Menu

প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক ::‌ সারাবিশ্বে ফুটবল একটি জনপ্রিয় খেলা আর বিশ্বকাপের আসর পৃথিবীর একটি অন্যতম বৃহৎ ক্রীড়া উৎসব। এই বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে রাজনীতি ছড়িয়েছে বিশ্বব্যাপী, বাদ পড়েনি ফুটবল ফেডারেশন ফিফাও। তবে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে সুসম্পর্ক বিনির্মাণে ক্রীড়ার যে ঐতিহ্য বা ভূমিকা তা আজ প্রশ্নবিদ্ধ।কোভিড মহামারী পরবর্তী বিশ্ব যখন ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট আর্থিক সংকটে নিমজ্জিত তখন পুরো বিশ্ব উপভোগ করল ফিফা বিশ্বকাপ ২০২২, স্বাগতিক রাষ্ট্র প্রথমবারের মতো মধ্যপ্রাচ্যের কাতার। মেসির পায়ের জাদু ৩য় বারের মতো আর্জেন্টিনার হাতে তুলে দিয়েছে বহুল প্রত্যাশিত বিশ্বকাপ। সে এক সোনা ঝরা স্মরণীয় মুহূর্ত, পুরো বিশ্ববাসী সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী।

এভাবে যুগে যুগে ক্রীড়া বা খেলাধুলা বিশ্ববাসীকে আনন্দে ভাসিয়ে কখনো এক করেছে, কখনো দূরত্ব কমিয়েছে। সাধারণ অর্থে কূটনীতি হচ্ছে কোনো রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পরিচালিত সরকারি কার্যক্রম। খেলাধুলা এমন একটি বিষয় যা দেশে দেশে সমাদৃত। এই খেলাধুলাকে কাজে লাগিয়ে যখন রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের সামাজিক, কূটনীতিক, রাজনৈতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে তখন তাকে আমরা ক্রীড়া কূটনীতি বলে থাকি।

খেলাধুলা এবং রাজনীতি প্রত্যক্ষভাবে একে অন্যের সঙ্গে জড়িত। ইতিহাসের ওপর খেলাধুলার নেতিবাচক আর ইতিবাচক প্রভাব যাই হোক না কেন ক্রীড়া প্রকৃতপক্ষে সাংস্কৃতিক দূরত্ব ঘোচায়, জনগণকে এক করে এবং প্রচলিত জীবনধারায় প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনে।যদিও অলিম্পিক হচ্ছে সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক ক্রীড়ার উদাহরণ যা কূটনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল, তারপরও ফুটবল, ক্রিকেট এবং অন্যান্য ক্রীড়াসমূহও নানা সময়ে রাজনৈতিক প্রত্যাশায় ব্যবহৃত হয়েছে।

পাকিস্তানের ক্রিকেটার ইমরান খান, লাইবেরিয়ার ফুটবলার জর্জ ওয়েহসহ অনেক ক্রীড়াবিদ পেশাগত জীবনের এক পর্যায়ে রাজনীতিবিদ হিসেবে ও আত্মপ্রকাশ করেছেন।জাতীয়তাবাদ এবং ক্রীড়া প্রায়শ একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ খেলাধুলা আসলে রাষ্ট্রকে জেতানোর উদ্দেশ্যে জাতিগুলো পরস্পর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। আর তাই ক্রীড়া অনেকসময় জাতীয় সংঘাতকেও ফুটিয়ে তুলে আবার অনেক সময় সফল কূটনীতির উদাহরণ হয়েও ধরা দেয়।ক্রীড়ার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাজনীতির টুল হওয়া খেলাধুলার নৈতিকতার সাথে না মিললেও বারে বারে বিশ্ব রাজনীতিতে খেলাধুলা একটি টুল হয়ে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

