Menu

প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক ::‌ নানা বাধা-বিপত্তি আর ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে স্বপ্নের পদ্মা সেতুটা হয়েই গেল। ২৫ জুন উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার জন্য। যে পদ্মা সেতু হওয়ারই কথা ছিল না, সেই পদ্মা সেতু এখন দৃষ্টিসীমায় দিগন্তজুড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। কোনো ষড়যন্ত্রই আজ এই পদ্মা সেতুকে রোধ করতে পারেনি। ষড়যন্ত্রকারীদের মুখে ছাই ঢেলে এ সেতু জাগিয়ে দিয়েছে দেশের পিছিয়ে পড়া ২১ জেলাকে। পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন, যা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে প্রমত্ত পদ্মার বুকে। ঘাট এলাকার যুগ যুগ ধরে চলা ভোগান্তি থেকে বাঁচবে যাত্রীরা। বাঁচবে সময়ও। তাই সেতু নিয়ে উচ্ছ্বাসের শেষ নেই। ঢাকা যেন এখন তাদের হাতের মুঠোয়!

১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর বাঙালির জন্য এ যেন আরেক বিজয়। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু হয়েছে- ভাবতেই অবাক লাগে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য বদলে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এই পদ্মা সেতু। এ সেতু ঘিরে সোনালি ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছেন এ অঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ। পদ্মা সেতু রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের সঙ্গে এ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করেছে। পিছিয়ে পড়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আরও মনোযোগ কাড়বে, গড়ে উঠবে এসব জেলায় নতুন নতুন শিল্পকারখানা। এ সেতু দিয়ে বাংলাদেশ যুক্ত হতে পারবে এশিয়ান হাইওয়েতে। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির চাকা ঘোরার পাশাপাশি বাড়বে কর্মসংস্থান। বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে আরেক ধাপ। সড়কপথে যানচলাচলের জন্য নির্ধারিত ১৫ মিটার চওড়া কংক্রিটের সড়কের বাইরেও সেতুর মধ্যে রয়েছে রেললাইন, গ্যাসলাইন ও অপটিক্যাল ফাইবার। মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরার মধ্যে স্থাপিত দ্বিতল এই পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার এবং ভাঙ্গার অংশ যোগ করলে মোট দৈর্ঘ্য দাঁড়াবে প্রায় ৯ কিলোমিটার। পদ্মা সেতুর ১১ কিলোমিটার সংযোগ সড়কের মধ্যে সাড়ে ৯ কিলোমিটার সড়কই জাজিরা পয়েন্টে ও বাকি দুই কিলোমিটারের মতো সড়ক মাওয়া অংশে পড়েছে। সংযোগ সড়কের মধ্যে থাকছে সেতু, বক্সকালভার্ট, আন্ডারপাস ও টোলপ্লাজা। সেতু প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে পদ্মার দুইপাড়ে ৭টি পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করার প্রকল্প রয়েছে। পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোতে জনসাধারণের জন্য মসজিদ, খেলার মাঠ, মার্কেটসহ সব ধরনের ব্যবস্থা থাকছে।

সারা বিশ্বে খরস্রোতা যত নদী আছে, তার মধ্যে প্রধান একটি নদী পদ্মা। এ নদীতে প্রবাহিত পানির পরিমাণ, নদীর গভীরতা, প্রশস্ততা এবং তলদেশে মাটির ধরন- এ সবকিছুর কারণে এর ওপর সেতু নির্মাণ ছিল কঠিন এক কাজ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই অসম্ভব কাজটিই সম্ভব হয়েছে এবং প্রায় আট বছরের নির্মাণকাজ শেষে সেতুটির উদ্বোধন হয়েছে। এ সেতু নিয়ে যেমন মানুষের স্বপ্ন আছে, তেমনি আছে উৎকণ্ঠাও। মানে পেশা বদলের উদ্বেগ। যে পদ্মা সেতুকে ঘিরে পদ্মা পাড়ের এত উন্নয়ন সেখানকার এক শ্রেণির মানুষের মনে রয়েছে দুশ্চিন্তা। পদ্মা ঘাটের ওপর নির্ভর করে যুগযুগ ধরে চলে আসা অনেক ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাবে। বাংলাবাজার-শিমুলিয়া নৌরুটের উভয় ঘাটেই রয়েছে অসংখ্য হকার, হোটেল ব্যবসা। যারা একমাত্র ঘাটের নৌযানে ঘুরে ঘুরে বেচাবিক্রি করে থাকেন আবার যাত্রীরাও ইলিশ মাছ দিয়ে এখানে খেয়ে নিত। লঞ্চ, ফেরি ও স্পিডবোটের যাত্রীরাই এসব হোটেল ও হকারদের একমাত্র ক্রেতা এবং ভরসা। আর এই ঘাট এলাকায় নানান জিনিসপত্র বিক্রি হয় অনায়াসেই। পদ্মা পাড়ের এলাকার খেটে খাওয়া মানুষেরাই ঘাটে হকারি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এদের মধ্যে মুখরোচক খাবার বিক্রেতাদের সংখ্যাই ছিল অনেক। তবে এখানে শুধু মুখরোচক ঝালচানাচুর বিক্রি হতো এমন নয়। পাশের গ্রাম থেকে আসা ডাব, পেঁপে, সফেদাসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফল কিনত যাত্রীরা। কখনো জেলেরা পদ্মা থেকে ধরে আনা ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিক্রি করত যাত্রীদের কাছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত, কেউবা রাত অবধি নৌযানে ঘুরে ঘুরে নানান খাবার-দাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি করে সংসার চালাতেন।

