প্রতারণা বা অন্যকে ঠকিয়ে লাভবান হওয়ার প্রবণতা আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় যুগ যুগ ধরেই ছিল, তবে বিগত একদশকে এ যেন এক সামাজিক ব্যাধিতেই রুপান্তরিত হয়েছে। একযুগ আগেও প্রতারকরা সমাজে ঘৃণিত মানুষ হিসেবেই পরিচিত হতো কিন্ত আজকাল গ্রহণযোগ্যতার মাত্রাটি যেন পালটে গিয়েছে। সেই সাথে এর রুপটিও ভিন্ন মাত্রায় বিকশিত হয়েছে। অর্থাভাব, বেকারত্ব, দারিদ্র্যতা এমন নানা মাত্রার অসহিষ্ণুতায় এক সময় মানুষ জড়িয়ে যেতো প্রতারণায়, এক্ষেত্রে অর্ধ শিক্ষিত, দরিদ্র বিপথগামী মানুষগুলো প্রতারণাকে বেঁচে থাকার অবলম্বন মনে করতো। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমাজ এ ধরণের মানুষগুলোকে করুণার চোখে দেখতো। তবে কোন কালেই এরা সমাজপতি সেজে সমাজ ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা যেমন করেনি ঠিক তেমনি প্রতারণা কে পেশা হিসেবে বেঁচে নিয়ে অর্থ বিত্তের মালিক হয়ে কারও নিয়ন্তা হওয়ারও চেষ্টা করেননি। কখনো এটি উচ্চ শিক্ষিত মেধাবীদের পেশাও হয়ে উঠেনি।
তবে যখন থেকে শিক্ষিত, মেধাবী আর চৌকসরা প্রতারণাকে পেশা হিসেবে বেঁচে নেয়, অর্থ বিত্তের মালিক হয়ে রাজনীতির সংগে মিশে যায়, তখন থেকেই শুরু হয় প্রতারণার প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিকীকরণ। আর এমন দুষ্ট চক্রের সামাজিকীকরণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত আর সমাজের খেটে খাওয়া মানুষ। প্রিয় পাঠক, আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে যুব কর্ম সংস্থান সোসাইটির ( যুবক) কথা, যারা প্রায় চার লক্ষ গ্রাহকের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছিল আড়াই হাজার কোটি টাকা, যার সরাসরি প্রভাবে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় দেড় কোটি প্রান্তিক মানুষ। এই প্রতারণার অনুসন্ধানে ২০১০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ডঃ মোহাম্মদ ফরাসউদ্দীন কে প্রধান করে একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন তদন্ত কমিশন, ২০১১ সালে রফিকুল ইসলামকে প্রধান করে আরও একটি কমিশন গঠন করা হয়েছিল। প্রশাসক নিয়োগ করে বার বার ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি আলোচিত হলেও আইনি মারপ্যাচ আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আজও সেটি আলোর মূখ দেখেনি।
এমএলএম কোম্পানি আইনের সুযোগ নিয়ে গঠিত ডেসটিনি, ২০০০-২০১২ সালে প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেয় আমজনতার ৫০০০ কোটি টাকা, গ্লোবাল গেইন ইন্টারন্যাশনাল ১৩ হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে আত্নসাত করে আড়াইশো কোটি টাকা। ডিজিটালাইজেশনের সুযোগ নিয়ে প্রতারণার প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিকীকরণের বর্ধিত সংস্করণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ই-কমার্স। যার সুযোগ নিয়ে নোভেরা প্রোডাক্টস ৪০ হাজার ডিসট্রিবিউটর নেয়ার নামে হাতিয়ে নিয়েছে ৬০০ কোটি টাকা। ২০ হাজার লোককে চাকুরী দেয়ার কথা বলে লাইফওয়ে বাংলাদেশ লিমিটেড হাতিয়ে নেয় ৭০ কোটি টাকা। ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ এর হাজার হাজার কোটি টাকার প্রতারণার খবরে তো এখনো হাজার হাজার গ্রাহকের আহাজারিতে রাজপথ উত্তপ্ত। প্রতারণার প্রাতিষ্ঠানিকিকরণের এমন অবারিত সুযোগ পৃথিবীর অন্য কোন সমাজে আছে বলে জানা নেই।
