বাংলানিউজসিএ ডেস্ক :: মো. আব্দুল হামিদ। পেশায় ব্যবসায়ী। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে পুরনো মালামাল কিনে তা বিক্রি করছে। ৩৫ বছর থেকেই মা-বাবা ও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকতেন রাজধানী টিকাটুলির কে এম দাস লেনে। বেশ সুখেই ছিলেন তিনি। কিন্তু সেই সুখ আর কপালে সইলো না।
মহামারী করোনায় তছনছ করে দিয়েছে সবকিছু। দীর্ঘদিন সাড়ে তিন মাস থেকে নেই এক টাকাও আয়। জমানো টাকাও শেষ হয়ে গেছে। আয় না থাকায় পরিবার নির্বাহের খরচ ও বাসাবাড়া দিতে না পারায় চলতি মাসের শুরুর দিকে পরিবার পাঠিয়ে দিয়েছেন বাড়িতে। ভাড়া বাসাও ছেড়ে দিয়ে উঠেছেন মেসে।
মো. আব্দুল হামিদের জীবিকার তাগিদে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া থেকে ঢাকায় আসেন এমআই ইসলাম। প্রথমে কাজ করতেন একটি কোম্পানিতে। সেখান থেকে চাকরি যাওয়ার পর পাঠাও চালাতেন। প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ১৫’শ টাকা রোজগার করতেন। তার পাঠানো টাকায় অসুস্থ মা-বাবার চিকিৎসাসহ পরিবারের খরচ চলত। কিন্তু দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখে দেয়ার পর বন্ধ করে দেয়া হয় অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং। এতে বিপাকে পড়েন তিনি।
খরচ তো আর থেমে থাকে না। নিজের সঞ্চয় করা দিয়ে প্রথম দুই মাস চলেছেন। পরে টাকা শেষ হওয়ায় বাড়ি চলে গেছেন। এম আই ইসলাম বলেন, আমার টাকায় চলতো পুরো পরিবার। করোনা এসেই সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দিল। তাই বাড়িতে চলে গেছি। সেখানে দিনমজুর হিসেবে কাজ করে পরিবারের খবচ বহন করি। যদি যদি পরিস্থিতি কোনোদিন ভালো হয়, হয়তো আবারো ফিরে আসব।একই অবস্থা আসিদ আলীর। রাজধানী মাটিবাহী ট্রাক চালাতেন তিনি। কিন্তু করোনার কারণে কাজ না থাকায় বন্ধ রয়েছে গাড়ি। তাই বিকল্প কোনো আয় না থাকায় বাড়িতে চলে গেছেন তিনি।
আব্দুল হামিদ, এমআই ইসলাম ও আসিদ আলীর মতো রাজধানীতে বাস করা হাজার হাজার মধ্যভিত্ত ও নিম্ন মধ্যভিত্ত মানুষের জীবনকে করে দিয়েছে এলোমেলা। করোনার কারনে চাকরি হারিয়ে চাকরি হারিয়েছেন অনেকে আবার যারা ফুটপাথে ব্যবসা কিংবা বাসা বাড়িতে কাজ করতে তাদেরও নেই কোনো কাজ।
দীর্ঘদিনের বেকারত্ব ও আয়-রোজগার বন্ধ থাকায় বাসাভাড়া দেয়ার সামর্থ্য হারিয়েছেন অনেকে। ফলে ভ্যাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে দেশে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ইট-পাথরের শহর ঢাকায় আসা লোকজন এবার দুর্ভাগ্য নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন বাড়িতে । প্রতিদিনই রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে দেখা যায়, মালপত্র ভর্তি বাহনে করে ঢাকা ছাড়ছে মানুষ। তাদের মধ্যে কেউ দিনমজুর, কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কেউ গার্মেন্টস শ্রমিক, ছাত্র-প্রাইভেট শিক্ষক ও বিভিন্ন পেশার মানুষ।
