Menu

প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক ::‌  উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে জীবনে বড় কিছু হওয়ার স্বপ্নে যখন বিভোর হয়েছিলাম, ঠিক তখনই পাক আর্মি আমাদের পাবনা জেলায় গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছিল। একাত্তরের মার্চের শেষে পাক আর্মি আমাদের হাতে প্রথম দফায় মার খেয়ে দ্বিতীয় দফায় পাবনায় ঢুকতে নগরবাড়ি ঘাট থেকে পাবনা শহর পর্যন্ত রাস্তার দুপাশের বাড়িঘর পোড়াতে পোড়াতে শহরে প্রবেশ করে। অতঃপর শহরের প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা এবং ব্যবসায়ীসহ ১০-১২ জনকে ধরে নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করে।

১৯৭১ সালের মার্চ-এপ্রিলে আমার জেলা শহর পাবনাসহ সারা বাংলার এসব ঘটনায় সেদিন যেমন ওই বয়সে দেশের ভাগ্যাকাশে দুর্যোগ দেখে ভীত হয়ে পড়েছিলাম, অতঃপর জীবনে কী হবে না হবে ভেবে অস্থির হয়ে উঠেছিলাম। আজ আবারও এই বয়সে এসে জীবনে আর এক ধরনের অনিশ্চয়তা এবং অস্থিরতা অনুভব করছি। সে সময়ে পাক আর্মির মোকাবিলায় মে মাসের এক ভোররাতে পালিয়ে ভারতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং ক্যাম্পে উপস্থিত হয়েছিলাম এবং নয় মাস যুদ্ধের পর শত্রুমুক্ত স্বাধীন জীবনে ফিরেছিলাম। কিন্তু আজ এ মুহূর্তে করোনা নামক অদৃশ্য শত্রু মোকাবিলা করে পথ চলা সত্যিই খুব দুরূহ ব্যাপার হয়ে উঠেছে।

এই বয়সে এভাবে বন্দি জীবন আর মোটেই ভালো লাগছে না। মানুষের সারিবদ্ধ লাশ দেখে প্রতি মুহূর্তের খারাপ অনুভূতিগুলো আরও তীব্রতর হচ্ছে। সারা জীবন নিরলস পরিশ্রম করে গড়ে তোলা একটা জীবন করোনার কাছে এভাবে জিম্মি হয়ে পড়বে ভাবিনি। প্রতি বছর আয়-রোজগারের হিসাব করে সরকারি কোষাগারে আয়কর জমা দিয়ে নিশ্চিত মনে একবার বিদেশে আত্মীয়-স্বজনের কাছে যাওয়া অভ্যাসে পরিণত হলেও আজ দুবছর বিদেশ যাওয়া তো দূরের কথা, দেশের মাটিতেও ঘরের বাইরে পা রাখতে পারছি না।

এ অবস্থায় মনে হচ্ছে, এভাবে বেঁচে থাকা যেন অর্থহীন। মাঝে-মধ্যে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে সাধ্যমতো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই, কিন্তু সেখানে গিয়েও যখন দেখি, প্রয়োজনের তুলনায় আমার সে সাহায্য-সহযোগিতা অত্যন্ত কম তখন মনটা খারাপ হয়ে যায়। কারণ দশ-বিশ বস্তা চাল এনে লোকজন দিয়ে বিতরণ করিয়ে দুই ঘণ্টায় তা শেষ হয়ে গেলে সারা দিন ধরেই বাড়ির ফটকে অসহায় মানুষের ভিড় লেগে থাকে। আর আমার সীমাবদ্ধতার কারণে সে সময়ে আমি খুব ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ি।

এভাবে গত বছরও কিছু নগদ অর্থ এবং চাল বিতরণ শেষে আরও লোকজনের ভিড় দেখে তথ্য তালাশের পর জানতে পারলাম, সে সময় পর্যন্ত ওইসব লোক সরকারি দান-অনুদান কিছুই পাননি! অতঃপর আমার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টায় আরও এক দফায় তা করতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে অবশেষে জেলা প্রশাসক সাহেবকে বিষয়টি জানালে বিকাল বেলায় তিনি একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে দিয়ে পিকআপ ভ্যানে কিছু ত্রাণসামগ্রী আমার কাছে পাঠালে আমি সেগুলোও দ্রুত বিলি-বণ্টন করে ঢাকায় চলে আসি। তারপর যতবার গিয়েছি, ততবারই দরিদ্র অসহায় মানুষের সাহায্যার্থে কিছু করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু মনে স্বস্তি পেয়েছি এমনটি নয়। কারণ শত শত অসহায় নিরন্ন মানুষের অভাব পূরণ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

