Menu

বাংলানিউজসিএ ডেস্ক :: প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে গত ৪০ দিন ধরে দেশে সাধারণ ছুটি বিরাজ করছে। সংক্রমণ রোধে মানুষকে ঘরের বাইরে না যাওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল।বন্ধ ছিল গার্মেন্টস, মসজিদ, শপিং মল, দোকানপাট, হাটবাজারসহ গণপরিবহনও। তবে দেশে করোনার আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আশংকাজনকভাবে বাড়ার পরও স্বাস্থ্যবিধি ও সরকারি নির্দেশনা মানুষ মানছে না।নিষেধাজ্ঞার শুরু থেকেই মানুষ লকডাউন না মেনে নিত্যকাজে ব্যস্ত থাকছে। ফলে ৪০তম দিনে এসে রাজধানীতে মানুষের চলাচল যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে যানবাহনের আধিক্যও। শুধু সিএনজি অটোরিকশার বাইরে গণপরিবহন ছাড়া সব ধরনের গাড়ি সড়কে চলাচল করছে।

মানুষের এই অবাধ চলাচলের ফলে চিরচেনা ছন্দে ফিরছে রাজধানী। তবে বিশেষ করে পোশাক কারখানাগুলো খুলে দেয়ার ফলে ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলো থেকে বানের জলের মতো মানুষ রাস্তায় নামতে শুরু করায় করোনা-ঝুঁকি বেড়ে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে।গতকাল বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে ব্যক্তিগত যানবাহন, সিএনজি অটোরিকশা, রিকশা, ট্রাক, কভার্ডভ্যানের আধিক্যের কারণে দেখা গেছে যানজট। অপরদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-আরিচা, ঢাকা-ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানবাহনে মানুষের প্রবেশও বেড়েছে। ফলে ঢাকার প্রবেশপথগুলোতেও যানজট লক্ষ করা গেছে।

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, মানুষের এই অবাধ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার জন্যই কমিউনিটি ট্রান্সমিশনে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছেই। এই বেসামাল অবস্থায় মানুষ দিন দিন আরো বেশি পরিমাণে আক্রান্ত হবে। মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়বে। ইতোমধ্যে করোনা হাসপাতালগুলোতে রোগীদের ঠাঁই হচ্ছে না।এমতাবস্থায় প্রশাসনকে আরো কঠোর হতে হবে। নইলে ভয়াবহ পরিণাম জাতিকে বহন করতে হবে। সরেজমিনে রাজধানীর, যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান, ইসলামপুর, বিজয় সরণি, রামপুরা, বনানী, আব্দুল্লাহপুর ও গাবতলী এলাকায় সিগন্যালে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে বহু গাড়ি। ব্যক্তিগত গাড়ি ও সিএনজি অটোরিকশার চলাচলই বেশি বেড়েছে রাজধানীর সড়কে। বিভিন্ন এলাকার বাজারগুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভিড়ও দেখা গেছে। অনেককেই আবার হেঁটে কর্মস্থলে যেতে দেখা গেছে।

এদিকে গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারা দেশের দোকান শপিং মল খোলা রাখার ঘোষণা দেয়ার পরের দিন থেকেই রাজধানী স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। বেসরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করেছে। ফলে রাজধানীতে মানুষ ঘর থেকে বের হয়ে আসছে।এপ্রিলের শুরু থেকে ঢাকায় মানুষের প্রবেশ ও বের হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। তবে এ নিষেধাজ্ঞা শুরু থেকেই ভাঙতে দেখা গেছে। ছুটির মেয়াদ যত বেড়েছে, ততই বেড়েছে নিষেধাজ্ঞা অমান্যের প্রবণতা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোও শুরুর দিকের তুলনায় মানুষের অবাধ চলাচলে কিছুটা ছাড় দিচ্ছে। আজ থেকে খুলে দেয়া হচ্ছে মসজিদ-মন্দিরও।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গার্মেন্টস সেক্টর খুলে দেয়ার পর থেকেই ঢাকার প্রবেশমুখগুলোয় অবাধে যানবাহন ঢুকতে-বের হতে দেখা যাচ্ছে। গাড়ির পাশাপাশি হেঁটেও ঢাকায় ঢুকছেন কিংবা বের হচ্ছেন অনেকে। তবে গাড়ি প্রবেশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্থানে পুলিশের চেকপোস্টের মুখে পড়তে হচ্ছে। প্রবেশপথগুলোয়ও রয়েছে চেকপোস্ট। এই চেকপোস্টের কারণে প্রবেশমুখগুলোয় দিনের বেশির ভাগ সময় গাড়ির জটলা লেগে থাকছে।ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের মদনপুর এলাকায় দেখা যায়, মহাসড়কে অগণিত গাড়ি। দূরপাল্লার বাস ছাড়া সব ধরনের গাড়ি রয়েছে মহাসড়কে। হাইওয়ে পুলিশকে দায়িত্ব পালন করতে হিমশিম খেতে দেখা গেছে। ঢাকায় অসংখ্য গাড়ি প্রবেশ করছে। এ ছাড়া সিএনজির স্ট্যান্ডগুলোতে সিএনজি নিয়ে যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে চালককে। একই চিত্র দেখা গেছে গাবতলী ও আব্দুল্লাহপুর দিয়ে ঢাকার প্রবেশপথে।

