Menu

প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক ::‌ হাজার কোটি টাকা লোপাট মামলার মূল অভিযুক্ত ও পলাতক আসামি প্রশান্ত কুমার হালদারকে (পি কে হালদার) ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) কর্মকর্তারা ইংরেজি দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফকে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে পিকে হালদারকে বাংলাদেশে হস্তান্তর করা হবে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ২০১৬ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় পি কে হালদারকে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

পি কে হালদার এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এছাড়াও আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত শুরু করার পর তিনি কানাডায় পালিয়ে যান বলে ধারণা করা হয়েছিল।

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগর থেকে গ্রেপ্তারের পর পি কে হালদারকে ভারতের একটি আদালতে তোলা হয় আদালতের বিচারকরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ইডি হেফাজতে পাঠিয়ে দেন। বাংলাদেশের হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ মামলার মূলহোতা পি কে হালদারকে আইনের আওতায় নিতে একটি শক্তিশালী অভিযান পরিচালনা করেছে ভারতের ইডি।

বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, পি কে হালদার বাংলাদেশের ওয়ান্টেড। বাংলাদেশ সরকার ইন্টারপোলের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। ভারত জানালে পি কে হালদারের বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন বলেছেন, ভারতে পি কে হালদারের গ্রেপ্তার হওয়ার বিষয়ে আমরা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানি না। তবে জানামাত্র তাকে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সূত্রে প্রকাশ ইডি বলেছে, ব্যক্তিগত আইনজীবী সুকুমার মৃধার সহায়তায় পি কে হালদার পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের একাধিক রাজ্যে বিপুল সম্পদ করেছেন। বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে অর্থপাচারের মাধ্যমে ভারতে একাধিক অভিজাত বাড়িসহ বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে খোঁজ পেয়েছে ইডি। ইডির সূত্র বলছে, ২০০৯ থেকে ২০১৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিভিন্ন ভুয়া কোম্পানির নামে বাংলাদেশের ব্যাংক থেকে ঋণ নেন হালদার এবং সেই অর্থ তিনি ভারতে পাচার করেন। ইডির এক কর্মকর্তা টেলিগ্রাফকে বলেছেন, হালদারের এসব কোম্পানির কোনো অস্তিত্ব নেই। পরবর্তীতে ব্যাংকগুলো হালদারের প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারে এবং বাংলাদেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার কাছে অভিযোগ দায়ের করে। পরে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের অনুরোধে এই বিষয়ে অনুসন্ধানে নামে ইডি।

এর আগে দুর্নীতি দমন কমিশন ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের ৮ জানুয়ারি পি কে হালদারের বিরুদ্ধে ২৭৫ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা দায়ের করে। মামলার অভিযোগে বলা হয়, পলাতক পি কে হালদার তার নামে অবৈধ উপায়ে এবং ভুয়া কোম্পানি ও ব্যক্তির নামে প্রায় ৪২৬ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়েছেন।

পি কে হালদারের বিরুদ্ধে মামলায় আসছে পশ্চিমবঙ্গের রাঘব বোয়ালদের নাম-প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আত্মগোপন করা প্রশান্ত কুমার হালদারের (পি কে হালদার) মামলায় একে একে নাম জড়াচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের রাঘব বোয়ালদের। ভারতের অর্থ-সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বাহিনী এনফোর্সমেন্ট ডাইরেক্টরেট (ইডি) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, পি কে হালদারকে ভারতে আত্মগোপন করতে সহায়তা এবং মুদ্রাপাচারে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহযোগিতার ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের নামও উঠে এসেছে ইডির প্রাথমিক তদন্তে। স্থানীয়রা জানান, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় এবং তাদের আর্থিকভাবে সহযোগিতা করার মাধ্যমেই বাংলাদেশ সীমান্তের এত কাছে গা-ঢাকা দিয়েছিলেন পি কে হালদার ও তার সহযোগীরা। (সমকাল, ১৫ মে ২২ )

ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ দিতে হয় যে তারা অত্যন্ত দ্রুততা ও স্বচ্ছতার সাথে আর্থিক লেনদেন স্কিমকে বোঝতে পেরেছেন, অবৈধভাবে প্রাপ্ত অর্থের পরিচয়, উৎস এবং গন্তব্য গোপন করার মাধ্যমে টাকা লগ্নি, বিনিয়োগকে গণমাধ্যমে তুলে ধরছেন।

বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বিষয়টিকে লুফে নিয়েছে। সরকারের দুর্নীতি প্রতিরোধে সক্ষমতা এবং আন্তরিকতাকে নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। এ অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনায় শীর্ষ পর্যায়ের বাংলাদেশ ব্যাংকের দুই ডজন কর্মকর্তা জড়িত বলে ও তথ্য রয়েছে । পিকের এ অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের জবানবন্দিতেও এসেছে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের নাম। সাবেক ও বর্তমান এসকল কর্মকর্তার বিরোধ্যে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই ওরা বহাল তবিয়তে রয়েছেন।

অর্থ পাচারকারীসহ মদতদাতাদের তালিকা প্রকাশের দাবি ফখরুলের-বিদেশে অর্থ পাচারকারীসহ তাদের মদতদাতাদের তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রোববার বিকালে রাজধানীর গুলশানস্থ দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব এই দাবি জানান। তিনি বলেন, এরকম কতজন পিকে হালদার আছে? আর এরকম কতজন মানুষ আছে? আমরা কিছুদিন আগে দেখেছি, হাজার হাজার কোটি টাকা তারা দেশ থেকে লুট করে বিদেশে পাঁচার করে দিচ্ছে। আমরা খুব পরিস্কার করে বলতে চাই, এই ধরনের (পিকে হালদারের মতো) হাজার হাজার কোটি টাকা আর কতো পাচার হয়েছে। একদিনে তো পাচার হয়নি। কিভাবে কোন পদ্ধতিতে পাচার হলো, কারা তার সঙ্গে জড়িত ছিলো, কারা মদত দিয়েছে- সেই বিষয়গুলো পরিস্কার করে জাতির সামনে তুলে ধরার জন্য আমরা আজকে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।

মির্জা ফখরুল বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়িত্ব হচ্ছে এই যে দুর্নীতি হচ্ছে, চুরি হচ্ছে, ডাকাতি করে অর্থ পাচার করা হচ্ছে তা অবশ্যই তদন্ত করে বের করে জনসমক্ষে প্রকাশ করা। সুযোগ পেলেই বিএনপির লোকদেরকে হয়রানি করা আর কিছু চুনো-পুঁটি লোককে ধরে হয়রানি করা। এই ধরনের যারা বড় বড় আছেন বর্তমান সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত সুষ্ঠু তদন্ত করে জনগনের সামনে তাদের নাম প্রকাশ করতে হবে, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। (মানবজমিন, ১৫ মে ২০২২)

জানা গেছে, পিকে ঋণ কেলেঙ্কারির সংক্রান্ত বিগত পাঁচ বছরের পরিদর্শন প্রতিবেদন চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনরের কাছে দুদকের পরিচালক বেনজীর আহম্মেদ স্বাক্ষরে একটি চিঠি দেয়া হয়েছিল। কারো ইচ্ছাকৃত গাফলতি বা কুমতলব উদ্ঘাটিত হলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে চিঠিতে বলা হয়। জানা গেছে, দুদকের চিঠির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফআইইউ একটি টিম গঠন করে রিলায়েন্স ফাইন্যান্স, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, পিপলস লিজিং এবং এফএএস ফাইন্যান্স পরিদর্শন শেষে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। এরপর বিএফআইইউ’র প্রতিবেদন ২০২০ সালের ৭ জুলাই দুদকের মহাপরিচালকের (মানিলন্ডারিং) কাছে পাঠানো হয় । ওই প্রতিবেদন পাওয়ার পরই দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা উপ-পরিচালক মো. গুলশান আনোয়ার প্রধান ৮৩ জনের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করেন। এখন পর্যন্ত পিকে হালদার কেলেঙ্কারির ঘটনায় ৬৪ জনের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে দুদক। (সংবাদ ১৫ মে ২০২২)

স্বামীদের পাঠানো অবৈধ অর্থ দিয়ে ‘বেগমপাড়া’ খ্যাত কানাডার টরন্টোতে বিলাসবহুল জীবনযাপন করে আসছেন অতিরিক্ত বিত্তশালী লোকদের স্ত্রীরা। কোটি কোটি বাংলাদেশি টাকা পাচার হয়ে এসেছে কানাডার বেগম পাড়ায়, অবৈধ অর্থ বিত্তের পাহাড় গড়ে অনেক বাংলাদেশি বসতি স্থাপন করেছে এ এলাকায়। যার মধ্যে সরকারি আমলা, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীসহ অনেক অপরাধ চক্রের লোকজন রয়েছে; যা এখন ওপেন সিক্রেট।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ট্যাক্স জাস্টিস নেটওয়ার্কের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৬ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। ইউএনডিপির মতে, ২০১৩ সাল পর্যন্ত অবৈধ পুঁজি চোরাচালানে বিশ্বের শীর্ষে ছিল বাংলাদেশ। তারা আরও বলে যে কালো টাকা দেশের অর্থনীতির ৩৫.২৯ শতাংশ চালক। (শাইনিং বিডি, ২২ নভেম্বর ২০২০)