আমার আজকের লেখায় এসব বলার উদ্দেশ্য হলো, দেশের খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষসহ কর্মহীন অসহায় বেকার মানুষের দুর্দশার আসল চিত্রটি সরকার ও দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরা। সরকারি চেষ্টা অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও দেশের দরিদ্র দুস্থ মানুষের বর্তমান চিত্রটি যে কতটা করুণ সে বিষয়টি তুলে ধরতেই উপরের ঘটনা উল্লেখ করেছি। আর সেই সঙ্গে দেশের সামর্থ্যবান তথা ধনী সম্প্রদায়কেও চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে চেয়েছি যে, বর্তমান অবস্থায় দরিদ্র মানুষের দুঃখ-দুর্দশাতেও তারা কতটা নির্বিকার। কারণ অনেক ধনী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকেই দেখতে পাচ্ছি তারা সরকারের ওপর সব দায়িত্ব চাপিয়ে চুপ করে বসে আছেন।

আমাদের দেশে ভারতের আজিম প্রেমজির মতো ধনাঢ্য ব্যক্তি না থাকলেও তার কাছাকাছি অনেকেই আছেন। তাছাড়া দেশে দিন দিন কোটিপতি মানুষের সংখ্যা বেড়ে চললেও এবং প্রতিটি জেলাতেই শত কোটি টাকার মালিক এমন ব্যক্তিরও অভাব না থাকা সত্ত্বেও এই দুঃসময়ে দেশের আর্তপীড়িত দরিদ্র মানুষের সাহায্যে তাদের কতজন এগিয়ে এসেছেন, সে পরিসংখ্যান আমাদের সবারই জানা আছে।

আর বিরোধী দলসহ কিছু সংগঠন এবং ব্যক্তিকে তো এসব নিয়ে সরকারের সমালোচনা করে মাঠ গরম করার কাজেই ব্যস্ত থাকতে দেখা গেল! যদিও আমার জানামতে, হাতেগোনা দু-চারজন বিরোধীদলীয় নেতাকে বর্তমান অবস্থায় মানুষের মধ্যে কিছু সাহায্য সামগ্রী বিতরণ করতে দেখেছি বা শুনেছি। এসব নেতা রাজনীতি করে যা কামিয়েছেন বা ব্যাংক ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা সরিয়ে টাকার পাহাড় গড়েছেন, তার অতি ক্ষুদ্র অংশ নিয়েও যদি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতেন তাহলেও কথা ছিল। সরকারদলীয় সব নেতা-এমপিও যে এক্ষেত্রে তাদের সাধ্যমতো এগিয়ে এসেছেন, তেমনটিও নয়।

একেকজন তিন-চারবার এমপি হয়ে যা কামিয়েছেন এবং তাদের একশ্রেণির আয়-রোজগার, অর্থবিত্ত সম্পর্কে যা শোনা যায় বা বিভিন্ন মিডিয়া এবং সামাজিক মাধ্যমে যে পরিসংখ্যান প্রচারিত হয়, তার ছিটেফোঁটাও তারা দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে দিয়েছেন কিনা সন্দেহ। বরং তাদের অনেকের বিরুদ্ধে সরকারি সাহায্যের মালসামান নিয়ে কামড়াকামড়ি করারও অভিযোগ আছে। আর এ ক্ষেত্রে এক শ্রেণির ধনী ব্যবসায়ীর কথাই বা কী বলব!

রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়, মানব সম্পদ রপ্তানি ইত্যাদি নানা কিসিমের ব্যবসা-বাণিজ্য করে এদেশে একশ্রেণির মানুষ যারা আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন, অতি অল্প দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া এ মুহূর্তে তাদের কাউকে আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে আসতে দেখা গেল না। অথচ এসব মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব যে একমাত্র সরকারের, সে কথাটিও কিন্তু সম্পূর্ণ সঠিক নয়। কারণ সরকারের একার পক্ষে এত বিরাট জনগোষ্ঠীকে মাসের পর মাস সাহায্য-সহযোগিতা করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে অবশ্যই সরকারি-বেসরকারি সামাজিক অঙ্গীকার প্রয়োজন।

এত বেশি অসচ্ছল ও দরিদ্র মানুষের দায়ভার আমাদের মতো দেশের সরকারের পক্ষে বহন করা কতটুকু বাস্তবসম্মত সে বিষয়টিও ভেবে দেখা দরকার। আর সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই দেশের অবস্থাপন্ন বা ধনী সম্প্রদায়কে আজকের দিনে আরও বেশি করে সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রমাণ দেওয়া উচিত ছিল। বিশ্ব মানবসমাজের আজকের এ দুঃসময়ে ভারতের আজিম প্রেমজি যদি তার সম্পদের বেশিরভাগ অর্থই তার দেশের দুস্থ অসহায় মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দিতে পারেন, তখন আমাদের দেশের বড় বড় ব্যবসায়ীই বা বসে থাকবেন কেন? নিজেরা সম্পদের পাহাড়ের ওপর বসে থেকে শুধু সরকারের ওপর ভরসা করে আবার কেউবা সরকারের ওপর রাগ করে বতর্মান মুহূর্তেও তারা যদি মানবতার সেবায় এগিয়ে না আসেন, তাহলে ভবিষ্যতে তাদের সে সম্পদ কোন কাজে আসবে সে কথাটিও ভাববার বিষয়। কারণ এমনও হতে পারে, নিজেদের ভোগ বিলাসের জন্য আগলে রাখা ওইসব সম্পদ তাদের কাজে আসছে না।

