Menu

বাংলানিউজসিএ ডেস্ক :: আগামী ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন উপলক্ষে রাজধানী এখন সরগরম। অলিগলিতে নির্বাচনী প্রচারণা। মেয়র থেকে শুরু করে কাউন্সিলর প্রার্থী এবং তাদের সমর্থকদের কেউ বসে নেই। দিনরাত বিরামহীন প্রচার-প্রচারণায় সময় কাটাচ্ছেন তারা।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, রাজধানীর ভোটাররা যে দু’জন নগরপিতা নির্বাচন করতে যাচ্ছেন, তাদের মতিগতি-কাজকর্ম-শিক্ষা-দীক্ষা-যোগ্যতা-দক্ষতা ইত্যাদির ওপর রাজধানীবাসীর ভালোমন্দ থাকার অনেক বিষয় নির্ভর করে। বিশেষ করে মশার কামড় থেকে রক্ষা করার মূল দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনই পালন করে। আর সে দায়িত্ব পালনে সফল হতে না পারায় এডিস মশার কারণে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে প্রতিবছর শত শত মানুষ মারা যাচ্ছেন।আমার পরিচিত একজন তরতাজা যুবক, যিনি পিতামাতার একমাত্র পুত্র ছিলেন, তিনিও ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। সুতরাং বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে ভবিষ্যৎ মেয়র ও কাউন্সিলরদের এ বিষয়টিও চ্যালেঞ্জের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে।

তাছাড়া রাস্তাঘাট, যানজটের সমস্যা তো আছেই। জনঘনত্বের কারণে এবং যানবাহনের ভিড়ে ঢাকা শহর এখন এমন একটি দূষিত নগরী হয়ে উঠেছে যে, পৃথিবীতে তার তুলনা মেলা ভার! আর এ দৃষ্টিকোণ থেকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের ভবিষ্যৎ মেয়র সাহেবদের এসব সমস্যার সমাধানে যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে।অন্যদিকে ভোটারদেরও যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে দু’জন মেয়র এবং একঝাঁক কাউন্সিলর নির্বাচন করতে হবে। তাদেরও ভেবে দেখতে হবে, মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্য থেকে যোগ্যতর প্রার্থী বেছে নিতে না পারলে ঢাকায় বসবাসের ক্ষেত্রে পরিবারসহ তাদের মাশুল গুনতে হবে।

কোনোরূপ বিচার-বিবেচনা না করে, বুদ্ধিবৃত্তি এবং বিবেকের প্রয়োগ না ঘটিয়ে হুজুগে মেতে উঠে ভোট প্রদান করলে সে অবস্থায় যারা চেয়ার দখল করবেন তাদের পরিণতিও শুভ হবে না, সুখকর হবে না। আর এর পরিণতিও যে আখেরে ভোটারদেরই ভোগ করতে হয়, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত বারবার সে কথাটি প্রমাণিত হয়েছে।

সুতরাং এবারে ভোট প্রদানে ভোটাররা সাবধানতা অবলম্বন করবেন তেমনটিই কাম্য। অসৎ, অযোগ্য, মেধাহীন ও সুযোগসন্ধানী প্রার্থীরা যদি নির্বাচিত হয়ে আসেন, তাহলে তারা যে নিজেদের আখের গোছাতেই সময় পার করে দেবেন, সে কথাটি ভোটারদের আবারও মনে করিয়ে দেয়া হল।

কারণ রাজনীতি করে খাওয়া একশ্রেণির মানুষ রাস্তাঘাট, কালভার্ট, ব্রিজ, ফ্লাইওভার ইত্যাদি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের টাকা আত্মসাৎসহ বিভিন্নভাবে অর্থ উপার্জনের জন্যই নির্বাচনী মাঠে নেমে নেতা নির্বাচিত হতে চান। তাদের অনেকেই নেতা হওয়ার পর অর্থের লোভে রাস্তাঘাট, ব্রিজ তো খেয়ে ফেলেনই, আবার ক্যাসিনোর মতো জুয়ার আড্ডা বসিয়েও অর্থের পাহাড় গড়ে তোলেন।

