Menu

মোঃ মাহমুদ হাসান  ::‌ সমাজে কত অঘটন ঘটে যায়, চোখ ফিরিয়ে সেদিকে দেখার সময় মেলানো-ই ভার। তবুও মাঝে মাঝে কিছু ঘটনা এড়িয়ে যাওয়ার ফুসরত নেই। আবার কিছু কিছু ঘটনা হ্রদয় মনের আনন্দকে ভীষণ ভাবে ম্লান করে দেয়। আমাদের সমাজে যাঁরা নেতৃত্বের আসনে সমাসীন, এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে ‘বিচ্ছিন্ন’ বলে উড়িয়ে দিতেই তাঁরা অভ্যস্ত। আর তিনি যদি সরকারের বড় আমলা হন, সমাজে ঘটে যাওয়া ছোট ছোট ঘটনার দিকে চোখ ফেরালে যেন, তাঁর ভাবগাম্ভীর্যেরই অধঃপতন ঘটে!! তাই এসব ঘটনাকে নীরবে এড়িয়ে যেতেই তাঁরা স্বাচ্ছ্যন্দবোধ করেন।

গত ১৩ ই নভেম্বর ‘আজকের পত্রিকা’র একটি সংবাদ দেখে মনোজগতে তোলপাড় বয়ে যাচ্ছিলো। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শাহজালাল হলের সামনের প্রয়াস রেষ্টুরেন্টের মালিক অলিমউদ্দিন। চৌত্রিশ বছর আগে বরিশালে পৈত্রিক সম্পত্তি বিক্রি করে চালু করেছিলেন রেষ্টুরেন্ট ব্যবসা। যুগ যুগ সেবা দিয়েছেন তরুণ শিক্ষার্থীদের। তিন দশকের বেশি সময় বাকির চাপ সামলিয়েছেন। আর সইতে না পেরে অতি সম্প্রতি শুন্য হাতে বাড়ি ফিরেছেন। বাকি খাওয়া শিক্ষার্থীদের প্রতি কিছু হ্রদয় বিদারক আবেদনও তিনি জানিয়েছেন।

‘আজকের পত্রিকা’র এ সংবাদটিকে উদধৃত করে টরেন্টো থেকে প্রকাশিত ‘নতুনদেশ’ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক শওগাত আলী সাগর ফেসবুকে একটি স্টাটাস দিয়েছিলেন। একজন দায়িত্বশীল সমাজ সচেতন নাগরিক ও সাবেক চবিয়ান হিসেবে ফেসবুকে উনার বিবৃতিটি মোটেও অপ্রত্যাশিত নয়। তবে উনার বিবৃতিকে উদধৃত করে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন আমলার এগিয়ে আসার আহ্বানে একজন চবিয়ান হিসেবে গর্ববোধ না করে উপায় নেই।

সাবেক চবিয়ান আবু হেনা মোরশেদ জামান সরকারের একজন সচিব। কোভিডকালে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের দুর্নীতি অনাচার নিয়ে চারিদিকে যখন তুলকালাম, তখন শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে মোরশেদ জামান কে মহাপরিচালক নিয়োগের মাধ্যমে তার উপর সরকারের আস্থার প্রমাণ মিলেছিল। সকল চাপকে উপেক্ষা করে তিনি সেখানে সুচারুভাবে সততা আর দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছিলেন বলেই নানা তথ্যে জানা যায়। নরসিংদীতে তাঁর জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন কালীন সময়কে এখনো সেখানকার মানুষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। আমলা হিসেবে এর সবই তাঁর দায়িত্ব পালনের অংশ। এর বাইরে একজন মানবিক চবিয়ান হিসেবে তাঁর নতুন পরিচয় আমাকে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় আপ্লুত করেছে।

