Menu

প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক ::‌  চট্টগ্রাম নগরীর পাশেই ইতিহাস-ঐতিহ্যমণ্ডিত সিআরবি পাহাড়ি উদ্যান ধ্বংস করে হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে সরকার সরে এসেছে। গত ৫ নভেম্বর সিআরবি এলাকায় অনুষ্ঠিত এক মহাসমাবেশে সরকারের উচ্চপর্যায়ের এ সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে সিআরবি উদ্যান রক্ষার লক্ষ্যে আন্দোলন ও প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল।

শনিবারের মহাসমাবেশে সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর দীর্ঘ ৪৮৩ দিন শেষে প্রতিবাদ কর্মসূচি বন্ধ হয়। সরকারের সিদ্ধান্ত জানার পর চট্টগ্রামবাসী ও দেশের পরিবেশবিদরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। এখন অপেক্ষা এ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক সরকারি নির্দেশের জন্য। নির্দেশটি শিগ্গির পাওয়া যাবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল আশা করছে।

রামুর সংরক্ষিত বন ধ্বংসের পাঁয়তারা

সিআরবি উদ্যান রক্ষার আন্দোলন যখন একটি ইতিবাচক পরিসমাপ্তিতে এসেছে, তখন জানা গেল চট্টগ্রাম বিভাগেই একটি সংরক্ষিত বন ধ্বংস করে ফুটবল প্রশিক্ষণ একডেমি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) একাডেমি প্রতিষ্ঠার জন্য কক্সবাজারের রামু উপজেলায় সংরক্ষিত বনের ২০ একর জমি পছন্দ করেছে। সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রণালয় বাফুফের পছন্দ অনুযায়ী ২০ একর বনভূমি ফুটবল একাডেমি প্রতিষ্ঠার জন্য ছেড়ে দিতে সম্মত হয়েছে এবং কাজও চলছে।

সংরক্ষিত বনাঞ্চল ধ্বংস করে ফুটবল একাডেমি প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদ প্রথম থেকেই করে আসছেন পরিবেশবিদ ও সচেতন নাগরিক সমাজ। এ সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে তারা বিবৃতি দিয়েছেন, সংবাদ সম্মেলন করেছেন। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তারা আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদপত্রও দিয়েছেন। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। বাফুফে তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে চলেছে। এ অবস্থায় দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা বাফুফেকে তাদের পরিকল্পনা থেকে নিবৃত্ত করতে আন্তর্জাতিক ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা ফিফার শরণাপন্ন হয়েছেন।

ফিফাকে বিশিষ্ট নাগরিকদের চিঠি

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, দেশের কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক সম্প্রতি ফিফাকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। রামুর সংরক্ষিত বনে বাফুফে যে আবাসিক প্রশিক্ষণ একাডেমি করতে যাচ্ছে, তাতে ৩৬ লাখ ডলার আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে ফিফা। বিশিষ্টজনেরা তাদের চিঠিতে বাংলাদেশের ফুটবলের উন্নয়নে ফিফার এ বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে প্রকল্পের বিষয়ে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, বনাঞ্চল ধ্বংস করে একাডেমির জন্য স্থাপনা নির্মাণ করা হলে তা পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষতি করবে।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ফুটবল প্রশিক্ষণ একাডেমি স্থাপনের জন্য নির্ধারিত ২০ একর জমি বন আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার ঘোষিত ‘সংরক্ষিত বন’। এটাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ধরনের এলাকায় মানুষের যে কোনো রকমের হস্তক্ষেপ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। জীববৈচিত্র্যের দিক দিয়ে এ বনটি সমৃদ্ধ ও অনন্য। এ বনাঞ্চলে বিপন্ন প্রজাতির এশিয়ান হাতি বসবাস করে।

বিশিষ্টজনদের চিঠিতে ফিফার সহায়তা চেয়ে বলা হয়, বাফুফে সংরক্ষিত বনের পরিবর্তে অন্য কোথাও ফুটবল একাডেমি করতে পারে। এ ধরনের স্থাপনার জন্য দেশে অনেক বিকল্প জায়গা রয়েছে। ফিফার প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারি জেনারেল এবং ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যানের কাছে এ চিঠি পাঠানো হয়েছে।

চিঠিতে স্বাক্ষরদাতাদের মধ্যে রয়েছেন-সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল, রাশেদা কে চৌধুরী, নারীনেত্রী খুশী কবির, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন, আইনজীবী জেড আই খান পান্না, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, আইনজীবী সারা হোসেন, বেসরকারি সংগঠন এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের চেয়ারম্যান এইচ এম নজরুল ইসলাম, সেভ দ্য কক্সবাজার সংগঠনের চেয়ারম্যান আনসার হোসেন এবং ইউথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির প্রধান নির্বাহী ইব্রাহীম খলিলুল্লাহ।

এ চিঠি পেয়ে ফিফার কী প্রতিক্রিয়া হয়েছে অথবা জবাবে তারা কিছু বলেছেন কিনা তা জানা যায়নি। তবে আশা করা যায় ফিফা বাংলাদেশের বনাঞ্চল রক্ষা তথা পরিবেশ ও প্রতিবেশগত বিষয় অবশ্যই অনুধাবন করবে। একাডেমি স্থাপনের প্রশ্নে ফিফা যদি তাদের মতামত জানায়, তাহলে বাফুফে তা শুনবে এবং প্রকল্পের স্থান অন্যত্র সরিয়ে নেবে। কারণ ফিফা শুধু আন্তর্জাতিক ফুটবলের অভিভাবক সংস্থাই নয়, আলোচ্য ফুটবল একাডেমি স্থাপনে আর্থিক সহায়তাও দিচ্ছে সংস্থাটি। ফিফার কর্মকর্তারা হয়তো জানেন না যে, একাডেমি স্থাপনের জন্য সংরক্ষিত বনাঞ্চল ধ্বংস করতে হবে। এটা জানতে পারলে তাদের অভিমত ইতিবাচক হওয়ার কথা।

বিকল্প স্থান থাকতেও বনাঞ্চল কেন?

