Menu

মোঃ মাহমুদ হাসান

রাষ্ট্রযন্ত্র সম্পূর্ণভাবে জনস্বার্থে আইনের বিধি বিধানকে অনুসরণ করে কাজ করবে, গনতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় এমনটিই প্রত্যাশিত। এর ব্যতিক্রম জন আকাঙ্খাকে বিঘ্নিত করে সরকার কে জনগনের মুখোমুখি দাড় করিয়ে দেয়। আর জনগন যখন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়, চুড়ান্ত ফলাফলে জনতারই বিজয় হয়। সরকারের মধ্যে লুকিয়ে থাকা কিছু মানুষ যেন, জেনে বুঝেই অত্যন্ত সচেতন ভাবে আজকাল জনতাকে সরকারের মুখোমুখি দাড় করিয়ে দিচ্ছে!! শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যখন আর একটি জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দলকে সংগঠিত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, এমন সময়ে দেশে বিদেশে রাষ্ট্রযন্ত্র বা সরকার নিয়োজিত কিছু মানুষের কর্মকান্ড জনগণ কে বিক্ষুব্ধ করে তুলছে।

কিছুদিন আগে একটি খেলার মাঠকে পুলিশ স্টেশন বানাতে গিয়ে কি কান্ডটাই না ঘটে গেল! এক শিশু সন্তান আর তার মাকে শেকলে আটকে দিল পুলিশ। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্তা ব্যক্তিরা চেয়ে চেয়ে দেখলেন। একদিকে ইনিয়ে বিনিয়ে থানা ভবন নির্মাণের যৌক্তিকতা বুঝানোর চেষ্টা করলেন, আর অন্যদিকে জোরেসোরে নির্মান কাজ চালালেন। হাজার হাজার বহুতল ভবনের লাখো মানুষের জন্য একমাত্র উম্মুক্ত স্থানটি জনস্বাস্থ্য আর পরিবেশের জন্য কত গুরুত্বপূর্ণ কর্তাব্যক্তিরা তা আমলেই নিলেন না।

প্রতিটি দেশেই, প্রতিটি সরকারের সময়েই কিছু বরেণ্য মানুষ থাকেন, যাদেরকে দল বা সরকারের থিংক ট্যাংক বা শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সরকার কোন কারণে জনস্বার্থ পরিপন্থী কোন পদক্ষেপ নিলে, তাঁরা সরকারকে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেন। সমাজবিজ্ঞানী ডঃ অনুপম সেন, সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, নাসির উদ্দিন ইউসুফ, ডঃ আনোয়ার হোসেন, অধ্যাপক জাফর ইকবালের মতো মানুষদেরকে জনগণ সরকারের এমন শুভাকাঙ্ক্ষী বা থিংক ট্যাংক হিসেবেই ভেবে থাকেন। এসব বরেণ্য গুণীজনদের আকুতিকেও মহাক্ষমতাধর কিছু মানুষ পাত্তা দিলেন না। যা হবার তাই হলো, জনতা দাঁড়িয়ে গেল। পরিশেষে অতি ছোট একটি কাজ তার জন্যও, বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী কে এগিয়ে এসে পরিস্থিতির সামাল দিতে হলো।

অতীতে দেখেছি, রেল স্টেশন ও রেল গাড়ির বগিতে লেখা থাকে ‘ বিনা টিকেটে রেল ভ্রমণ আইনতঃ দন্ডনীয়। অমান্যকারীর জেল জরিমানা দু’টোই হতে পারে’। দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকি, দেশে গেলেও রেল ভ্রমণের সুযোগ হয় না। তাই এই আইন বা বিধি বিধানের কোন কার্যকারিতা আছে কিনা জানা নেই। তবে সাম্প্রতিক বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত একটি সংবাদে বুঝতে পারি, বিনা টিকেটে রেল ভ্রমণ এখন কিছু কিছু মানুষের জন্য দন্ডনীয় নয়। আর এসব মানুষকে চিনতে না পারলে, দন্ডটি উল্টো দন্ডদাতার কাঁধেই নিপতিত হয়। তাই উত্তরবঙ্গের এক ট্রেনের টিটিই কে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ নিয়ে ঘরে ফিরতে হয়েছে।

