প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক :: মাছ বাঙালি জাতির সংস্কৃতি ও কৃষ্টির অংশ। দেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর পুষ্টি চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন ও রপ্তানি আয়ে মৎস্য খাতের অবদান আজ সর্বজনস্বীকৃত। মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৪.৭৩ শতাংশ মৎস্য উপখাতের অবদান এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২৫.৭২ শতাংশ। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যে প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে মাছ থেকে।
দেশের প্রায় ১৪ লাখ নারীসহ মোট জনসংখ্যার ১২ শতাংশেরও বেশি অর্থাৎ প্রায় ২ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করছে। বর্তমানে দেশের মানুষ গড়ে জনপ্রতি প্রতিদিন ৬০ গ্রাম চাহিদার বিপরীতে ৬২ দশমিক ৫৮ গ্রাম মাছ গ্রহণ করছে।
আর এ প্রাণিজ আমিষের প্রধান উৎস মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা তৈরির জন্য অন্যান্য বছরের মতো এবারো আয়োজন করা হচ্ছে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ। এবার ২৮ আগস্ট থেকে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ-২০২১ শুরু হচ্ছে। ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণপূর্বক এটি পালন করা হবে। জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘বেশি বেশি মাছ চাষ করি, বেকারত্ব দূর করি’।
কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে মৎস্য উপখাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময়। বিগত ২০০৮ সালে মৎস্য উপখাতে গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫ শতাংশ। বর্তমানে প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশ। দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ আসে মৎস্য উপখাত থেকে। সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় ২০১৫ সালের মধ্যে অর্জিতব্য নির্দিষ্ট ৮টি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ সরকার প্রণীত দারিদ্র্যবিমোচন কৌশলপত্রে মৎস্য উপখাতকে দারিদ্র্যবিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দরিদ্রবান্ধব অর্থনৈতিক উন্নয়নে অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
দারিদ্র্যবিমোচনে মৎস্য উপখাতের, বিশেষ করে মাছচাষ সম্প্রসারণ ও মুক্ত জলাশয়ে মৎস্য সম্পদের জৈবিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দরিদ্রবান্ধব অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। দেশে বর্তমান বেকারত্বের সংখ্যা ২০২১ সালের মধ্যে ১.৫ কোটিতে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বর্তমান দারিদ্র্যসীমার হার ২০ শতাংশ ও চরম দরিদ্রের হার ১০ শতাংশে কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে মৎস্য উপখাত সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
বাংলাদেশ পানিসম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এ দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য পুকুর-দিঘি, ডোবা-নালা, নদ-নদী, খাল-বিল ও বাঁওড়। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলজুড়ে রয়েছে বিশাল হাওড় এলাকা, যা আমাদের মৎস্য সম্পদের সূতিকাগার হিসাবে পরিচিত।
বাংলাদেশে ৩ দশমিক ৫ লাখ হেক্টর আয়তনের প্রায় ১৩ লাখ পুকুর-দিঘি রয়েছে। দেশের ২৪ হাজার কিমি. দীর্ঘ নদ-নদীর আয়তন প্রায় ১০ দশমিক ৩২ লাখ হেক্টর। এ ছাড়া রয়েছে ১ দশমিক ১৪ লাখ হেক্টর জলায়তনের প্রায় ১১ হাজার বিল, ৫ হাজার ৪৮৮ হেক্টর আয়তনের বাঁওড়, ৬৮ হাজার ৮০০ হেক্টর কাপ্তাই হ্রদ, প্রায় ২.০০ লাখ হেক্টর সুন্দরবন খাড়ি অঞ্চল এবং ২৮ দশমিক ৩০ লাখ হেক্টরের বিশাল প্লাবনভূমি।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত তিন দশকে বাংলাদেশে মাছের উৎপাদন বেড়ে হয়েছে প্রায় ২৫ গুণ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা মাছ নিয়ে তাদের ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার-২০২০’ শিরোনামে প্রকাশিত বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলেছে, স্বাদু পানির উন্মুক্ত জলাশয় থেকে মাছ আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে তৃতীয়। দেশে উৎপাদিত মাছের ৭৫ শতাংশ এখন বাজারজাত করছেন মৎস্যচাষিরা।
এ ছাড়া কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন ও চাষাবাদ পদ্ধতি উদ্ভাবন করে ফিরিয়ে আনা হয়েছে ২৪ প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় দেশি মাছ। সব মিলিয়ে স্বাধীনতার ৫০ বছরে মাছ উৎপাদনে রেকর্ড সৃষ্টি করছে বাংলাদেশ।
এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, গত পাঁচ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে মাছের উৎপাদন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে মাছ উৎপাদন হয় ৩৬ লাখ ৮৪ হাজার টন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩৮ লাখ ৭৮ হাজার টন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪১ লাখ ৩৪ হাজার টন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪২ লাখ ৭৭ হাজার টন এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪৩ লাখ ৮১ হাজার টন। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশের মৎস্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা গিয়ে দাঁড়াবে ৪৫ দশমিক ৫২ লাখ টন।
