Menu

প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক ::‌ চীনের উহান থেকে বিষবাষ্পের মতো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের ঢেউ বাংলাদেশে আছড়ে পড়ে গত বছরের মার্চের ৮ তারিখে। আর বাংলাদেশে করোনার প্রথম আঘাতটিই সইতে হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে।প্রথম ধাক্কায়ই বন্ধ ঘোষণা করতে হয় প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে সব বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসাগুলো। শিক্ষাখাত ছাড়া বাকি সব খাত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বহু আগেই সচল হলেও ২০২০ সালের মার্চের ১৭ তারিখে বন্ধ হওয়া শিক্ষাক্রম ১৪ মাস পরে এসে আজও অচল-ই রয়ে গেছে!

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে দফায় দফায় বৃদ্ধি করা হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের দিন-তারিখ। শিক্ষা কার্যক্রমের দমটা চেপে ধরছে যেন এক অদৃশ্য শক্তি! বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন দীর্ঘ ৯ মাস পাকিস্তানি হানাদারদের তাণ্ডবে শিক্ষা কার্যক্রম পুরোপুরি অবরুদ্ধ ছিল। এরপর গত ৫০ বছরে এমন পরিস্থিতি আর আসেনি। এবার করোনার আঘাতে লণ্ডভণ্ড হলো শিক্ষা কার্যক্রম। প্রশ্ন হলো, এ অচলায়তনের অবসান হবে কবে?

এমনিতেই পুরো একটি শিক্ষাবর্ষ নষ্ট হয়ে গেছে। সরকার বারবার প্রতিষ্ঠান খোলার দিন-তারিখ নির্ধারণ করছে, তবুও খুলছে না শিক্ষার দুয়ার। এখনকার মতো আরও ২ বছর যদি করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হয়, তবে কি করোনার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও ততদিন বন্ধ থাকবে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময় এসেছে।

করোনাপূর্ব পৃথিবী আর কখনো ফিরে পাব না আমরা। বিশ্ব এখন ‘নিউ নরমাল’ জীবনে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। আমাদেরও ‘নিউ নরমাল’ জীবনের পথ খুঁজতে হবে। সব ক্ষতিই হয়তো কোনো না কোনোভাবে পূরণ করা যাবে; কিন্তু করোনা শিক্ষায় যে প্রভাব ফেলেছে, তা সত্যিই অপূরণীয়। এতকিছুর মধ্যেও মানুষের চলছে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই। বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া চলছে জোরেশোরেই। এ লড়াইয়ের অংশ হিসাবেই শিক্ষার বন্ধ দুয়ার কীভাবে উন্মুক্ত করা যায়, সেই পথ আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।

বিশ্বের অনেক দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হল খুলে দেওয়ায় আমাদের দেশেও শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার দাবি করছে শিক্ষার্থীরা। ৩ মার্চ ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশের মতো এত দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে মাত্র ১৩টি দেশে।

এই দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া থেকে আছে শুধু বাংলাদেশ। এসব দেশে এ দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে ১৬৮ মিলিয়ন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে বাংলাদেশেরই রয়েছে প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্র্থী।

সরকার অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার পদক্ষেপ নিলেও নানা প্রতিবন্ধকতার দরুন আশানুরূপ ফলাফল মেলেনি। আর অনলাইনে শিক্ষা হলো আপৎকালীন একটি ব্যবস্থা। এটা দিয়ে দীর্ঘ সময় শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার আশা করাটা সমীচীন নয়, সম্ভবও নয়। তাই ক্লাসেই প্রাণ ফেরানো জরুরি। সম্প্রতি (১০ মে ২০২১) প্রকাশিত পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) যৌথ গবেষণা জরিপে দেখা যায়, করোনার বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের ৯৭ শতাংশ অভিভাবক তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে চান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় প্রাথমিকের ১৯ শতাংশ এবং মাধ্যমিকের ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী শিখতে না পারার ঝুঁকিতে রয়েছে। পুনরুদ্ধার কর্মসূচি হাতে নিয়ে শিক্ষার্থীদের না শেখালে তারা ঝরে পড়বে।