কানাডার টরন্টোর বেগমপাড়া একটি তপ্ত রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় এখানে কিছু বাংলাদেশি বিলাসবহুল বাসস্থান কিনেছে এবং অভিযোগ উঠেছে যে বাংলাদেশ থেকে লাখ লাখ টাকা পাচার হয়ে কানাডায় এসেছে যা এখানে বিনিয়োগ করা হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত বা এখনও চাকরি করেন এমন সব সরকারি কর্মকর্তা ও কয়েকজন রাজনীতিবিদ রয়েছে। পলাতক পিকে হালদারও ৩৬০০ কোটি টাকা পাচার করে বেগমপাড়ায় বসতি স্থাপন করেছেন বলে জানা গেছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির মতে, ২০১৫ সালে বাণিজ্য কারসাজির মাধ্যমে প্রায় ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বাংলাদেশ থেকে পাচার করা হয়েছিল। মানি লন্ডারিং, ব্যাংক ও শেয়ারবাজার লুটপাটের কথা উল্লেখ করে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তার ২০১৪ সালের বাজেট বক্তৃতায় বলেছিলেন- মালয়েশিয়া এবং কানাডায় অর্থ পাচার হচ্ছে। কিছু লোক সেখানে তাদের বাড়ি তৈরি করছে।(সূত্র-উইকিপিডিয়া)

জাতিসংঘের (UN) অপরাধ দমন চুক্তি অর্থ পাচারের বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইন , জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ (UNSC) রেজুলেশন এবং নরম আইনের সংস্থা পাওয়া যায়, যার মধ্যে প্রথাগত নিয়ম হিসাবে কিছু যুক্তিযুক্তভাবে ফুটে উঠেছে । ১৯৮৮ সালের জাতিসংঘ কনভেনশন (ভিয়েনা কনভেনশন) থেকে শুরু করে মাদকদ্রব্য ও সাইকোট্রপিক পদার্থের অবৈধ ট্রাফিকের বিরুদ্ধে দেশীয় আইনে অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং (এএমএল) ব্যবস্থা স্থাপনে সম্মত হয়েছে সম্মত রাষ্ট্রগুলি। এটি সংগঠিত অপরাধ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে এএমএল ব্যবস্থা অনুসরণ করে, যথাক্রমে, ২০০০ সালে জাতিসংঘের ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইম (পালেরমো কনভেনশন) এর প্রোটোকল সহ এবং ২০০৩ সালের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাতিসংঘ কনভেনশন (মেরিডা কনভেনশন)। এএমএল ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে অর্থ পাচারের অপরাধীকরণ, অপরাধের আয় জব্দ ও বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা, আর্থিক বুদ্ধিমত্তা তৈরিতে বেসরকারী খাতের দায়িত্ব, আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (এফআইইউ) প্রতিষ্ঠা এবং রাজ্যগুলির মধ্যে আনুষ্ঠানিক আইনি সহযোগিতার ব্যবস্থার ওপর প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

যদিও বাংলাদেশ মানি লন্ডারিং রোধে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, তবুও এটি দেশে একটি উল্লেখযোগ্য সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। ১১ জানুয়ারি ২০০৭-এ জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার পর, একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। বর্তমান সরকারের আমলে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থ পাচারের পরিমাণ বেড়েছে। ফলে, ক্ষমতায় থাকা তত্ত্বাবধায়ক প্রশাসনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হল দুর্নীতি দমন করা। আন্ডারগ্রাউন্ড হাওয়ালা বা “হুন্ডি” সিস্টেম, যা নিয়মিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে অর্থ এবং মূল্যবান জিনিসপত্র স্থানান্তর করতে ব্যবহৃত হয়, তা মানি লন্ডারিংয়ের প্রধান ঝুঁকি থেকে যায়। প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মচারীদের কাছ থেকে মজুরি ফেরত দেওয়ার জন্য হুন্ডি পদ্ধতিটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। যদিও ব্যাঙ্কগুলি সম্প্রতি তাদের স্থানান্তরের গতি এবং দক্ষতা উন্নত করেছে, হুন্ডি সিস্টেমটি কর, শুল্ক ফি এবং মুদ্রার বিধিবিধান এড়ানোর ক্ষমতার কারণে উন্নতি লাভ করে চলেছে।