যারা এখনো আছেন তাদের চোখমুখে হাতাশার চাপ। রাজধানীর প্রান্থপথ সিগনাল এলাকায় ফুটপাথে চা বিক্রি করতেন মোজা মিয়া। কিন্তু করোনা কারণে বন্ধ রয়েছে তার চায়ের দোকান। বউ-বাচ্চা বাড়িতে পাঠালেও তিনি রয়েছেন এখনো ঢাকায়। তবে বদলে দিয়েছেন পেশা। চায়ের দোকান বাদ দিয়ে ফুটপাথে বিক্রি করছেন মৌসুমি ফল। মোজা মিয়া বলেন, বেঁচে থাকতে তো হবে। স্বজনদের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। চায়ের দোকানও বন্ধ। মৌসুমি ফল নিয়ে বসেছি। কিন্তু এতে লাভ খুবই কম। তা যা লাভ হচ্ছে তাতেই শুকরিয়া।
রাজধানীর ফার্মগেটে দুইটি ফ্লাট বাড়া নিয়ে মেস ব্যবসা করছেন খলিলুর রহমান। করোনার ছোবলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ফাঁকা হতে পুরো মেসটি। খলিলুর রহমান বলেন, করোনার শুরুতেই মেসগুলো ফাঁকা হয়ে গেছে। বাড়া দেয়ার লোক পাচ্ছি না। ফলে আমিও ফ্ল্যাটের মালিককে বাড়া দিতে পারছি না।
একই এলাকার এক বাড়ির ম্যানেজার তুহিন ইসলাম। তিনি জানান, তাদের বাসায় এক ভাড়াটিয়া ফার্মগেট এলাকায় নতুন কুঁড়ি নামের একটি কোচিং সেন্টার ছিল। কিন্তু করোনা ভাইরাস আসার পর থেকে ওই কোচিং বন্ধ রয়েছে। তাই গত মাসে তারা বাসা ছেড়ে দিয়েছে।
একদিকে জীবন ও জীবিকার সংকট দেখা দেয়ায় এবং অন্যদিকে যেমন সব ছেড়ে মানুষ গ্রামে ফিরতে বাধ্য হচ্ছে মানুষ আরেকদিকে রাজধানীর অনেক বাড়িতে দেখা দিয়েছে বাড়াটিয়া সংকট। বিপাকে পড়েছেন বাসা মালিকরাও। বাড়িতে বাড়িতে ঝুলছে বাসাভাড়া দেয়ার বিজ্ঞাপন ‘টু লেট’। এ ছাড়াও বেড়েছে সাবলেটের সংখ্যা।
প্রতিটি রাস্তার মোড়ে মোড়ে দেখা যাচ্ছে সবলেটের বিজ্ঞাপন। গ্রীন রোড এলাকায় সাবলেটের বিজ্ঞাপন থেকে নাম্বার নিয়ে যোগাযোগ করা হলে মামুনুর রশীদ নামের এক ব্যক্তি বলেন, অফিস থেকে বেতন বন্ধ ৩ মাস হলো। আগে বাসা নিয়ে থাকতাম এখন সম্ভব না হওয়াতে বাধ্য হয়ে সাবলেট থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
এছাড়াও ভাড়াটিয়া সংকটের কারণে কমেছে বাসাবাড়াও। তাই অনেকে পুরনো বাসা ছেড়ে কম টাকায় নিচ্ছেন নতুন বাসা। গ্রীন রোডে একটি বিল্ডিংয়ের ম্যানেজার রফিক মিয়া বলেন, করোনার সংকটে আমাদের বিল্ডিং থেকে ৪টি পরিবার বাসা ছেড়ে দিয়েছে। ফলে বাসাগুলো খালি রয়েছে। এক মাস আগে ‘টু লেট’ বিজ্ঞাপন দিয়ে মাত্র একটি পরিবার পেয়েছি। তাই তাদের আগের তুলনায় কম টাকায় বাড়া দিয়েছি।
বাংলানিউজসিএ/ঢাকা/ ২৩ জুন ২০২০ /এমএম