টিটিই সাহেবের অপরাধ তিনি বিনা টিকেটের যাত্রীদের টিকেট করতে বাধ্য করেছিলেন। আর তার চেয়ে বড় অপরাধ, তিনি অসীম ক্ষমতাধর রেলমন্ত্রীর স্ত্রীর আত্নীয়দের চিনতে পারেন নি। যার ফলশ্রুতিতে কোন প্রকার তদন্ত ব্যতিরেকেই রেল মহাপরিচালকের আদেশক্রমে টিটিই সাহেবকে সাময়িক বরখাস্ত হতে হয়েছে। চুড়ান্ত সন্তুষ্টির জন্য একদিন হয়তো চিরতরেও বরখাস্ত হতে পারতেনন!! দয়ালু বিধাতার অসীম রহমতে দ্রুতই শুভ বুদ্ধির উদয় হলো, রেলমন্ত্রী মুখ খোললেন, টিটিই সাহেবের চাকুরী রক্ষা হলো। ব্যক্তি সন্তুষ্টির জন্য রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োজিত রেল মহাপরিচালকের কি প্রশ্নেয় বাহিরে থাকার সুযোগ আছে?

আইন কানুন না জানলেও আমার মতো আমজনতা সহজেই বুঝে, টিকেট না করে গাড়িতে উঠা অন্যায়। যাত্রীটি কার আত্নীয় সেটি মোটেও বিবেচ্য বিষয় নয়। তারপরও রেলমন্ত্রীর আত্নীয় জেনেও যদি তিনি যাত্রীদের টিকেট করতে বাধ্য করে থাকেন, তাহলে তো তিনি তিরস্কার নয় পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। এহেন পরিস্থিতিতে রেলের মহাপরিচালক কোন বিবেচনায় তাকে বরখাস্তের আদেশ দিয়েছিলেন? রেল দপ্তর হয়তো টটিইর বিরুদ্ধে কোন রকম অসদাচরণের অভিযোগ এনে সিদ্ধান্তের পক্ষে নানারকম যৌক্তিকতা তুলে ধরার পরিকল্পনায় ছিল। ক্ষমতার বদৌলতে যত যুক্তিই তুলে ধরা হোক, এটি যে নেহায়েত ক্ষমতার বাড়াবাড়ি ছিল তা বুঝতে জনতার বাকী নেই। জনআকাঙ্খা বাস্তবায়ন আর আইনের অপ-প্রয়োগের অপরাধে রেল মহাপরিচালকের কি বিধি ভঙ্গে অভিযোগে দায়ী হতে পারেন?

এককালীন র‍্যাব এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম তার কর্ম কান্ডের জন্য সারা দেশে অত্যন্ত সুপরিচিত। বহু ক্ষমতাধর অর্থ বিত্ত ও রাজনৈতিক প্রতিপত্তির অধিকারী রাঘব বোয়ালকে তিনি আইনের মুখোমুখি করেছেন, শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। তার কর্তব্য নিষ্ঠা ও দায়িত্ব বোধ দেখে জনগন যেমন তার প্রতি অনুরক্ত হয়েছে, পাশাপাশি বাহিনী হিসেবে র‍্যাব এর প্রতি জন আস্থাও বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে একদিকে যেমন সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে, অন্যদিকে নিষ্ঠা আর সততার সাথে সাথে দায়িত্ব পালন করলে অনৈতিক ক্ষমতাশালীরা যে নিমিষেই ক্ষমতাহীন হয়ে যেতে পারে তারও দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু কন্যার আপোষহীন মনোভাবে জনমনে স্বস্থি ফিরে এসেছে।