আজকাল ডিজিটালাইজেশনের সুযোগ নিয়ে এটি যেন অনেক উচ্চ শিক্ষিত মেধাবীদেরও পেশা হয়ে উঠছে। বছরে কয়েক আগে আমারএমপি.কম নামে একটি ওয়েবসাইটের প্রতি আমার দৃষ্টি নিবন্ধ হয়েছিল। ভেবেছিলাম এটি বোধ হয় সরকার নিয়ন্ত্রিত আমাদের জাতীয় সংসদ সদস্য মহোদয়দের কোন প্লাটফরম। যেখান থেকে এমপি সাহেবদের এম্বাসেডার নিয়োগ দেয়া হচ্ছিল। প্রতিদিনই নতুন নতুন সংসদ সদস্য আর তাদের এমবেসেডার যোগদানের সংবাদ আমাকে বড় বেশী আগ্রহী করে তুলেছিল। উৎকন্ঠা অবসানে আমার এমপি.কমের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু লোকের সংগে যোগাযোগ করে জানতে পারি, প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মেধাবী তরুণ,লন্ডন প্রবাসী প্রকোশলী সুশান্ত দাশগুপ্ত নাকি (!) প্রচার করেন তিনি সরকারের অত্যন্ত উঁচু মহলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন। সরকারের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে, সংসদ সদস্য মহোদয়দের সরাসরি জনগণের জবাবদিহিতার আওতায় এনে স্বচ্ছতা কে নিশ্চিত করে উন্নয়ন কে তরান্বিত করতে সেই নীতি নির্ধারকের পরামর্শেই নাকি(?) আমারএমপি.কমের আত্নপ্রকাশ। তাই আত্নপ্রকাশের শুরু থেকেই বিগত কয়েক বছর যাবত অনেক আগ্রহ আর প্রত্যাশা নিয়ে আমার মতো অনেকেই অবলোকন করছিলো আমারএমপি.কমের কার্যক্রম।
সম্প্রতি আমারএমপি.কমের নিজস্ব ওয়েব সাইটে প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায় ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও সংসদীয় এলাকার ই-কমার্স কো-অর্ডিনেটরের সর্বমোট ৪৬৭৮৪ টি পদে নিয়োগ দিচ্ছে আমারএমপি.কম( amarmp.com) । যে দেশে লক্ষ লক্ষ বেকার তরুণ হন্যে হয়ে প্রতিদিন চাকুরী খুজে বেড়াচ্ছে, সে দেশে এক সংগে অর্ধ লক্ষ বেকার চাকুরি পাবে, এমন সংবাদে কার না ভালো লাগে বলুন!! কিন্তু চারিদিকে প্রতারণার প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিকীকরণ যখন তুঙ্গে সেই সময়ে এ রকম বিশাল আকারের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে আনন্দ আর শংকা নিয়ে আমি যখন দোদুল্যমান এমন সময়ে হবিগঞ্জ থেকে প্রকাশিত একটি সংবাদপত্র চাকুরি দেয়ার নামে আমারএমপি.কমের প্রতারণার সংবাদ প্রকাশ করে। প্রতিটি চাকুরী প্রার্থী দরখাস্তের সাথে ৯৯ টাকা ফি দিয়ে আবেদন করেছিল। যে দেশে একটি পদের বিপরীতে হাজার আবেদনের ইতিহাস আছে, সে দেশে ৪৬৭৮৪ টি পদে গড়ে কমপক্ষে ১০টি আবেদন পড়লেও এর মোট সংখ্যা দাড়ায় ৪,৬৭,৮৪০ জন, আর আবেদন ফি দাঁড়ায় ৪৬,৩১,৬,১৬০ টাকা। ভাবতেই গা শিউরে উঠে আবেদন ফি দিয়েই অর্ধ কোটি টাকার রমরমা বানিজ্য নয় তো !!
