Menu

প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক ::‌ এক সময় দেশের কিছু কিছু অঞ্চলে উৎসবের আমেজে নানারকম চুক্তিতে পরীক্ষার নামে প্রহসন হতো। শিক্ষক, ছাত্র, অভিভাবক ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সম্মিলিত অংশগ্রহণে পরীক্ষা নামক লোক দেখানো নাটকের মঞ্চায়ন হতো। কোনো রাখ-ঢাক নয় প্রকাশ্য দিবালোকে এসব অপকর্ম সংঘটিত হতো।

কুমিল্লার প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুল-কলেজে সে সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছাত্রছাত্রীরা এসে সার্টিফিকেট সংগ্রহের অবৈধ উৎসবে অংশ নিত। কালক্রমে এ ব্যাধি এক সময়ে সারা দেশেই সংক্রমিত হয়েছিল। ১৯৮৬ এবং ৮৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর কোথাও কোথাও স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা স্লোগান তুলেছিল- “ভোট হয়েছে যেভাবে, পরীক্ষা হবে সেভাবে”। অনৈতিকতাকে যেন তখনকার সময়ের তরুণদের একটি বিভ্রান্ত অংশ তাদের অধিকার হিসেবেই প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল।

মাঝে কিছুদিন অসদুপায় অবলম্বনে ভাটা পড়লেও সময়ের আবর্তনে ব্যাধিটি যেন আরও দূরারোগ্য হয়ে উঠে। নিরাময়যোগ্য যক্ষা থেকে ক্যান্সারের রূপ ধারণ করে। পরীক্ষায় নকলের পরিবর্তে চালু হয় প্রশ্নফাঁসের সংস্কৃতি। এক যুগ ধরে মহাসমারোহে চলে পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস। এক সময়ে মেধাবীদের বিশ্বাস ছিল, নকল করে পরীক্ষা পাশ করলেও ভালো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া যাবে না, চাকরির বাজার থেকে অসৎরা ছিটকে পড়বে। তাদের বিশ্বাসকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চালু হয় চাকরি আর ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের এক ভয়াবহ সংস্কৃতি।

এসএসসি, এইচএসসি, মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস যেন অনেকটা নিয়মিত ঘটনার রূপ ধারণ করে। আর জাতিকে বিপন্ন করার এই অবৈধ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে যারা নিয়োজিত, ঘটনার পর ‘প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি গুজব’ এটি বলেই তাদের দায়িত্ব শেষ করলেন। কেউ কেউ আর একটু আগ বাড়িয়ে বললেন- ‘সরকারকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা’। দৈবচয়িত কিনা জানি না, শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে ডা. দীপু মনির আগমন বৃহৎ দুটো’ পাবলিক পরীক্ষায় নকলের মহোৎসব নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি গত দু’বছর যাবত পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিকে প্রতিরোধেও সক্ষম হয়েছে।

মামা চাচার হস্তক্ষেপ, ঘুষ বাণিজ্য এসব তো যুগ যুগ ধরেই চলছে, তার ওপর ক্যান্সারের নব সংস্করণ ‘চাকরির প্রশ্নফাঁস’। মেধাবীরা যাবে কোথায়? যে প্রজন্ম পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্ন পেয়ে কৃতিত্ব দেখিয়েছিল, সেই প্রজন্ম সোনার হরিণ চাকরিটিও একই কায়দায় হস্তগত করছে। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত বিষময় পরিস্থিতি সমাজ কে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, তা ভাবলে গা শিউরে উঠার উপক্রম হয়। আজকাল জনপ্রশাসনের অনেক বিশেষজ্ঞকেও বলতে শোনা যায় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবলের সংকট বিদ্যমান। একাডেমিক পরীক্ষা থেকে শুরু করে চাকরির পরীক্ষা অবধি যদি একই পন্থা অবলম্বন করে পার পাওয়া যায়, তাহলে মেধাবীদের সেবা থেকে জাতির বঞ্চিত না হওয়ার বিকল্প কী?

দুর্নীতি নির্মূলে সদাশয় সরকারের আন্তরিকতা আছে বলেই বিশ্বাস করি। মৌলিক চাহিদা পূরণের নিশ্চয়তা থাকলে ব্যতিক্রম বাদে কেউ দুর্নীতিগ্রস্ত হবেন না- এই বিশ্বাস থেকে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ২০১৪ বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দীনের নেতৃত্বে গঠন করেছিলেন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জাতীয় বেতন কমিশন। ‘সরকারি চাকরিতে অপর্যাপ্ত মাহিনা’- এই অপবাদ ঘুচিয়ে সরকার ফরাসউদ্দীন কমিশনের বিলাসী বাজেটের সুপারিশকেও অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করেন। ‘কয়লা ধুইলে ময়লা যায় না’ সরকারি দপ্তরের দুর্নীতির রূপ পাল্টালেও ব্যাপ্তি কমেছে- এমন কথা হলফ করে বলার কোনো সুযোগ নেই।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জাতি উন্নত দেশের স্বপ্ন দেখছে। অর্থনীতির পরিসংখ্যানও সেই স্বপ্নেরই সাক্ষ্য দিচ্ছে। আর পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল, মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর, দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন, ঢাকার মেট্রোরেলসহ মেগা প্রকল্পগুলোর এগিয়ে চলা সেই পথকেই নির্দেশ করছে। শিল্পায়ন আর যোগাযোগে বিপ্লব সৃষ্টি করে অর্থবিত্তে সমৃদ্ধ হওয়া যাবে বটে, কিন্তু ফাঁসের প্রশ্ন দিয়ে পরীক্ষায় পাশ করে, লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয়ে চাকরির বাজার দখল করা প্রজন্ম দিয়ে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে কি?