গতকাল রাজধানীর সড়কে চোখে পড়ার মতো যানবাহন লক্ষ করা গেছে। রাজধানীর অনেক জায়গায়ই যানজট দেখা গেছে। এছাড়া গাড়ি সামাল দিতে ট্রাফিক পুলিশেরও ব্যস্ততা বেড়েছে। বিশেষ করে নগরীর আব্দুল্লাহপুর, গাবতলী ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় দেখা গেছে গাড়ির ব্যাপক চাপ।কার, মাইক্রোবাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও লেগুনায় চেপে চলাচল করছে মানুষ। সেই গাড়ির ভেতরে শারীরিক দূরত্ব মানার কোনো বালাই নেই। গাদাগাদি করে যাত্রী নিয়ে চলছে এসব যানবাহন। শুধু বাস ছাড়া সব গাড়ি চলছে সড়কে। প্রতিমুহূর্তে প্রবেশ করছে সারি সারি গাড়ি। সেই সঙ্গে ঢাকা থেকে বেরও হচ্ছে বহু গাড়ি।

এছাড়া মোটরসাইকেলে করে অনেক যাত্রী আসছে নগরে। সিএনজি অটোরিকশার স্ট্যান্ডগুলোও সচল রয়েছে। অটোরিকশার চালকরা যাত্রী নিয়ে নানা জায়গায় যাচ্ছেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুরে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, গাড়ির চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মানুষ শারীরিক দূরত্ব মানছে না। নানা অজুহাত দেখিয়ে গাদাগাদি করে পরিবহনে চলাচল করছে মানুষ।যাত্রাবাড়িতে সিএনজি অটোরিকশাচালক দিলু মিয়া বলেন, ‘অনেক দিন ধইরা বসা। কাজ নাই। তাই সংসার চালাইতে গাড়ি নিয়ে বাইর হইছি। তবে আগের চাইতে খ্যাপ অহন অনেক বেশি। কয় দিন আগেও খুব ভয় ছিল মানুষের মইধ্যে, এখন আর সেইটা নাই। পুরোদমে আমরা গাড়ি চালাইতাছি। কোনো বাধা নাই।’

প্রাইভেট কারচালক আসাদুল বলেন, ‘সকালে বনানী সিগন্যালে যানজটে বসে থাকতে হয়েছে ৫ থেকে ৭ মিনিট। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন সিগন্যালেও অপেক্ষা করতে হয়েছে গাড়ি নিয়ে।’গতকাল সকাল থেকেই সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে বের হন মতিন মিয়া। এর মধ্যে ফার্মগেট থেকে বিমানবন্দর ও বিমানবন্দর থেকে মহাখালী পর্যন্ত দুটি ট্রিপও দেন তিনি। তিনি জানিয়েছেন, মহাখালী ফ্লাইওভার থেকে নামার পর বিভিন্ন পয়েন্টে যানজট পেয়েছেন।

এর মধ্যে কাকলি সিগন্যালে তো টানা ৫-৭ মিনিট আটকে থাকতে হয়েছিল। দু-একটি বাদে ঢাকার প্রায় সব সিগন্যালেই একটু একটু করে যানজট ফিরতে শুরু করেছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, মনে হচ্ছে রাজধানী তার পুরনো রূপে ফিরতে শুরু করেছে। সাইফ নামের মাইক্রোবাসের এক যাত্রী বলেন, পরিবারের সদস্য অসুস্থ, তাই তিনি ঢাকায় এসেছেন।ঢাকায় যত মানুষের আনাগোনা বাড়ছে, ততটাই ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ স্কিল ডেভেলপমেন্ট ট্রেনিং অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার টেকনোলজির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. আনিসুর রহমান ফরাজী বলেন, নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের আদেশ অমান্য করে চারিদিকে মানুষ ঘোরাফেরা করছে। সড়কে মানুষের ঢল ফেরানো যাচ্ছে না। দিশাহারা মানুষ জীবন-জীবিকার তাগিদে ঘরেও বসে থাকতে পারছে না। এই বেসামাল অবস্থায় মানুষ দিন দিন আরো বেশি পরিমাণে আক্রান্ত হবে। অকাল মৃত্যু অধিক হারে বাড়বে। ইতোমধ্যে করোনা হাসপাতালগুলোতে রোগীদের ঠাঁই হচ্ছে না। প্রশাসন আরো কঠোর না হলে ভয়াবহ পরিণাম জাতিকে বহন করতে হবে।

পোশাক কারখানা খোলা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দোকান, বাজারে আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘জীবন ও জীবিকা একসঙ্গে চালিয়ে নিতে করোনা রোগী আর যাতে না বাড়ে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সে চেষ্টা করছে। আমাদের মৃত্যুহার অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। সংক্রমণ কিছু বাড়ছে। গত ৮ থেকে ১০ দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ করে, এরপর ৬০০, এখন ৭০০ পেরিয়েছে।’মন্ত্রী আরো বলেন, ‘আমরা ধরেই নিতে পারি, সারা দেশের মার্কেট খোলা হয়েছে, গার্মেন্টস খোলা হয়েছে, দোকানপাটে আনাগোনা বাড়ছে, কাজেই সংক্রমণ একটু বাড়বে। আমাদের যতটুকু সম্ভব নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। কাজেই সেভাবেই কাজগুলো করছে সরকার।’

বাংলানিউজসিএ/ঢাকা/ ০৭ মে ২০২০/এমএম


Array