আইএলও বলছে, মহামারিতে মানুষ তিনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একদিকে বেকারত্ব, সেইসঙ্গে তাদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণও ব্যাহত হচ্ছে। এতে চাকরিতে প্রবেশ ও দক্ষতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটছে।

শিশু ও তরুণদের অংশগ্রহণে ‘চিলড্রেন ভয়েসেস ইন দ্য টাইম অব কোভিড-১৯’ শিরোনামে এই জরিপে দেখা যায়, শিশুরা এই পরিস্থিতে মানসিক বেদনা ও শঙ্কার মধ্যে রয়েছে। মহামারির সময়ে শিশু ও তরুণদের জীবনে ছন্দপতনের জন্য সুস্পষ্ট তিনটি সমস্যা বেড়ে গেছে। সমস্যাগুলো হলো-

১. শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া

২. সামাজিক দূরত্বের কারণে মানসিক অবসাদ

৩. পরিবারে দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়া

একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া, শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে এবং শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন দেশের বিশিষ্টজনরা। তাদের আশঙ্কা, করোনার ফলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা দুই কারণে আর স্কুলে নাও ফিরতে পারে। প্রথমটি- দীর্ঘ শিখন বিরতির কারণে একটি অংশ পাঠ না পারা। দ্বিতীয়টি- সম্ভাব্য দারিদ্র্যের কষাঘাতে বাবা-মায়ের সঙ্গে কাজে ভিড়ে যেতে পারে। আর ঝরে পড়া এসব শিক্ষার্থীর মধ্যে মেয়ে শিশুদের বিয়ে হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে মাধ্যমিকে ঝরে পড়াদের ক্ষেত্রে এটা বেশি ঘটতে পারে।

শুধু এসব পরিসংখ্যানই শেষ নয়। দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ফলে কিশোর শিক্ষার্থীদের মধ্যে অলস দীর্ঘ সময় কাটানোর নেতিবাচক নানা কুপ্রভাব দৃশ্যমান হচ্ছে। বইয়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন সম্পর্কহীন এসব কিশোর ভয়াবহভাবে মোবাইল গেমে আসক্ত হয়ে পড়ছে। স্মার্টফোনের সহায়তায় নতুন প্রজন্ম আজ আসক্ত হয়ে পড়েছে অনলাইন গেম নামক এক করুণ নেশায়। ঘরে-বাইরে, রাস্তাঘাটে পড়াশোনায় ফাঁকি দিয়ে শুধু গেম খেলছে। ফ্রি-ফায়ার, পাবজির মতো গেমে আসক্ত কিশোরেরা এসব গেম খেলার জন্য পিতামাতার কাছে ‘এমবি’ কিনতে টাকা চেয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। সম্প্রতি চাঁদপুরে এক কিশোর শিক্ষার্থী ‘এমবি’র টাকা না পেয়ে আত্মহত্যাই করে ফেলছে!

দীর্ঘদিন ধরে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় সেশনজট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। করোনাকালে এমনিতেই চাকরির বিজ্ঞপ্তি একদম কমে গেছে। অপরদিকে সময়মতো হচ্ছে না নিয়োগ পরীক্ষা। লাখো বেকারের চাকরিতে প্রবেশের বয়স ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। অনেকের চাকরির বয়স শেষ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। এভাবেই বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। ফলে স্বাভাবিকভাবে চাকরিতে যোগদানের বয়স বাড়ার দীর্ঘদিনের দাবি করোনাকালে আরও জোরালো হয়েছে। বিসিএস পরীক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে বয়সে সাময়িক ছাড় দিয়ে নিয়োগ পরীক্ষায় আবেদন করার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে ঠিক, কিন্তু তাতেও বেকারের হতাশা কমবে বলে মনে হয় না।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে অফিস-আদালত, কল-কারখানা সবকিছু পূর্বের ন্যায় সচল থাকলেও বন্ধ রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সরকারের কাছে অনুরোধ- প্লিজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বন্ধ দুয়ার এবার খুলে দিন। শিক্ষার্থী-অভিভাবক ও বেকারদের বাঁচার সুযোগ করে দিন।

শিক্ষার্থী, স্নাতকোত্তর শ্রেণি, নরসিংদী সরকারি কলেজ

প্রবাস বাংলা ভয়েস/ঢাকা/ ০৩ জুন ২০২১ /এমএম