন্যদিকে ঠিক তখনই আবার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ক্ষুন্নিবৃত্তি নিবারণসহ শীতের কষ্ট থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য লড়াই করতে হচ্ছে। বিশেষ করে এ মুহূর্তে উত্তরবঙ্গের মানুষকে শীত মোকাবিলা করতে হিমসিম খেতে হচ্ছে। ঘন কুয়াশায় আবৃত আকাশে সূর্যের দেখা না পাওয়ায় দিনে-রাতে তাদেরকে শীতের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হচ্ছে, খড়কুটো জ্বালিয়ে শরীরে তাপ গ্রহণের চেষ্টা করতে হচ্ছে! এভাবে উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলাসহ চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, কুষ্টিয়ার প্রায় ৫ কোটি মানুষ শীতের কষ্ট মোকাবিলা করে চলেছেন।

আর শীতকালে এ অঞ্চলের মানুষ যেমন শীতে কষ্ট পান, তেমনি গ্রীষ্মকালেও তীব্র তাপদাহে তারা পুড়তে থাকেন। কারণ বিষয়টি একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ (calamity) হিসাবে উত্তরবঙ্গবাসীর ভাগ্যে আবির্ভূত হয়ে থাকে। এই তো আগামী দুই তিন মাসের মধ্যেই পদ্মা, তিস্তা, ধরলাসহ উত্তরবঙ্গের সবগুলো নদী শুকিয়ে বিরাণ বালুভূমিতে পরিণত হবে। তখন আবার সেখানকার মানুষের ভাগ্যে আর এক ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে। আর এ অঞ্চলের মানুষের শীত গ্রীষ্মের বৈরিতা মোকাবিলায় সরকারি প্রস্তুতি, সরকারি সাহায্যের অপ্রতুলতার কারণে প্রতি বছরই দরিদ্র শ্রেণির মানুষকে যে অসহনীয় দুর্দশা ভোগ করতে হয় বা হচ্ছে, জনান্তিকে সেই কথাটিই এখনে তুলে ধরার চেষ্টা করা হলো।

আমরা উত্তরবঙ্গবাসীরা হিমালয়ের অনেকটা কাছাকাছি বসবাস করি বিধায় শীতকালে প্রচণ্ড শীতের মুখোমুখি হয়ে থাকি। আবার আমাদের নদীগুলোর উৎসমুখ হিমালয় পর্বত বিধায় সেখনকার প্রবাহিত পানি মাঝপথে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে ফেলায় গ্রীষ্মকালে আমাদের নদ-নদী শুকিয়ে যাওয়ায় আমরা পানির কষ্টে ভুগতে থাকি। বর্ষাকালে উজান হতে অধিক পানি ছেড়ে দেওয়ায় বন্যায় ভেসে যাই! আর এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের শেষোক্ত দুটি মনুষ্যসৃষ্ট হলেও যুগ যুগ ধরে সমস্যা দুটির সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে না। তিস্তা চুক্তিও কবে স্বাক্ষর হবে বা আদৌ হবে কিনা, একমাত্র ভারত সরকারই তা বলতে পারবেন!

লেখাটির উপসংহার টেনে বলতে চাই, যেহেতু শীতকালীন দুটি মাসের সমস্যা সমাধান আমাদের নিজের হাতে এবং নিজেদেরই তা সমাধান করতে হয় বা হবে; সুতরাং শীতকালীন মাস দুটিতে হিমবাহের হাত হতে উত্তরবঙ্গের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে সরকারি প্রস্তুতি তথা গরম কাপড়ের ত্রাণ সামগ্রীর যথার্থ মজুত এবং যথাযথ বিতরণের ওপর সরকারের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই-শীতার্ত মানুষ একটুকরো গরম কাপড় চায়, তারা রাজনৈতিক ক্ষমতা বা স্বরাজ চায় না। একজন উত্তরবঙ্গের মানুষ হিসাবে তাই এ বিষয়ে আমি আবারও সরকারের উদ্দেশ্যে বলতে চাই-এ শীতে উত্তরাঞ্চলের মানুষজন কেমন আছেন, সে বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

প্রবাস বাংলা ভয়েস/ঢাকা/ ০১ জানুয়ারি ২০২৩ /এমএম