প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক :: স্বাস্থ্যহীন অবকাঠামোগত দিক থেকে একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ। তবে এরপরেও বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় এখন পর্যন্ত এ দেশে করোনায় মৃত্যুর হার খুবই কম।
পরিসংখ্যান অনুসারে, দক্ষিণ এশীয় এই দেশটিতে শনাক্ত হওয়া মোট করোনা রোগীর মধ্যে মোট মৃত্যুর হার এক দশমিক ৩ শতাংশ। তবে বিশ্বব্যাপী এই মৃত্যুর হার ৩ দশমিক ৪ শতাংশ।
জানা গেছে, ২০ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ৩ হাজার ৭৮১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া মোট আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ২ লাখ ৮৫ হাজার ৯১১ জনে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশে কোভিড- ১৯ এ কম মৃত্যুহারের পেছনের সঠিক কারণগুলো সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ডেমোগ্রাফিক বৈশিষ্ট্য, জনগণের শক্তিশালী ইমিউন সিস্টেম, প্রসারিত টিকাদান ব্যবস্থা এবং ভাইরাসের স্ট্রেনের প্রবণতা কম মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, করোনায় কম মৃত্যুর পেছনের সঠিক কারণগুলো আমরা জানিনা। কারণ এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণা করা হয়নি। তবে, আমি মনে করি এর পেছনে মূলত দুটি কারণ রয়েছে – ডেমোগ্রাফিক এবং ফিজিওলজিক।
তিনি আরো বলেন, কোভিড -১৯ এ মৃত্যুর হার শুধুমাত্র বাংলাদেশেই কম নয়। আফ্রিকার দেশগুলোসহ অন্যান্য আরো কিছু দেশে মৃত্যুহার খুব কম। কারণ তাদের বেশিরভাগ লোকসংখ্যা তরুণ।
অধ্যাপক নজরুল বলেন, অল্প বয়সীদের মধ্যে একটি শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে এবং তারা দ্রুত সুস্থ হওয়ার ক্ষমতা রাখে। আমাদের দেশে ৬০ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সের ১০ শতাংশেরও কম লোক রয়েছে। সুতরাং, আমরা বলতে পারি সুস্থতার ক্ষেত্রে বয়স একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। প্রধানত দরিদ্রদের মধ্যে আরো শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা রয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (আইইডিসিআর) ও ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার অব ডায়রিয়াল ডিজিজ রিসার্চ বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) এক যৌথ গবেষণায় বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, রাজধানীর ৯ শতাংশ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। এদের মধ্যে মাত্র ৬ শতাংশ বস্তিবাসী ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। এছাড়া তাদের মৃত্যুর হারও খুব কম।
অধ্যাপক নজরুল বলেন, যেহেতু এই দেশের মানুষ সাধারণত বিভিন্ন ভাইরাস এবং মৌসুমী ফ্লুতে আক্রান্ত হয়। ফলে তারা বিভিন্ন ভ্যাকসিন এবং ওষুধ গ্রহণ করে। এর ফলে তাদের কাছে কিছু প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে যা তাদের ভাইরাসকে পরাস্ত করতে সহায়তা করছে।
তিনি আরো বলেন, ইমিউনোলজিকাল, হরমোনজনিত এবং জিনগত কারণে দেশে নারীদের মধ্যে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার খুব কম। এটি দেখে মনে হয় যে পুরুষদের তুলনায় নারীদের শরীরে সংক্রমণ, রোগ এবং জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট মৃত্যুর মধ্যে ২৯১৮ জন অর্থাৎ ৭৮ দশমিক ৯৯ শতাংশ পুরুষ ও ৭৭৬ জন অর্থাৎ ২১ দশমিক ০১ শতাংশ নারী।
অধ্যাপক নজরুল বলেন, বাংলাদেশে করোনার অবস্থার তেমন লক্ষ্যনীয় কোনো উন্নতি হয়নি। কারণ প্রতিদিন প্রায় ৩০ জন লোক মারা যাচ্ছে। মৃত্যুর হার যদিও কম তবে এখনও অনেক লোক ভাইরাসের কারণে প্রাণহানির শিকার হচ্ছেন। তাই ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমাদের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আরো তীব্র করতে হবে।
এদিকে, বাংলাদেশের আরেক চিকিৎসক ডাঃ আবদুল্লাহ বলেছেন, বাংলাদেশে শিশুদের শরীরে বিভিন্ন রোগের জন্য প্রতিরোধক টিকা প্রয়োগ করা হয়। এতে তাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী হয়।
তিনি আরো বলেন, দেশের জনসংখ্যার বেশিরভাগ কমবয়সী লোকদের নিয়ে গঠিত। তিনি লক্ষ্য করেছেন, ৫০ শতাংশেরও বেশি কোভিড -১৯ এ আক্রান্তদের বয়স ২০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। ফলে তাদের মধ্যে মৃত্যুহার কম এবং সুস্থতার হার বেশি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক একেএম নুরুন নবী বলেছেন, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ (১২ দশমিক ৫ মিলিয়ন) প্রবীণ বা তাদের বয়স ৬৫ বছরের বেশি।
তিনি আরো বলেন, প্রবীণরা সাধারণত যে কোনো রোগে আক্রান্ত হন কারণ তারা তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে তারা বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী এবং কঠিন রোগে ভুগে থাকেন। সুতরাং, বৃদ্ধ বয়সী কোভিড -১৯ রোগীর মৃত্যুর হার সারা বিশ্বেই খুব বেশি। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপ এবং এমনকি প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় আমরা অনেক বেশি উন্নত অবস্থানে রয়েছি কারণ আমাদের মৃত্যুর হার তাদের তুলনায় অনেক কম।
প্রবাস বাংলা ভয়েস/ঢাকা/ ২১ আগস্ট ২০২০/এমএম