সাবেক চবিয়ান মোরশেদ জামান নিঃস্ব অলি উদ্দিনের পাশে দাঁড়াতে সকল চবিয়ানদের প্রতি একটি মানবিক আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত তার এই আহবানটিতে এগিয়ে আসতে অনেকেই আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। সরকারি দায়িত্বের সীমাবদ্ধতা আর ব্যস্ততার কারণে তিনি হয়তো দায়িত্ব নিয়ে পুরো বিষয়টিকে দেখভাল করতে পারবেন না, তাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাইদের বিভিন্ন সংগঠনকে এগিয়ে আসতে বিনীত অনুরোধ জানিয়েছেন। তাঁর এই ‘ঋন শোধ’ করার আবেদনে চবিয়ানরা এগিয়ে আসলে এটি চবিয়ানদের মানবিক মূল্যবোধের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশন সাবেক চবিয়ানদের সবচেয়ে বৃহত্তম ফোরাম। তার পাশাপাশি ঢাকাস্থ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাব, চট্টগ্রাম, সিলেট, ফেনী, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদের নিয়ে নানা রকম সমাজসেবামূলক সংগঠন গড়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের গর্বিত চবিয়ান এলামনাইদের নানা সংগঠন আছে। সমন্বয়কের দায়িত্ব নিয়ে কোন একটি সংগঠন যদি অলি উদ্দিনের পাশে দাঁড়ানোর মানবিক আহ্বানটিতে এগিয়ে আসেন, ক্ষয়িষ্ণু এই সমাজ ব্যবস্থায় এটি নিঃসন্দেহে একটি গর্বিত সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হবে।

প্রাণের বিদ্যাপীঠ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের নানাভাবেই আলোড়িত করে। কেবিনেট সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মূখ্য সচিব, মহা হিসাব নিরীক্ষক, পুলিশ প্রধান থেকে শুরু করে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সাবেক চবিয়ানদের উপস্থিতি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র হিসেবে আমাদের সকলকেই গর্বিত করে। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধেও এ বিশ্ববিদ্যালয়টির অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। অলি উদ্দিনের নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার এই ঘটনা, আমাদের গৌরবোজ্জ্বল জীবনে কলঙ্কের তিলক পরিয়ে দেয়। এ থেকে দায়মুক্তির দায়িত্ব সাবেক চবিয়ান হিসেবে আমাদের সকলের উপরই বর্তায়।

অধ্যাপক ডঃ জামাল নজরুল ইসলাম, ডঃ মোহাম্মদ ইউনুস, ডঃ আনিসুজ্জামান, ডঃ অনুপম সেনের মতো গুণীজন যে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে আলোকিত করেছেন, প্রকৃতি অগাধ ভালোবাসা দিয়ে যে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে মনের মতো করে সাজিয়েছেন, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা জ্ঞান-বিজ্ঞান আর গবেষণায় জাতিকে ধন্য করবে, এটি আমজনতা সকলেরই প্রত্যাশা। তবে মানবতা বিবর্জিত শিক্ষা সকল অর্জনকেই ম্লান করে দেয়। ‘অলি উদ্দিন’ এর নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার ঘটনা পক্ষান্তরে আমাদের সকল অর্জনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলে।

বিশ্ববিদ্যালয় দিবস ও সমাবর্তন উৎসবকে ঘিরে চবিয়ানদের সকল সংগঠনেই এখন সাজ সাজ রব। কলঙ্কের তিলক মাথায় নিয়ে আনন্দ উৎসব করলে সামাজিক মূল্যবোধের দায় এড়ানো সম্ভব নয়। সুনির্দিষ্টভাবে দায়টি যারই হোক, বৃহত্তম পরিবারের অংশ হিসেবে, এটি আমাদের সকলকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। চবিয়ানদের মাঝে অনেক গুণীজন আছেন, যাঁরা সমাজকর্মের মাধ্যমে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাই আসুন, এসব গুণীজনদের সাথে নিয়ে সতীর্থ মোরশেদ জামানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ‘ অলি উদ্দিনের’ পাশে থেকে প্রিয় বিদ্যাপীঠ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জ্বল ধারাকে অব্যাহত রাখি।

লেখক : কলামিস্ট, উন্নয়ন গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক

প্রবাস বাংলা ভয়েস/ঢাকা/ ১৫ নভেম্বর ২০২২ /এমএম