বাংলাদেশ এখন মাছে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বর্তমান বিশ্বে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। বিশ্ব খাদ্য সংস্থা পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২২ সাল নাগাদ বিশ্বের যে চারটি দেশ মাছ চাষে বিপুল সাফল্য অর্জন করবে, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। তাছাড়া গবেষণার মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া অনেক প্রজাতির মাছ এখন চাষ করা হচ্ছে। হারিয়ে যাওয়া মাছ চাষ হচ্ছে সরকারি-বেসরকারিভাবেও।
এ ছাড়া মা ইলিশ ও জাটকা রক্ষায় সরকার ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ এখন ইলিশ উৎপাদনে বিশ্বে রোল মডেল। বিশ্বে ইলিশ উৎপাদনকারী ১১টি দেশের মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশেই ইলিশ উৎপাদন বেড়েছে; বর্তমানে ১২৫টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে ২০০৮-০৯ সালে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৯২ হাজার টন, যা বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৮-১৯ সালে ৫ লাখ ৩৩ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে।
অর্থাৎ গত ১২ বছরে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৮৩ শতাংশ। এ ছাড়া গত ২০১৬ সালে ইলিশ বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ইলিশের স্বত্ব এখন শুধুই বাংলাদেশের। এটি জাতির জন্য গৌরবের। বর্তমান সরকারের নানামুখী কর্মকাণ্ড ও বেকারত্ব নিরসনে মৎস্য খাত বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে। বর্তমানে মাছ চাষ ও ব্যবসায় দুই কোটির কাছাকাছি মানুষ যুক্ত আছেন।
মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বিশ্বজুড়ে মানুষের মাছ খাওয়া বেড়েছে ১২২ শতাংশ। বর্তমানে বিশ্বের সাতটি দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের অর্ধেকের বেশি আসে মাছ থেকে। বাংলাদেশে প্রাণিজ আমিষের ৫৮ শতাংশ আসে মাছ থেকে। আর বিশ্বে গড়ে প্রাণিজ আমিষের ২০ শতাংশ আসে শুধু মাছ থেকে। এদিকে গত ১০ বছরে দেশে মাথাপিছু মাছ খাওয়ার পরিমাণ প্রায় শতভাগ বেড়েছে।
২০১০ সালের সর্বশেষ খানা জরিপে উঠে এসেছে- বছরে বাংলাদেশে একেকজন মানুষ প্রায় ১২ কেজি মাছ খেত। এখন সেটা ৩০ কেজিতে পৌঁছেছে। দেশের জিডিপিতে কৃষির অবদান ১৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ। জিডিপিতে কৃষির অবদান কমলেও মৎস্য উপখাতের অবদান কিছুটা বেড়েছে। মোট জিডিপিতে মৎস্য উপখাতের অবদান ২০১৬-১৭ সালে ছিল ৩ দশমিক ৬১ শতাংশ। তা কিছুটা কমে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে দাঁড়ায়। তবে গত অর্থবছরে মৎস্য উপখাতের অবদান কিছুটা বেড়ে ৩ দশমিক ৫২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে টাকার অঙ্কে মৎস্য উপখাত থেকে জিডিপিতে যুক্ত হয়েছে ৮২ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা, যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছিল ৭৪ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। এ খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ১০ শতাংশ।
বাংলাদেশে সামুদ্রিক মৎস্য উৎপাদন মূলত আহরণনির্ভর। উপকূলব্যাপী ৭১০ কিমি. দীর্ঘ তটরেখা থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত ১ দশমিক ৬৬ লাখ বর্গ কিমি. বিস্তৃত বিশাল সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের সামুদ্রিক জলসম্পদে ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি এবং ৪৭৫ প্রজাতির মাছ রয়েছে। বর্তমানে বঙ্গোপসাগর থেকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রল ফিশিং এবং আর্টিসেনাল মৎস্য আহরণের মাধ্যমে মোট ৪ দশমিক ৩৯ লাখ টন মৎস্য আহরণ করা হচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ মৎস্য সম্পদের মতো সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মৎস্যজীবীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক নৌযানে মৎস্য আহরণে নিয়োজিত প্রায় ২ দশমিক ৭০ লাখ মৎস্যজীবীর পরিবারের ন্যূনতম ১৩ দশমিক ৫০ লাখ মানুষের জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে উপকূলীয় সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের মাধ্যমে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে গণভবন লেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মাছের পোনা অবমুক্ত করে মৎস্যচাষকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার শুভ সূচনা করেছিলেন। ওই সময় বঙ্গবন্ধু ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন- ‘মাছ হবে এ দেশের দ্বিতীয় প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী সম্পদ।’ জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে মৎস্যবান্ধব বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণের ফলে বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন আজ সফল হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন দেশ আজ মাছে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ায় সাধারণ মানুষ স্বল্পমূল্যে মাছ ও পুষ্টি পাচ্ছে; অন্যদিকে দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্ব দূর হচ্ছে।
কৃষিবিদ মো. সামছুল আলম : গণযোগাযোগ কর্মকর্তা, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়
প্রবাস বাংলা ভয়েস/ঢাকা/ ২৮ আগস্ট ২০২১ /এমএম