যুবক, ডেসটিনি, গ্লোবাল গেইন, নভেরার মতো তদন্তে প্রমাণিত না হলেও সংবাদ পত্রে প্রকাশিত আমারএমপির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিটি নানা কারণেই শংকার জন্ম দেয়। ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি স্বেচছাসেবী সংস্থা হিসেবে নিবন্ধিত আমারএমপি.কম কখন, কিভাবে একটি ই-কমার্স বা বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিনত হলো তার কোন প্রমাণ প্রতিষ্ঠানটির তথ্যে নেই। অর্ধ লক্ষ লোকের কর্ম সংস্থান সৃষ্টির মতো কোন প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা প্রতিষ্ঠানটির আছে বলেও কোনভাবেই প্রতীয়মান হয় না। আমার হবিগঞ্জ নামে একটি অনলাইন ভিত্তিক সংবাদ পত্র ব্যতিত আর কোন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার দৃশ্যমান প্রমাণ নেই।
কেউ হয়তো বলবেন, যাচাই বাছাই না করে চাকুরি প্রার্থীরা আবেদন করে কেন? যে প্রতিষ্ঠানের প্রধান, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে উঠাবসা করেন, এমপি, মন্ত্রীর সাথে একান্তে বৈঠক করেন, ডিজিটাল বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টাকে তার ঘনিষ্ঠজন বলে প্রচার করেন, এমন মানুষ কে আমার মতো খেটে খাওয়াদের বিশ্বাস না করে উপায় কি? আবার কেউ হয়তো বলবেন, প্রতারণা তো এখনো প্রমাণিত সত্য নয়। একমত হয়ে বলবো, চুড়ান্ত প্রতারণা সংঘটিত হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্টদের সতর্কতা জরুরি নয় কি?
প্রশাসন, এমপি, মন্ত্রীদের সাথে আমার এমপি প্রধানের সচিত্র অবস্থান দেখে এখনও অনেকেই বিশ্বাস করেন আমারএমপি.কম সরকারি আনুকুল্যে পরিচালিত একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। তবে অর্ধ লক্ষ লোকের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিটি আমার মতো হাজারো মানুষকে শুধু সন্ধিহান-ই নয় ভীষণভাবে শংকিতও করেছে। সে শংকা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক প্রতারণার-ই নয়, সেই শংকা উন্নত ডিজিটাল বাংলাদেশের বিস্ময়কর স্বপ্নদ্রষ্টা সর্ব কালের সর্ব শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র, মাদার অব ইউমিনিটি, পৃথিবীখ্যাত অন্যতম সৎ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শেখ হাসিনা তনয় সজীব ওয়াজেদ জয়ের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রতারণার শংকা। আর এই শংকা আর সংশয় দূরীকরণে দূর্নীতি দমন কনিশন, বানিজ্য, স্বরাষ্ট্র আর অর্থ সংশ্লিষ্ট যে মন্ত্রণালয় বা বিভাগেরই দায়িত্ব হোক, তাদের এগিয়ে আসার বিকল্প কোন পথ খোলা নেই।
প্রতিটি গনতান্ত্রিক সরকার-ই দেশের জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে সাংবিধানিক ভাবেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর অর্থনৈতিক প্রতারণা যখন সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে উঠে, তখন রাষ্ট্রীয় বিধি বিধানের কঠোরতা ছাড়া এর প্রতিকারও হয়ে উঠে অসম্ভব। শুধুমাত্র একটি দেশের সরকার প্রধান হিসেবে নয় জাতির জনকের যোগ্য উত্তরাধিকার হিসেবে উন্নয়নের স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ হাসিনার সরকারের কাছে স্বাভাবিক ভাবেই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পরিমাণটাও বেশি। তাই ডিজিটালাইজেশনের সুযোগে ই-কমার্সের নামে প্রতারণার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ রোধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান করে আইনের কঠোর অনুশাসন এখনই জরুরি হয়ে উঠেছে।
লেখকঃ কলামিস্ট, উন্নয়ন গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক
প্রবাস বাংলা ভয়েস/ঢাকা/ ১০ সেপ্টেম্বর ২০২১ /এমএম