হ্যাঁ, এটি নিশ্চিত ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক ব্যাক্তিগত শত্রু তৈরি করেছেন। তিন শতাধিক সফল অভিযানে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে, বহু রাগব-বোয়ালের শ্যান দৃষ্টিতে পড়তেই পারেন। ঝুঁকি নিয়ে যারা অন্যায়, অনিয়ম আর অনৈতিকতার বিরুদ্ধে আইনের শাসন বাস্তবায়নে ব্রতী হন, এমন মানুষ কে তার কর্তব্য কর্মের জন্য পুরস্কৃত করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তো রাষ্ট্রীয় স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে সাতাশ’তম বিসিএস এর দু’শত চল্লিশ জন কর্মকর্তাকে উপসচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে, সারোয়ার আলম কে আটকে রেখে কিসের বার্তা দেয়া হলো? ডিজিটাল বাংলাদেশের কল্যাণে জনগণের কাছে বার্তা পৌঁছাতে আজ আর সময় লাগে না। তাই জনগণ আজ জেনে গেছে ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার শুধু পদোন্নতি বঞ্চিত নয়, জনপ্রশাসনের শৃঙ্খলা পরিপন্থী আচরণের জন্য তিরস্কৃতও হয়েছেন। একটি গনতান্ত্রিক সরকারের ভাবমূর্তির সাথে এমন সিদ্ধান্ত কতটা সঙ্গতিপূর্ণ?

কিছুদিন আগে সরকারের এক দায়িত্বশীল কনস্যুলার নীতিমালা নিয়ে এক আজব ফরমান জারী করে বসলেন। যা কানাডা প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাথে সরকারকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর মতো এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি হলো। বিভিন্ন মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রণীত বিধি বিধান কে তোড়াই কেয়ার করে প্রকাশ্য গণমাধ্যমে তিনি বলতে থাকলেন, কানাডায় তিনি যা চাইবেন সেটিই আইন, বাংলাদেশী কমিউনিটির কে কি ভাবলো, তাতে উনার কিছুই যায় আসে না। বিশ্বের কোথায় বাংলাদেশীদের জন্য কি নিয়ম সেটিও তার বিবেচনায় নেয়ার সুযোগ নেই। প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাথে চাকর বাকর আর ভৃত্যের মতো আচরণ শুরু করলেন। নানা রকম হয়রানিতে গলদঘর্ম হতে থাকলো বাংলাদেশী কমিউনিটি। আল্লাহ সহায় কানাডার প্রতিটি শহরে চরম বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই তিনি আজব ফরমানটি তুলে নিতে বাধ্য হলেন।

এসব আলামত কোন ভাবেই একটি গনতান্ত্রিক দেশের গনতান্ত্রিক সরকারের জন্য শুভ লক্ষণ নয়। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার অর্জন ঈর্ষনীয়। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আর তলাবিহীন ঝুড়িও নয়। বহু ত্যাগে, বহু কষ্টে দয়া দাক্ষিণ্যের দেশকে তিনি আজ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। একাত্তরের পরাজিত শক্তি আর পঁচাত্তরের হায়েনা-দুর্বৃত্তরা আজও সক্রিয়, সুযোগ তৈরীতে ব্যতিব্যস্ত। আমার এক দূরসম্পর্কের দাদা বলতেন, কথায় কথায় যারা ‘খোদার কসম’ দিয়ে বাক্য শুরু করে, এরা নাকি চরম মিথ্যাবাদী আর মুনাফেক হয়। আর ‘অতি ভক্তি চুরের লক্ষ্মণ’ এটি তো সবারই জানা, পঁচাত্তরে ট্রেজেডিই তো তার জলন্ত প্রমাণ। দেশে বিদেশে অতি ভক্তদের চরম বাড়াবাড়ি দেখে মনে আজ শংকা জাগে। শেখ হাসিনার এতো অর্জনের পরও রাজনীতি আর আমলাতন্ত্রে লুকিয়ে থাকা বর্ণ চোরাদের ষড়যন্ত্রে যদি প্রগতির পথটি থেমে যায়, তবে শত বছরেও এর প্রায়শ্চিত্ত হবে অনিশ্চিত।

লেখকঃ কলামিস্ট, উন্নয়ন গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক

প্রবাস বাংলা ভয়েস/ঢাকা/ ১৩ মে  ২০২২ /এমএম