রামুর সংরক্ষিত বনে ফুটবল একাডেমি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাফুফে কর্মকর্তারা কি বনাঞ্চল ও পরিবেশ-প্রতিবেশ সম্পর্কে কিছু জানতেন না বা বুঝতেন না? বেশ কয়েকটি বিকল্প জায়গা থাকতেও তারা কক্সবাজারের ওই সংরক্ষিত বনাঞ্চল পছন্দ করলেন কেন? মনে হয় তারা জেনেশুনেই করেছেন। উপকূলীয় পর্যটন জেলায় যদি আবাসিক প্রশিক্ষণ একাডেমি করা যায়, তাহলে তা অবসর যাপন ও বিনোদন কেন্দ্র হিসাবেও ব্যবহার করা যাবে। একাডেমি স্থাপনাটি সবার জন্য আরামদায়কও হবে। এমন একটি ধারণা বাফুফের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্তাদের মধ্যে কাজ করেছে-এটা ভাবলে ভুল হবে কি?

আর কোন কোন জায়গা একাডেমির বিকল্প স্থান হিসাবে বিবেচিত হয়েছিল জানা নেই। তবে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, ফুটবল একাডেমি স্থাপনের জন্য ২০ একর জায়গার অভাব নেই দেশে। ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়াম ছাড়াও কমলাপুর ও ফতুল্লার দুটি স্টেডিয়াম সারা বছর প্রায় অব্যবহৃত পড়ে থাকে। এ দুই স্টেডিয়াম ফুটবল প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার করা যায়। ঢাকার বাইরে অন্য জেলাতেও জায়গার অভাব হবে না। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের কোনো জেলায় যদি তা করা হয়, তাহলে তা ফুটবল প্রশিক্ষণের জন্য অবশ্যই ভালো হবে। সেই সঙ্গে উত্তরাঞ্চল এবং ওই জেলাটির গুরুত্বও বাড়বে। লক্ষণীয়, খেলাধুলা সম্পর্কিত কোনো একাডেমি বা সংস্থা উত্তরাঞ্চলে নেই। এ ধরনের সংস্থা ঢাকা বা চট্টগ্রামেই হতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা আছে কি?

চট্টগ্রামের সিআরবি উদ্যান ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে যাচ্ছে, এমন একটি সুখবর দিয়ে লেখাটি শুরু করেছিলাম। সিআরবিতে হাসপাতাল প্রকল্প বাতিলের সরকারি আদেশ যখন আনুষ্ঠানিকভাবে আসবে, তখনই শতকরা শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাবে যে, সিআরবি উদ্যান ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে গেল। যতক্ষণ তা না হয়, সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

বনাঞ্চল, উদ্যান, খোলা জায়গা দখল অনেক আগে থেকেই চলছে। এখনো স্বার্থান্বেষী মহল দখলের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে সর্বত্র। খেলাধুলার উন্নয়নের নামে ঢাকা মহানগরীর বৃহত্তম মাঠ পল্টন ময়দান দখল হয়ে গেছে অনেক আগেই। সচিবালয়ের সামনে ওসমানী উদ্যানে স্থাপনা গড়ে উঠেছে, যেটুকু অবশিষ্ট আছে সেখানে কী হবে বোঝা যাচ্ছে না। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উন্নতমানের রেস্তোরাঁ স্থাপনের জন্য গাছ কাটা শুরু হয়েছিল, হাইকোর্টের নির্দেশে বন্ধ হয়। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর অনেক ছোট-বড় মাঠ-উদ্যানে স্থাপনা গড়ে উঠেছে, যেটুকু অবশিষ্ট আছে, সেখানে কী হবে বোঝা যাচ্ছে না। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর অনেক ছোট-বড় মাঠ-উদ্যান এভাবেই দখল হয়ে গেছে।

ক্রমেই ছোট হচ্ছে বনাঞ্চল

দেশের বৃহত্তম বনাঞ্চল সুন্দরবনও নিরাপদ নেই। অবৈধভাবে গাছ কাটা এবং বনের আশপাশে শিল্প স্থাপনের ফলে সেখানকার বনাঞ্চল ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। দেশের অন্যান্য বনাঞ্চল ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। একটি ফুটবল একাডেমি স্থাপনের জন্য যদি রামুতে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ২০ একর ভূমি দখলের চেষ্টা হয়, তাহলে আর কী বলা যায়? কক্সবাজারের টেকনাফে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা সেখানকার বনাঞ্চল ধ্বংস করে, গাছ কেটে বাড়িঘর বানাচ্ছে বিনা বাধায়। তাদের কীভাবে দোষ দেওয়া যায়, যখন বাফুফের মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠান সংরক্ষিত বনাঞ্চল ধ্বংসের উদ্যোগ নেয়!বাংলাদেশের পরিবেশ, প্রতিবেশ ও বনাঞ্চল খুবই বিপন্ন। এসব রক্ষার দায়িত্ব যাদের, তাদের যদি মাথাব্যথা না থাকে, তাহলে অসহায় জনগণ কী করতে পারে?

চপল বাশার : সাংবাদিক, লেখক

প্রবাস বাংলা ভয়েস/ঢাকা/ ১৪ নভেম্বর ২০২২ /এমএম