করোনাকালের দুসঃময়কে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি দপ্তর অধিদপ্তরে জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হচ্ছে। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের সিলেকশন কমিটি পাঁচটি ব্যাংকে অফিসার নিয়োগের নিমিত্তে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার আয়োজন করেছিল। এক হাজার পাঁচশ এগারোটি পদের বিপরীতে পরীক্ষায় আবেদনকারীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার ৫১১ জন। পরীক্ষা চলাকালীন চিরাচরিত নিয়মে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ উঠলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অস্বীকৃতি জানাতে দেরি করেননি।

সৌভাগ্য জাতির! ঢাকা গোয়েন্দা পুলিশের তৎপরতায় প্রশ্নফাঁসকারী চক্রকে আটক করার খবর দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে। অনুষ্ঠিত পরীক্ষাটির ভাগ্য সম্পর্কেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। তবে ব্যবস্থাপনার সাথে নিয়োজিতদের পরিণতি কী হচ্ছে, সেটি জানার সুযোগ এখনো হয়নি!

অন্যায়, অনিয়মকে সহ্য করে অথবা তাকে প্রশ্রয় দিয়ে একটি দুর্নীতিমুক্ত সুন্দর সমাজ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন শুধু অলীক নয় অসম্ভবও বটে। শুধুমাত্র জিডিপির ঊর্ধ্বগতি আর প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক উন্নতি কোনোভাবেই একটি সুস্থ সমাজ ব্যবস্থার নিয়ামক নয়। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি একটি সুদক্ষ, নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি করতে না পারলে আগামী দিনের বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে টেকসই সমাজ উন্নয়ন সম্ভব নয়।

উন্নত বিশ্বে শিক্ষাঙ্গনকে নৈতিক মূল্যবোধ চর্চার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে মনে করা হয়। শিশু শ্রেণি থেকেই কারেকশনাল স্টাডিজ মৌলিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত হয়ে দাদশ শ্রেণি অবধি বাধ্যতামূলকভাবে তা অনুসরণ করা হয়। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় যেখানে নোট মুখস্থ করে একাধিক শিক্ষার্থী একই উত্তর লিখে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় বিপরীতে পাশ্চাত্য শিক্ষা ব্যবস্থায় সেটি গর্হিত অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। দু’জন শিক্ষার্থীর প্রশ্নোত্তরে একটি লাইন হুবহু মিলে গেলে অধবা কনসেপ্ট মিলে গেলেও তাকে প্লাজারিজমের দায়ে অভিযুক্ত হতে হয়। সেক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে প্লাজারিজমের জন্য জিরো টলারেন্স নীতির অনুসরণ।

আমাদের দেশে আজকাল শুধু শিক্ষার্থী নয়, প্রায়শই গবেষণা নকল, প্রবন্ধ নকল এমনতর নানা ঘটনার সঙ্গে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষকদের সংশ্লিষ্টতার খবর গণমাধ্যমে উঠে আসে। তদন্তসাপেক্ষে প্রমাণ হওয়ার পরও বিচারে জিরো টলারেন্স নীতিকে অনুসরণ করা হয় না। একজন অধ্যাপককে পদাবনতি দিয়ে সহযোগী অধ্যাপক করা হয়। এমনকি নৈতিক স্খলনের অভিযোগ থাকলেও রাজনৈতিক বিবেচনায় শাস্তি এড়িয়ে বহাল তবিয়তে থাকার অসংখ্য উদাহরণ বিদ্যমান।

অথচ পাশ্চাত্য সমাজে এমন অভিযোগ উত্থাপিত হওয়া মাত্র শিক্ষক, ছাত্র আর প্রশাসক যেই হোন, সঙ্গে সঙ্গে জিরো টলারেন্স কার্যকর হয়ে যায়। আর তদবির! সে তো আকাশ কুসুম। অভিযোগ প্রমাণিত হলে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; ক্রিমিনাল রেকর্ডের দায় মাথায় নিয়ে আর এর যন্ত্রণাকে চিরসাথী করেই একদিন ইহজগৎ ত্যাগ করতে হয়। এভাবেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করেই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সাথে সাথে একটি টেকসই সুস্থ ধারার সমাজ বিকাশে কাজ করেছে পাশ্চাত্য সমাজ, জায়গা করে নিয়েছে উন্নত সমৃদ্ধ রাষ্ট্রের তালিকায়।

বাংলাদেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্রের খ্যাতি অর্জন করতে হলে, সুস্থ সমাজ ব্যবস্থাই একটি আবশ্যকীয় পূর্বশর্ত। এই শর্ত পূরণে আর দেরি না করে শিক্ষাঙ্গনকে ভিত্তিমূল ধরে শিক্ষা ব্যবস্থাপনাসহ চাকরিতে নিয়োগে যে কোনো ধরনের অনৈতিকতা ও অনিয়মের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্সের নীতিকে শতভাগ বাস্তববায়ন করতে হবে। অন্যথায় কাগজ-কলমের কোনো অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানই একটি উন্নত, সুখী সমৃদ্ধ সমাজ ব্যবস্থার নিশ্চয়তা দিতে পারবে না। তাই আর বিলম্ব না করে, যে কোনো মূল্যে প্রশ্নফাঁসের সংস্কৃতি বন্ধ করুন। আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একটি নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন দক্ষ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরির এখনই শ্রেষ্ঠ সময়।

প্রবাস বাংলা ভয়েস/ঢাকা/ ১৪ নভেম্বর  ২০২১ /এমএম