প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক :: বাড়ছে শীতবাহী রোগের প্রকোপ। জ্বর-সর্দি, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া রোগে আক্রান্ত বেশি শিশুরা। শিশুদের পাশাপাশি বয়োবৃদ্ধরাও নানা জটিল সমস্যা নিয়ে ভর্তি হচ্ছেন ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন হাসপাতালে। রাজধানীর বাইরের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় এ অবস্থা আরো ভয়াবহ বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে।
রবিবার সকাল ১১টা। রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত ঢাকা শিশু হাসপাতালের বহির্বিভাগে দুই বছরের মেয়ে অনন্যাকে নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন মা পারভিন বেগম। রাজধানীর মিরপুর থেকে এসেছেন তিনি। অন্যরা পুরো শরীর গরম কাপড় দিয়ে জড়ানো। একটু পর পর মেয়ের নাক মুছে দিচ্ছেন মা পারভিন বেগম।
তিনি জানালেন, চার দিন হলো মেয়ের জ্বর-সর্দি। মিরপুরের একজন ডাক্তারকে দেখিয়ে ইতোমধ্যে মেয়েকে ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। তাই তাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন। পারভিন বেগমের মতো ৩ বছরের ছেলেকে নিয়ে আগারগাঁও থেকে এসেছেন রুজিনা আক্তার।
রুজিনা আক্তার জানান, গত দুইদিন থেকে তার ছেলের ডায়রিয়া। স্থানীয় ফার্মেসি থেকে স্যালাইনসহ ওষুধ খাওয়ানোর পর কাজ না হওয়ায় চিকিৎসক দেখাতে নিয়ে এসেছেন তিনি। চিকিৎসক বলছেন হাসপাতালে ভর্তি করানোর জন্য। পারভিন, রুজিনার মতো অনেক অভিবাবক শিশুর ঠাণ্ডাজনিত সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভিড় করছেন।
সকালে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, রোগীর ভিড়ে হাসপাতালের বহির্বিভাগে পা ফেলার জায়গা মিলছে না। সিরিয়াল অনুযায়ী চিকিৎসকরা ব্যবস্থাপত্র (প্রেসক্রিপশন) দিচ্ছেন। আবার যে সব শিশুর অবস্থা জটিল তাদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার জন্য বলছেন।
হাসাপাতাল সংশ্লিষ্টরা জানান, অন্য সময় প্রতিদিন রোগী আসত ১ থেকে ১৫০। গত দুই সপ্তাহে সেই সংখ্যা বেড়ে ৪ থেকে ৫০০-তে দাঁড়াচ্ছে। ৬৬৪টি শয্যার মধ্যে ৫৫০-এর বেশি শয্যায় রোগী ভর্তি আছে। নিউমোনিয়া, অ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়াসহ শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। গত ২১ নভেম্বর থেকে গতকাল রবিবার পর্যন্ত ১৫ দিনে হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে ৭ হাজার ৭২৬ জন এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ১ হাজার ৬৬৪ জন শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। তাদের মধ্যে বড় অংশই ঠাণ্ডাজনিত বিভিন্ন অসুখ যেমন- জ্বর, ঠাণ্ডা, কাশি, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি নিয়ে বেশি রোগী আসছে। তবে ইনডোরে যারা ভর্তি হচ্ছে তাদের মধ্যে ডেঙ্গু, নিউমোনিয়া ও করোনা রোগী রয়েছে।
হাসপাতালের উপপরিচালক প্রবীর কুমার সরকার বলেন, ‘১৫-২০ দিন ধরে আমাদের এখানে প্রতিদিনই ১০% করে বাড়ছে শিশু রোগীর সংখ্যা। তবে ঢাকায় এখনো পুরোপুরি শীত পড়েনি। শীত পড়লে রোগীর সংখ্যা আরো বাড়বে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার কথা বিবেচনা করে আমরা প্রয়োজনীয় সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, যেসব শিশুর মধ্যে করোনার উপসর্গ থাকে তাদের আমরা আইসোলেশনে রাখি। পরে করোনার টেস্ট করে রিপোর্ট হাতে পেয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেই।
একই চিত্র ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকার অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালেও। রাজধানীতে এখনো পুরোপুরি শীতের প্রকোপ শুরু না হলেও ইতোমধ্যে প্রতিটি হাসপাতালে শীতজনিত জ্বর, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আসতে শুরু করেছেন রোগীরা। শিশুদের পাশাপাশি বয়োবৃদ্ধরাও নানা জটিল সমস্যা নিয়ে আসতে শুরু করেছেন হাসপাতালে।
ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় এই অবস্থা আরো ভয়াবহ। যেসব জেলায় ইতোমধ্যে শীত পুরোপুরি ঝেঁকে বসেছে, সেসব জেলায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ঠাণ্ডাজনিত রোগের প্রকোপ। দেশে করোনার মহামারী থাকায় এসব রোগ নিয়ে রয়েছে রাড়তি উদ্বেগ। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি পেতে থাকলে ঠাণ্ডাজনিত রোগও বাড়বে। শীত থেকে বাঁচতে প্রয়োজনীয় শীতের কাপড় ব্যবহারের পরামর্শ দেন তারা।
এ প্রসঙ্গে দেশের প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, আবহাওয়া পবির্তনের কারণে শীত আসতে শুরু করেছে। আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে এমনিতেই মানুষের রোগব্যাধি হয়। সর্দি, কাশি, গলা ব্যথা, টনসিল, অ্যাজমা থাকলে এগুলো বাড়ে। তাছাড়া ঠাণ্ডা লাগলে নিউমোনিয়া হতে পারে। এছাড়া ভাইরাসজনিত রোগগুলোও বাড়তে পারে। এখন যেহেতু করোনার ভয় রয়ে গেছে। করোনার ঝুঁকিও একটু বাড়তে পারে। মানুষ স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণেই করোনা বাড়ছে।
তিনি বলেন, শীতকালে এমনিতেই রোগবালাই বাড়ে। শীতকালে মানুষের গণযোগাযোগ বেড়ে যায়। যেমন- সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়ে, বিয়ের অনুষ্ঠান বেড়ে যায়, মেলা বসে, নানা সেমিনার হয়। এতে শীতের একটা ঝুঁকি বেড়ে যায়। সুতরাং এগুলো থেকে সতর্ক থাকতে হবে।
ঢাকা সিভিল সার্জন ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান বলেন, শীতবাহী রোগবালাই বাড়ার কারণে আমরা প্রতিটি হাসপাতালে ফ্লু কর্নার চালু করেছি। সব ফ্লু কর্নারে আলাদ আলাদা বুথ চালু করা হয়েছে। শিশু রোগীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিকিৎসা দিচ্ছি। বাইরে থেকে হিমেল বাতাস যাতে প্রবেশ না করে সেজন্য সব জানালা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
প্রবাস বাংলা ভয়েস/ঢাকা/ ০৭ ডিসেম্বর ২০২০/এমএম