১৯৭১ সালের এপ্রিলে চীনের মাটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেবিল টেনিস খেলার মাধ্যমে পিং-পং ডিপ্লোম্যাসি ব্যাপক আলোচনা লাভ করে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ২০ বছর পর কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়। ১৯৭১ সালে চীনের চেয়ারম্যান মাও সে তুংয়ের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে চীন সফর করে যুক্তরাষ্ট্র পিংপং দল।পরের বছর ফিরতি আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র যায় চীনা পিংপং দল। এর মাধ্যমে অবসান ঘটে ২০ বছর ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-চীন কূটনৈতিক দ্বন্দ্বের এবং নতুন করে দুই রাষ্ট্রের মাঝে বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়।

এরূপ আরও অনেক ঘটনা রয়েছে যা প্রমাণ করে খেলাধুলা আসলে মাঠে হলেও বিশ্ব রাজনীতির মাঠেও এইসব খেলাধুলার অত্যন্ত গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রয়েছে। নিজেদের মধ্যকার মানসিক, রাজনৈতিক দূরত্ব কমিয়ে আনার জন্যই এসব ক্রীড়ার আয়োজন করা হলেও এসব খেলাধুলা ব্যাপক সামাজিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক প্রবণতা ও দ্বন্দ্বকে প্রতিফলিত করে।

প্রশ্ন করা যেতে পারে ক্রীড়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলো মূলত সহযোগিতার হাত বাড়ায় নাকি পরস্পর বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়ে? সম্প্রতি হয়ে যাওয়া বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২২ এর কথায় ধরা যাক।তেলের দেশ কাতারকে এর ভেন্যু হিসেবে সিলেকশন থেকে শুরু করে সব ধরনের ইস্যু নিয়ে খেলার মাঠের বাইরে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। এছাড়াও রয়েছে রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্ক।

সংবাদ মাধ্যমগুলো বলছে, ফিফা কর্তৃক ইউরোপীয় ফুটবল দলগুলোর আদেশ বাতিল করে দেওয়া, নারী দর্শকদের অধিকারে হস্তক্ষেপ, মরুভূমিতে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত স্টেডিয়াম তৈরিতে অভিবাসী কর্মীদের সঙ্গে বিরূপ আচরণ এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে অ্যালকোহলের প্রাপ্যতা নিয়ে বিতর্কগুলো দেখা দেয় বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেভাগেই।

বলা হচ্ছে, এই খেলার ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে ন্যূনতম সম্পর্ক নেই এমন একটি দেশে বিশ্বকাপের আয়োজন করা হয়েছে কেবল তেল সম্পদের কথা বিবেচনা করে।বিশ্বকাপ এমন একটি বৃহৎ ঘটনা যা বিশ্ব ঐক্যকে প্রতিফলিত করতে পারে আবার বিশ্ব দ্বন্দ্বকেও উসকে দিতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ বিদেশি এক সংবাদ মাধ্যমের বরাত দিয়ে বলতে চাই, এইবারের ফিফা বিশ্বকাপে ইরানের খেলোয়াড়েরা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে উদ্বোধনী খেলায় তাদের জাতীয় সংগীত গাইতে অস্বীকৃতি জানায়। এর মাধ্যমে তারা ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানে ভিন্নমতের মানুষদের বিক্ষোভ দমনে সরকার যে সহিংস পদক্ষেপ নিচ্ছে, তার প্রতিবাদ জানিয়েছে।

এছাড়াও এই আয়োজন ভূ-রাজনৈতিক কিছু বিষয় মাথায় রেখেও করা হয়েছে বলে জোর বক্তব্য আসছে। কোভিড মহামারী মোকাবেলা করতে গিয়ে এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ইউক্রেনের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে বর্তমানে পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন উদারনৈতিক বিশ্ব ব্যবস্থা একটি অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। জ্বালানি তেলের সংকটে পুরনো বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো কেঁপে উঠছে। উপসাগরের অতি ধনী তেল ও গ্যাস জায়ান্টদের একটি ছোট্ট দল কীভাবে তাদের ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশগুলোর কাতারে শামিল হতে পারে এবং পর্যটন, বিনোদন ও খেলাধুলার উত্তরাধিকার তৈরি করতে পারে, কাতার বিশ্বকাপ হলো এখন পর্যন্ত তার সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

