Menu

প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক ::‌ করোনা মহামারীকালে দেশের শিশু শিক্ষায় বৈষম্য বেড়েছে। শহরের শিক্ষার্থীরা এসময় ভার্চুয়ালি ক্লাস করতে পারলেও গ্রামের ৬৮.৯ শতাংশ শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তির অভাবে তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এক জরিপে দেখা গেছে, করোনাকালে স্কুল বন্ধ থাকায় গ্রাম ও শহরের বস্তি এলাকার কমপক্ষে ২২ শতাংশ প্রাথমিক ও ৩০ শতাংশ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী লার্নিং লস বা শিক্ষণ ঘাটতির মুখে পড়েছে। শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের শিক্ষায় গ্রাম ও শহরের যে বৈষম্য ছিল করোনা তা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী আরো পিছিয়ে পড়বে।

দীর্ঘ দেড় বছর পর গত সেপ্টেম্বর থেকে সীমিত আকারে শিক্ষাঙ্গন খুলে দেয়া হলেও ক্লাসে ফেরেনি সব শিক্ষার্থী। এই ঝরে পড়ার মূল কারণ বাল্যবিয়ে ও শিশুশ্রম। তা ছাড়া করোনাকালে ঘরবন্দি শিশুরা দিনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছে স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটে। মাত্রাতিরিক্ত ইন্টারনেট ও ডিজিটাল ডিভাইসে আসক্তির ফলে শিশুদের দৃষ্টিশক্তি লোপ, কান, ঘাড় ও মাথাব্যথা, মনোযোগ হ্রাস, তীব্র বিষণ্নতাসহ মানসিক ও শারীরিক নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক হলেও এখনো পড়ালেখায় মনোযোগ বসাতে পারছে না তারা। যা তাদের বিকাশে বড় অন্তরায় হতে পারে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, সংবিধানের ১৫ নম্বর ধারায় গ্রাম এবং শহরের শিক্ষা বৈষম্য গোছাতে বলা হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার ৫০ বছরেও যখন এই বৈষম্য আছে। এর মানে আমরা সংবিধান অনুসরণ করিনি। করোনায় এই বৈষম্য আরো বেড়েছে এবং বাড়বে। কারণ করোনায় অনেক শিক্ষার্থী ঝরে গেছে, অনেকে পড়ালেখার সুযোগ পায়নি। এ নিয়ে সরকারের কোনো স্পস্ট নীতিমালা নেই। আর সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায়ও হযবরল অবস্থায় আছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য যথার্থ শিক্ষাবিদদের নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চিন্তাভাবনা ও পরিকল্পনা করা উচিত।

শিক্ষাবিদ যতিন সরকার বলেন, শিক্ষায় আগে যে একটা বৈষম্য ছিল, করোনাকালে তা আরো বেড়েছে। উন্নত সুযোগ-সুবিধার কারণে ধনীর সন্তানরা এগিয়ে যাচ্ছে, পিছিয়ে পড়ছে গরিবের সন্তানরা। ফলে শিক্ষাব্যবস্থায় শুধু নয়, সামাজিকভাবেও এর নেচিবাচক প্রভাব পড়বে। এই বৈষম্য দূর করতে গ্রাম এবং শহরের সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য ৩ মাসের আলাদা কোর্স করা যেতে পারে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) অধ্যাপক শাহেদুল খবির চৌধুরী বলেন, গ্রাম এবং শহরের বস্তি এলাকার অনেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে শহরের শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধার একটা তফাৎ রয়েছে। করোনাকালে আমাদের বিকল্প যা ছিল তা-ই ব্যবহার করা হয়েছে। অনেকেই অনলাইন ক্লাসের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। অনলাইন ক্লাস না হলে আরো বিরাট একটা সংখ্যা বঞ্চিত হত। এখন আমাদের যে লার্নিং গ্যাপ সেগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। এর পর শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে লার্নিং গ্যাপগুলো পূরণ করতে হবে। পাশাপাশি সুযোগ-সুবিধাগুলোও আরো বাড়িয়ে দেয়া হবে।

শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও পাঠদান বন্ধ থাকেনি। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান বন্ধ থাকলেও টেলিভিশন ও অনলাইনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাঠদান অব্যাহত রেখেছি। যখন আমরা দেখলাম কিছু শিক্ষার্থীর টেলিভিশন ও অনলাইন ব্যবহারের সুযোগ ছিল না বলে তারা এর থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল, তখন আমরা অ্যাসাইনমেন্টের ব্যবস্থা করেছি। এর মাধ্যমে আমরা সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছতে পেরেছি।

তিনি বলেন, খুব স্বাভাবিকভাবে আমরা ষোলো আনা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের বিকল্প করতে পারিনি। কোথাও কোথাও তো কিছু ঘাটতি রয়েছেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার পরে সেই ঘাটতি পূরণের জন্য আমাদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। সেই অনুযায়ী কাজ চলছে।

গত জানুয়ারিতে প্রকাশিত গণস্বাক্ষরতা অভিযান ও এডুকেশন ওয়াচ-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে দূরশিক্ষণে (সংসদ টিভি, অনলাইন, রেডিও ও মোবাইল ফোন) ৩১.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছে। অর্থাৎ ৬৯.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী কোনো ধরনের অনলাইন শিক্ষার আওতায় আসেনি। যেসব শিক্ষার্থী দূরশিক্ষণ প্রক্রিয়ার বাইরে রয়েছে, তাদের মধ্যে ৫৭.৯ শতাংশ ডিভাইসের অভাবে অংশগ্রহণ করতে পারছে না।

আর গ্রামীণ এলাকায় এই হার ৬৮.৯ শতাংশ। এছাড়া অনলাইন ক্লাস আকষর্ণীয় না হওয়ায় ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অংশ নেয় না। ৯৯ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়িতে নিজে নিজে পড়ালেখা করেছে বলে জানায়। তবে রাজধানী ও জেলা সদরের বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো অনলাইনে ক্লাস নিলেও সেখান থেকে শিক্ষার্থীরা কতটুকু শিখছে তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) ওপর গবেষণায়ও উঠে এসেছে একই চিত্র। গবেষণায় দেখা গেছে, দূরশিক্ষণের মূল উপায় হল টেলিভিশনে রেকর্ড করা ক্লাস এবং অনলাইন ও সরাসরি অনলাইন ক্লাস। তবে এসব ক্লাসে থাকার সুযোগ খুব কম শিক্ষার্থীরই হয়েছে। ফলে গ্রাম ও শহরের বস্তি এলাকার কমপক্ষে ২২ শতাংশ প্রাথমিক ও ৩০ শতাংশ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী স্কুল বন্ধ থাকায় লার্নিং লস বা শিক্ষণ ঘাটতির ঝুঁকিতে পড়েছে।

গবেষকদের মতে, এমন শিক্ষার্থীরাই আছে শিক্ষণ ঘাটতি বা লার্নিং লসের ঝুঁকিতে। গ্রাম ও শহুরে বস্তি এলাকায় চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষণ ঘাটতি বা লার্নিং লসের ঝুঁকি বেড়েছে। শিক্ষণ ঘাটতির এই প্রবণতা আবার মাধ্যমিকে পড়ুয়া কিশোরদের মধ্যে বেশি দেখা গেছে। চলতি বছরের মার্চে তাদের মধ্যে এই ঝুঁকি ২৬ শতাংশে থাকলেও আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪ শতাংশে ।

‘ঝরে পড়া’ শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও শিশুশ্রম বেড়েছে আশঙ্কাজনক: করোনার কারণে দীর্ঘ দেড় বছর বন্ধ ছিল সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। গত সেপ্টেম্বর থেকে সীমিত আকারে শিক্ষাঙ্গন খুললেও ক্লাসে ফিরেনি সব শিক্ষার্থী। এই ঝরে পড়ার মূল কারণ হচ্ছেÑ বাল্যবিয়ে ও শিশুশ্রম। এক গবেষণায় দেখা গেছে, করোনাকালে প্রায় ১০-১২ শতাংশ মেয়ে শিশু বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। তবে ঠিক কতসংখ্যক শিশু করোনাকালে পরিবারের হাল ধরতে শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়েছে তার কোনো হিসাব কারো কাছে নেই। সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, এ সংখ্যা হবে কয়েক লাখ।

এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের (এমজেএফ) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১০-১২ শতাংশ মেয়ে শিশু বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে করোনাকালে। এ ছাড়াও অন্তত ১৫-২০ শতাংশ পরিবারে শিশু খাদ্যের ক্ষেত্রেও ব্যয় সঙ্কোচন করতে হয়েছে, যা শিশুদের পুষ্টিহীনতা অনেকাংশে বাড়িয়েছে। তাদের গবেষণা ও জরিপ অনুযায়ী, ‘ঝরে পড়ার’ মূল কারণ বাল্যবিয়ে ও শিশুশ্রম। করোনার সময় দেশের অধিকাংশ শিশু মূলত দারিদ্র্য এবং অন্যান্য সামাজিক কারণে বাল্যবিয়ে ও শিশুশ্রমের শিকার হয়েছে, যা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে অধিকতর তীব্র।

এসএসসিতে ঝরে পড়ল পৌনে ৩ লাখ শিক্ষার্থী: আগামী ১৪ নভেম্বর শুরু হচ্ছে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা। এবারের পরীক্ষায় মোট ২২ লাখ ২৭ হাজার ১১৩ জন শিক্ষার্থীর অংশ নেয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে নিয়মিত হিসেবে অংশ নিচ্ছেন ১৬ লাখ ৭০ হাজার ৩৮০ জন। অনিয়মিত হিসেবে অংশ নিচ্ছেন ৫ লাখ ৫৬ হাজার ৭৩৩ জন।

তবে, পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে নবম শ্রেণিতে নিবন্ধন করেছিলেন ১৯ লাখ ৪৮ হাজার ৫৬ জন। বাকি ২ লাখ ৭৭ হাজার ৬৭৬ জন বিভিন্ন কারণে পরীক্ষা দিচ্ছেন না। অর্থাৎ নিবন্ধন করা শিক্ষার্থীর প্রায় ১৬ শতাংশই ঝরে পড়েছে। এই ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের ৭২ শতাংশই ছাত্রী।

অতিরিক্ত ইন্টারনেটে আসক্তি: রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব শিশুই করোনাকালে ছিল ঘরবন্দি। তাদের বিনোদনের পরিসর ছিল সীমাবদ্ধ। বাধ্য হয়েই ঘরবন্দি অবস্থায় তারা ভিডিও গেম, ইউটিউব ও ইন্টারনেট ব্রাউজিং আর অনলাইন ক্লাস করে সময় পার করে। ইন্টারনেট আর ডিজিটাল ডিভাইসে অতিমাত্রায় আসক্তির ফলে শিশুরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও হীনম্মন্যতার শিকার হয়। এতে অনেকের অটিজম, মনোযোগ হ্রাস ও তীব্র বিষণœতাসহ নানা শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে। তাদের অনেকেই এখনো লেখাপড়ায় মন বসাতে পারে না। ডিজিটাল ডিভাইসের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার শিশুর ভবিষ্যৎ বিকাশে বড় অন্তরায় হতে পারে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘক্ষণ স্মার্টফোনে কিংবা ল্যাপটপে বসে থাকায় রয়েছে নানা ক্ষতিকর দিক। দীর্ঘক্ষণ ছোট স্ক্রিনে তাকানোর ফলে দৃষ্টিশক্তি লোপ, কান, ঘাড় ও মাথা ব্যথাসহ মানসিক নানা সমস্যা দেখা দেয়।

এ প্রসঙ্গে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আনোয়ারা সৈয়দ হক বলেন, এটা শুধু বাংলাদেশের নয়, এটা একটা বৈশ্বিক সমস্যা। করোনাকালে শিশুদের কোনো উপায় না থাকায় তারা ইন্টারনেট আর ডিজিটাল ডিভাইসে আসক্ত হয়ে পড়ে। এখন অনেক শিশু সেই আসক্তি ছেড়ে পড়ালেখায় মনোযোগীসহ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারছে না। তবে যখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, শিশুদের নিয়মিত সব ক্লাস হবে, খেলাধুলাসহ অন্যান্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাজ বাড়বে তখন সবকিছু ঠিক হবে যাবে। শিক্ষার্থীরা ইন্টারনেট আসক্তি ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে। লেখাপাড়ায়ও মনোযোগী হবে।

প্রবাস বাংলা ভয়েস/ঢাকা/ ০১ নভেম্বর  ২০২১ /এমএম


Array