নৌযানের ঘাটে ঘুরে ঘুরে পণ্য বেচাবিক্রি করা তাদের একমাত্র পেশায় ভাটা পড়বে। কারণ এ এলাকার মানুষ শুধু লঞ্চ বা ফেরিতেই চলবে। কিন্তু তাদের ওপর নির্ভর এতগুলো পেশা চলবে না। পদ্মাপাড়ের এলাকার খেটে খাওয়া মানুষের হকারি করে জীবিকা নির্বাহের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। এ দৃশ্য ভুলে যাবে মানুষ। এসব পেশাজীবী আবার নতুন পেশায় মিশে যাবে।

১৯৯৮ সালে যমুনা সেতু চালু হওয়ার পরও এ দৃশ্য দেখা গেছে। যমুনায় ভূয়াপুর-সিরাজগঞ্জের ফেরিঘাটের হোটেলের মাছ, কত রকমের বাহারি খাবার আজ সবাই ভুলে গেছে। প্রমত্তা যমুনার ওপর দিয়ে চলে কত শত পরিবহন। সেইসব স্মৃতির কথা কজন মনে রেখেছে? অজস্র পেশাজীবী এতদিনে অন্য পেশায় মিশে গেছে। সমস্ত বড় কাজের পেছনেই এমন কিছু ইতিহাস থাকে। সব ইতিহাস নিয়েই আমাদের চলতে হয়- হবে। পর্যটন শিল্প থেকে শুরু করে আবাসন শিল্প, তাঁতপল্লি, হাইটেক পার্কসহ নানা ধরনের শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে। এরই মধ্যে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং ও শ্রীনগর পাশাপাশি দুই উপজেলায় ও শরীয়তপুরের জাজিরা ও মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় বেশ বড় রকমের পরিবর্তন হয়েছে। যেখানে আগে দুই-চারটি দোকান ছিল সেখানে গড়ে উঠেছে বহুতল মার্কেট, বিপণিবিতান, শত শত দোকানপাট। এখানেই হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে সেসব পেশা হারানো মানুষদের।

গত ২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে দেশের কোটি মানুষের স্বপ্নসাধের বাস্তবায়ন হলো। এই সেতুর মধ্য দিয়ে পদ্মার দুই পাড়ের মানুষের জীবনের উন্নয়নের ছাঁট লাগবে। গত ২৬ জুন সকল প্রকার যানবাহন চলাচলের জন্য সেতু উন্মুক্ত করা হয়েছে। জীবন অজেয়-জীবন থেমে থাকে না। প্রবহমান নদীর মতো চলে জীবন। তবু সব দুর্ভোগ কাটিয়েও পদ্মার দিকে চোখ পড়লে একটা আর্দ্র ভালোবাসা বুকের ভেতর ছলাৎ করে ওঠে। পদ্মা আমাদের মা- একথা মাথায় রেখেই এত কথা। তারপরও যাতায়াতে যে নতুন দিগন্তের সূচনা হলো তা শুধু দক্ষিণাঞ্চল নয়, সারা দেশকে সঞ্চালন করবে। দক্ষিণ দ্বার খুলে যাওয়া অর্থনীতিতে নতুন ধারার সূচনা করবে। সেই ধারায় যুক্ত হবে কাজ হারানো সব পেশাজীবী- জীবন অদম্য। জীবন কখনো থামে না, বয়ে চলাই জীবনের ধর্ম।

প্রবাস বাংলা ভয়েস/ঢাকা/ ৩০ জুন  ২০২২ /এমএম