যখন তাদের জ্বালানি শক্তির মজুত শেষের পথে, তখন কীভাবে টিকে থাকতে হয় তা ভালো করেই জানে পশ্চিমারা। এজন্য প্রয়োজনে তারা উদারনৈতিক মূল্যবোধকে উপেক্ষা করতেও প্রস্তুত। এই টুর্নামেন্ট পশ্চিমা দেশের ক্রীড়া দল ও লিগ, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে তাদের মূল্যবোধের জন্য হুমকি হলেও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত নগদ অর্থের একটি অংশ দখল করার জন্য একটি পরীক্ষামূলক ঘটনাও বটে, বলতে দ্বিধা করছেন না বিশ্লেষকেরা।

দুঃখজনক হলেও সত্য এই যে, শুধুমাত্র সম্প্রীতির জাগরণের উদ্দেশ্যে আয়োজিত হলেও যুগ যুগ ধরে দেশগুলোর মধ্যকার রাজনীতি এবং প্রতিযোগিতার একটি বিশেষ মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ক্রীড়া। রাষ্ট্রগুলো এবং তার জনগণ নিজ নিজ স্বার্থে বিশেষ করে ক্ষমতাবান দেশগুলো নিজের মতো করেই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছেন। অভিযোগ উঠেছে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ইসরাইল এর সাথে সম্পর্ক ভাল করতে সৌদি খেলাধুলার মাধ্যমে ইসরাইলকে অনানুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। সৌদিতে অনুষ্ঠিত একটি ক্রীড়া ইভেন্টে প্রথমবার কোনো ইসরায়েলি খেলোয়াড় অংশগ্রহণ করায় ধারণা করা হচ্ছে, হয়তো খেলাধুলার মাধ্যমেই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে এগিয়ে যাচ্ছে দেশটি।

ধারণা করা হচ্ছে, সৌদি আরব ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন না করলেও আঞ্চলিক প্রতিযোগী ইরানকে প্রতিহত করতে গোপনে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক ভাল করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সৌদি আরব।আমরা দেখতে পাই, নিজ দলকে সমর্থন করতে গিয়ে উগ্র জাতীয়তাবাদ অনেক সময় অস্বাভাবিক পরিস্থিতির জন্ম দেয় যা কখনোই ক্রীড়ার উদ্দেশ্য হতে পারে না। ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক পক্ষপাত খেলাধুলার প্রকৃত আবেদনকে খর্ব করে বলে আমি মনে করি।

তবে আশার কথা হচ্ছে এই ফুটবল, ক্রিকেট, বক্সিং, টেনিস ইত্যাদি খেলা রাষ্ট্রসমূহকে অনেক সময় নিজেদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব তৈরিতে সাহায্য করে। আমরা দেখতে পাই, আন্তর্জাতিক খেলা শুরু হবার আগে অনেক সময় রাষ্ট্রপ্রধানরা নিজেদের মধ্যে ফোনে বা লিখিত বার্তায় শুভেচ্ছা বিনিময় করে থাকেন। খেলা শেষে জিতে যাওয়া দেশকে সরকার প্রধানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিগণ অভিনন্দন জানিয়ে থাকেন যা বিশ্ব মৈত্রী সৃষ্টিতে অত্যন্ত কার্যকর।

ক্রীড়া একটি চমৎকার ইতিবাচক ঘটনা, ইতিহাস বলছে খেলাধুলার মাধ্যমে অনেক সময় পৃথিবীর অনেক দেশ নিজেদের মধ্যে দূরত্ব ভুলে কূটনৈতিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়েছে। তাই একটি ইতিবাচক বিষয়কে নেতিবাচক প্রতিযোগিতায় উন্নীত না করে ইতিবাচক সম্পর্ক স্থাপনে ব্যবহার করা সমীচীন বলে আমি মনে করি।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রবাস বাংলা ভয়েস/ঢাকা/ ২৬ ডিসেম্বর ২০২২ /এমএম