আজকের লেখাটি আমি এক ধরনের বিষণ্নচিত্ত নিয়ে লিখতে বসেছি বলেই আমার মুখ ফসকে এসব কথা বের হচ্ছে। করোনা মহামারির কারণে ইতোমধ্যে আমি আমার কিছু কাছের মানুষকে হারিয়েছি, যে কারণে বতর্মানে আমার যাপিত জীবন অত্যন্ত বেদনার্ত। স্কুল জীবনে একসঙ্গে একই ক্লাসে পড়েছি এমন ৫ জন বন্ধুকে করোনা কেড়ে নিয়েছে। আমার ৪০ জন সহপাঠীর ৫ জনই করোনার শিকার। যাদের দুজনই আবার ডাক্তার।

ছোটবেলা থেকেই চশমাধারী চোখের ডাক্তার মাসুদকে আর কোনোদিন কানা ডাক্তার বলে ডাকতে পারব না, ডায়াবেটিস রোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সাইফুলকে ফোন করে আর বলতে পারব না, দোস্ত, ওষুধটা একটু বদলে দিবি? শ্রমিক লীগের সভাপতি বন্ধু ফজলুল হক মন্টুকে আর কোনোদিন কোনো লোকের উপকারের জন্য সুপারিশ করতে পারব না! কারণ আমার সহপাঠী এসব বন্ধু করোনার কাছে হার মেনে এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছেন।

সর্বোপরি যে বন্ধুটিকে বলে প্রায় প্রতি বছরই দু-একজন শিক্ষিত বেকার যুবককে তার প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে ঢুকাতাম, যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামকেও করোনা কেড়ে নিল। ১৩ জুলাই তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীও পালিত হলো। করোনার কাছে হার মানা এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ব্যক্তিটির কথা মনে উঠলে আমার প্রাণ কেঁদে ওঠে। যারা তার কাছাকাছি ছিলেন না, তারা ভাবতেও পারবেন না তিনি কতটা মেধাবী শিল্পপতি ছিলেন। তার হাতের ছোঁয়া দিয়ে লোহাকেও তিনি সোনায় রূপান্তরিত করেছেন।

একের পর এক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তিনি অনন্য অবদান রেখেছেন। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, অন্য অনেকের মতো তিনি বিদেশে কোনো সম্পদ গড়ে তোলেননি, অর্থাৎ বিদেশে সম্পদ পাচার করেননি। এমনকি এতবড় একজন শিল্পপতি হওয়া সত্ত্বেও ঋণখেলাপিদের তালিকায় কোনোদিন তার নাম ওঠেনি! আমার দু-একজন শিল্পপতি বন্ধু, যারা আমাকে সঙ্গে করে বাবুল ভাইয়ের কাছে যেতেন, তাদেরকেও বাবুল ভাইয়ের কাছ থেকে জ্ঞান-বুদ্ধি গ্রহণ করতে দেখেছি। কিন্তু করোনায় আক্রান্ত হয়ে তিনিও এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।

মানুষ মরণশীল। একদিন আমাদের সবাইকে এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে পরপারে চলে যেতে হবে। কিন্তু করোনার কাছে মানুষকে আর কতদিন আত্মসমর্পণ করতে হবে একমাত্র মহান আল্লাহই তা বলতে পারেন, যদিও সারা বিশ্বের চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। এ অবস্থায় আমরা সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্র থেকে সে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলে করোনা থেকে হয়তো একদিন মুক্ত হব, কিন্তু যাদের হারিয়েছি তাদের আর ফেরত পাব না। করোনার সঙ্গে আরও কিছুদিন যুদ্ধ করেই আমাদের বাঁচতে হবে। তবে সে যুদ্ধ কোনো দেশ, সরকার, জাতি, সমাজ বা ব্যক্তির একার যুদ্ধ নয়, সে কথাটি মনে রেখে সামনের দিনগুলোতে পথ চলতে হবে। আসুন, আমরা একটা নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখি, আসুন নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখি, আসুন আমরা একে অপরের তরে বাঁচি।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

প্রবাস বাংলা ভয়েস/ঢাকা/ ১৮  জুলাই ২০২১ /এমএম