Menu

প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক :: ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে ২০২০ সাল গত হতে আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের মানুষের জীবনে এ বছরটি অন্য সব বছরের থেকে আলাদা হয়েই থাকবে। কারণ প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস তছনছ করে দিয়েছে আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে।

বছরের শেষ দিকে এসে জীবনযাত্রা কিছুটা স্বাভাবিক হলেও, এ বছর দেশ হারিয়েছে অনেক গুণীজনকে। করোনার শুরুর দিকে আক্রান্ত অনেক মানুষ চিকিৎসার জন্য হাহাকার করে মারা গেছেন। এমনকি মারা যাওয়ার পরও অনেকের স্বজনরা ছুঁয়ে দেখতে পারেননি প্রিয়জনটিকে।

বুধবার পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৭ হাজার ১৫৬ জন আর আক্রান্ত হয়েছেন ৪ লাখ ৯৫ হাজার ৮৪১ জন। এদের মধ্যে সুস্থ হয়েছে ৪ লাখ ২৯ হাজার ৩৫১ জন। এ ছাড়া করোনা লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে দেশের অর্থনীতি, শিক্ষাব্যবস্থাসহ সবকিছুকে। দীর্ঘদিন লকডাউনের ফলে লাখ লাখ মানুষ সহায়-সম্বল হারিয়ে পথে বসেছেন। সব মিলিয়ে করোনা মানুষকে দাঁড় করিয়েছে কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি।

এদিকে এই করোনা ভাইরাস মহামারীর কারণে দেশবাসী অনেক নতুন নতুন শব্দের সঙ্গেও পরিচিত হয়েছে। যার মধ্যে ২০২০ সালে বছরের সেরা শব্দ হিসেবে ডিকশনারি ডটকম বেছে নিয়েছে ‘প্যানডেমিক’ বা মহামারীকে। ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার শুরু থেকে ঘন ঘন এই ‘প্যানডেমিক’ শব্দের ব্যবহারের কারণেই এটিকে বছরের সেরা শব্দের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। ২০২০ সালের আগে ‘প্যানডেমিক’ শব্দটি কেবল ইতিহাস বইয়ের জন্যই ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এখন তা সর্বাধিক প্রচলিত ও ব্যবহৃত শব্দ হয়ে গেছে এবং সবচেয়ে বেশি খোঁজাও হয়েছে এই শব্দটিকে।

২০২০ সালে প্যানডেমিক ছাড়াও সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দগুলো হলো- করোনা ভাইরাস, কোভিড-১৯ এবং ভ্যাকসিন। ডিকশনারি ডটকমে সর্বাধিক খোঁজা শব্দগুলো হলো- কোয়ারেন্টাইন, লকডাউন, পিপিই, সোশ্যাল ডিসটেন্সিং, অ্যাসিমেটামেটিক, ফারলোগ, ফ্রন্টলাইন, করোনা ভাইরাস, হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন, নন অ্যাসেনশিয়াল ইত্যাদি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৮ মার্চ প্রথম তিনজন করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে বলে জানায় রোগতত্ত¡, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। প্রথম রোগী শনাক্তের ১০ দিন পর ১৮ মার্চ দেশে প্রথম মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। শুরুর দিকে করোনার সংক্রমণ কমের দিকে থাকলেও মে মাসের মাঝামাঝি থেকে করোনা পরিস্থিতি খারাপের দিকে যেতে থাকে।

ওই মাসের শেষ সপ্তাহ থেকেই রোগী শনাক্তের হার চলে যায় ২০ শতাংশের ওপরে। চলতে থাকে আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত। তবে তার পর থেকে শনাক্তের হার কমতে থাকে। প্রায় এক মাসের বেশি সময় থেকেই শনাক্তের হার ১০ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যে ছিল। তবে গত ২ নভেম্বর থেকে ফের বাড়তে শুরু করে করোনার সংক্রমণ। এখন পর্যন্ত সংক্রমণের এ ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত অবস্থায় রয়েছে।

করোনার সংক্রমণ রুখতে প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ার ১৮ দিন পর অর্থাৎ ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি (অঘোষিতভাবে লকডাউন) ঘোষণা করে সরকার। বন্ধ থাকে সরকারি অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যান চলাচল, হোটেল-রেস্তোরাঁ, হাট-বাজার, আমদানি-রফতানি, পর্যটন স্পটসহ সবকিছু। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অফিস বন্ধ রেখে বাসা থেকে কর্মীদের কাজ করার সুযোগ করে দেয়।

শুরু হয় মানুষের এক দুর্বিষহ জীবন। করোনার ভয়ে প্রথম দিকে আতঙ্কে কেউ জরুরি কাজ ছাড়া বাসা থেকে বের হয়নি। এমনভাবে করোনার আতঙ্ক ছড়িয়েছিল যে, কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে শুনলে মানুষ ওই বাড়ির পাশ দিয়েও যেত না।

করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল ছাড়া অন্য হাসপাতালে জ্বর-সর্দি, কাশির রোগী গেলে কর্মরতরা ভয়ে দৌড় দিত। করোনার আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা গেলে ভয়ে লাশ দেখতেও আসত না কেউ। এরপর ধীরে ধীরে একসময় তা কিছুটা স্বাভাবিক হয়। তবে করোনা আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হলেও পিছু ছাড়ছে না অন্য রোগগুলো। নানা নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে এখনো ভুগছেন তারা।

করোনার ব্যাপক প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতিতেও। থমকে যায় অর্থনীতির চাকা। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকায় চাকরি হারায় লাখ লাখ শ্রমিক। দীর্ঘদিন বেকার থাকার কারণে জমানো শেষ সঞ্চয়টুকুও খরচ করে পথে বসে বহু মানুষ। অনেকে বাসা ভাড়া দেয়ার সক্ষমতা হারিয়ে আসবাবপত্র নিয়ে চলে যান গ্রামের বাড়িতে।

করোনার ব্যাপক প্রভাব পড়ে প্রবাসী শ্রমবাজারেও। করোনাকালে দেশে দেশে আরোপিত লকডাউন ও শাটডাউনের ফলে চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরেছেন দেড় লক্ষাধিক শ্রমিক। এ ছাড়া এই সময়ে নতুন করে কোনো শ্রমিক বিদেশে যেতে পারেননি। দেশে ছুটিতে এসে আটকে পড়াদের অনেকেই এখনো কর্মস্থলে ফিরে যেতে পারেননি।

অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল করতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার শর্তে ৩১ মে সীমিত পরিসরে খুলে দেয়া হয় অফিস-আদালত। এর পর একে শুরু হয় যান চলাচল, হাট-বাজার, দোকানপাট, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ সবকিছুই।

একে একে সবকিছু খুলে গেলেও এখনো বন্ধ রয়েছে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। করোনার কারণে এইচএসসি, জেএসসি ও পিএসসি সমমানের পরীক্ষাগুলো নেয়া সম্ভব না হওয়ায় সবাইকে দেয়া হয় অটোপাস। এ ছাড়া উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত সব শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের অটোপাস দিয়ে পরবর্তী ক্লাসে তোলা হয়।

বছরের শেষ দিকে এসে জীবন ও জীবিকার প্রশ্নে ঘর থেকে বের হতে শুরু করে মানুষ। একপর্যায়ে জীবনযাত্রা অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে যায়। মানুষ ভুলতে বসে স্বাস্থ্যবিধিকে। স্বাস্থ্যবিধি না মানায় এখনো করোনার সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী। তবে সরকার সর্বসাধারণকে ঘরের বাইরে মাস্ক পরে চলতে এবং স্বাস্থ্যবিধি মানাতে এখনো অনেকটা কঠোরভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে। মাস্ক না পরে বাইরে বের হলে জেল-জরিমানা করছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ (বর্তমানে করোনা আক্রান্ত) বলেন, এখনো কিন্তু করোনার সংক্রমণ কমেনি। প্রতিনিয়ত সংক্রমণ বাড়ছে। সামনে শীত, তাই করোনার সংক্রমণ বাড়তে পারে। অথচ সর্বত্র গা-ছাড়া ভাব। দেশের মানুষ কোনোক্রমেই স্বাস্থ্যবিধি মানছে না, মাস্ক পরে না।

হাত ধোয়ার চর্চা কারো নেই, শারীরিক দূরত্ব মানছে না, মানুষের মধ্যে ভীতি-আতঙ্ক কেটে গেছে। রাস্তাঘাটে চললে তো মনেই হয় না যে দেশে করোনা আছে। কাঁধের ওপর কাঁধ দিয়ে সবাই চলাফেরা করছে। এমনকি হাসপাতালগুলোর বহির্বিভাগেও একই অবস্থা। মাস্ক পরলে শতকরা ৮০ ভাগ করোনা নিরাপদ থাকা যায়। এ জন্যই ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’ সঠিক বাস্তবায়ন করতে হবে। মানুষকে সচেতন হতে হবে। মানুষ সচেতন না হলে করোনার সংক্রমণের গতি থামানো যাবে না।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, করোনা সংক্রমণকে এখন আর মানুষ সংকট হিসেবে দেখছে না। মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে। অনেক কাজকর্ম হচ্ছে। ফলে ধীরে ধীরে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু সেটা এমন নয় যে, সবকিছু আগের মতো হয়ে গেছে বা যাচ্ছে।

এপ্রিল, মে, জুন মাসে যে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছিল, সেটা কেটে যাচ্ছে। কিন্তু অর্থনীতি করোনার আগের অবস্থায় আসতে আরো সময় লাগবে। কারণ মানুষ ঘর থেকে বের হলেও রোজগার আগের অবস্থায় নেই। তবে অর্থনীতির যে পতন হচ্ছিল অর্থাৎ বেকারত্ব, দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়া- সেটা হয়তো আর বাড়বে না।

প্রবাস বাংলা ভয়েস/ঢাকা/ ১৮ ডিসেম্বর ২০২০/এমএম

 


Array