বাংলাদেশ সরকার ২০০২ সালে, অর্থ পাচারের সমস্যা মোকাবেলায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন পাস করে। সরকার তখন ২০০৭ সালে জাতিসংঘের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কনভেনশন বাস্তবায়ন করে। (UNCAC)। ২০০৭ সালে, সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং বিভাগ (AMLD) কে সরকারের জাতীয় আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (FIU) হিসাবে মনোনীত করে। সরকার মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ অধ্যাদেশ (MLPO ২০০৮) এবং ২০০৮ সালের সন্ত্রাস বিরোধী অধ্যাদেশ পাস করেছে। (ATO ২০০৮) উভয় আইনই দেশগুলির জন্য অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য একসাথে কাজ করা সহজ করে, যার মধ্যে নগদ পুনরুদ্ধার করা যা বেআইনিভাবে অন্য দেশে স্থানান্তর হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার চারটি দেশের মধ্যে পাকিস্তানের পরে বাংলাদেশে সবচেয়ে কম অর্থ পাচারের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, যা ব্যাসেল পর্যালোচনা অনুসারে ৬ এর ঝুঁকির স্কোর সহ বিশ্বব্যাপী ২৮তম স্থানে রয়েছে। এফএটিএফ অনুসারে বাংলাদেশ তার অর্থ পাচার বিরোধী এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন বিরোধী ব্যবস্থাকে উন্নত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে এবং অক্টোবর ২০১০ এ এফএটিএফ দ্বারা শ্রেণীবদ্ধ কৌশলগত অপ্রতুলতার বিষয়ে তার কর্ম পরিকল্পনায় প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে। বাংলাদেশ তার পারস্পরিক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উল্লিখিত এন্টি-মানি লন্ডারিং এবং কাউন্টার-টেররিস্ট ফাইন্যান্সিং এ পুরো স্পেকট্রাম মোকাবেলায় APG-এর সাথে জড়িত থাকবে। এরফলে, বিশ্বব্যাপী চলমান AML/CFT কমপ্লায়েন্স প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ আর FATF দ্বারা পর্যবেক্ষণ পর্যায়ে রবে না।

মাহমুদুর রহমান মান্না “পিকে হালদার ও তার সহযোগীদের বিচার করুন” শীর্ষক এক নিবন্ধে লিখেন- আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দুর্নীতি এবং অর্থ পাচারের ঘটনার দীর্ঘ তালিকায় একটি নাম পিকে (প্রশান্ত কুমার) হালদার। সম্প্রতি ভারতে গ্রেফতার হওয়ার পর নামটি পুনরায় আলোচনায় এসেছে; কিন্তু পিকে হালদারের মতো আরও অনেক নাম, অনেক দুর্নীতি, অর্থ পাচারের ঘটনা এ দেশে নিয়মিত ঘটে চলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রায়ত্ত কিংবা বেসরকারি-প্রায় প্রতিটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক কিংবা বেসরকারি এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক বা রিলায়েন্স ফাইন্যান্স-কোনো দুর্নীতি, অর্থ লোপাট বা অর্থ পাচারের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় প্রতিটি ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। (যুগান্তর, ১৬ মে ২০২২)

ভারত ও বাংলাদেশের শীর্ষ পর্যায়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পি কে হালদারকে বাংলাদেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া গ্রহণ করতে হবে। অন্তত ২২টি মামলায় ভারতের অর্থ গোয়েন্দা সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনকে প্রাধান্য দিয়ে পাসপোর্ট অ্যাক্ট, মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট, ফরেনার্স অ্যাক্টসহ কয়েকটি মামলার আসামি হিসেবে প্রাথমিক অভিযোগপত্র দাখিল করতে পারে ভারতীয় এ সংস্থাটি। অভিযোগপত্রে মামলার সংখ্যা যত কম হবে আসামিদের ফেরত পাঠানো তত সহজ হবে বলে মনে করেন বোদ্ধামহল।

বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে এবং একটি সঙ্গবদ্ধ চক্র দেশ থেকে কানাডা, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচার করছে। দেশের বড় বড় আর্থিক কেলেঙ্কারিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল সহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা তুলে ধরেছে। যদিও দুর্নীতিবিরোধী এসব অভিযোগকে কখনো আমলে নেয়া হয়নি। একশ্রেণীর প্রভাবশালী মহলের আশ্রয় প্রশ্রয়ে দুর্নীতি যেন মহীরুহে পরিণত হয়েছে। দুর্নীতি নির্মূল করা না গেলেও তা প্রশমনে সরকার ব্যর্থ হলে দেশের সকল অর্জন ম্লান হয়ে যাবে। আমাদের আর্থিক ও আইন ব্যবস্থা অত্যন্ত ক্রটিপূর্ণ যা গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার নৈতিকতাকে মাথায় রেখে দোষী ও মদদদাতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে ও প্রতারিত ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রবাস বাংলা ভয়েস/ঢাকা/ ১৭ মে  ২০২২ /এমএম