আর সেসব অর্থের জোরে তারা নির্বাচনী ব্যবস্থাসহ পুরো সমাজব্যবস্থার মূলেই কুঠারাঘাত করেন। অর্থের জোরে তারা ভোটের বাজারে প্রভাব বিস্তার করেন, ক্যাসিনোর আড্ডায় বিদেশি নারী আমদানি করেন। এক কথায়, ওই শ্রেণির মতলববাজ ব্যক্তি বিভিন্ন কায়দা ও ধান্দায় নেতা নির্বাচিত হয়ে নিজেদের স্বার্থ ও লক্ষ্য হাসিলের জন্য উঠেপড়ে লাগেন। টেন্ডারবাজি, ঠিকাদারি ইত্যাদির মাধ্যমে তারা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অর্থ লোপাট করে দেন।

উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের চার ভাগের এক ভাগ দ্বারা কোনোমতে দায়সারা কাজ করে বাকি তিন ভাগ টাকাই নিজেরা ভাগ-বাটোয়ারা করে নেন। আবার বিভিন্ন কায়দা-কৌশল ও ফন্দিফিকির করে ব্যয় বরাদ্দের টাকা দফায় দফায় বাড়ানো হয়। আর সিটি কর্পোরেশন হল এসব ধান্দাবাজির একটি বিরাট উৎস ও স্থান।

এ অবস্থায় আসন্ন সিটি নির্বাচনে যাতে ওই শ্রেণির প্রার্থীরা সুবিধা করতে না পারেন, ভোটারদেরই সে দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। যেহেতু সৎ ও যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনের সুযোগ হাতে এসেছে, সুতরাং সে সুযোগ হাতছাড়া করা চলবে না। দুষ্ট লোকের মিষ্টি কথায় না ভুলে নিজেদের বিচার-বুদ্ধি ও বিবেক প্রয়োগ করে সঠিক নেতা নির্বাচনই হবে এখন সময়ের কাজ।

আবার যে শ্রেণির প্রার্থীরা অর্থকড়ি ব্যয় করে টাকার জোরে নির্বাচিত হতে চান, তাদের বয়কট করাটাও জরুরি। কারণ যারা অর্থকড়ি ব্যয় করে নির্বাচিত হতে চান, পরে তারা কিন্তু সুদে-আসলে তা উশুল করে নেন। এ ক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন, আগামী পাঁচ বছরের জন্য দুই সিটি কর্পোরেশনে যিনি বা যারা নির্বাচিত হয়ে আসবেন, তাদের হাত দিয়েই রাজধানী ঢাকা শহরের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে শত শত, হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হবে এবং সেসব টাকা জনগণের টাকা, রাষ্ট্রীয় কোষাগারের টাকা।

সুতরাং ওইসব অর্থ হাতানোর তালে যারা নির্বাচিত হতে চাচ্ছেন, তাদের ঠেকানোই এবারের নির্বাচনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন ও ভোটারদের একযোগে কাজ করা উচিত।নির্বাচন কমিশন যদি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে অবিচল থাকেন, তারা যদি কোনো ধরনের ভোট ডাকাতি, ভোটচুরি, ভোট কারচুপি করতে না দেয়, তাহলে ভোটাররাও সাহসের সঙ্গে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন এবং তখন অসৎ, দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিরা সুবিধা করতে পারবেন বলে মনে হয় না।

মনে রাখা প্রয়োজন, অতীতে দেখা গেছে, সিটি নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে অনেক কাউন্সিলর পর্যন্ত টাকার কুমির বনে গেছেন এবং দেশে-বিদেশে তারা সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। আবার অনেক কাউন্সিলরের নামেই অভিযোগ আছে বা ছিল যে, তাদের অনেকেই ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড তথা সন্ত্রাসীদের গডফাদার। এবারও যদি ওই শ্রেণির ব্যক্তিদের পদচারণা নির্বাচনী ময়দানে দেখা যায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও ভোটারদেরই জবাব দিতে হবে।

আসন্ন নির্বাচনে ওইসব গডফাদারকে চিহ্নিত করার দায়িত্বও ভোটাররাই গ্রহণ করবেন বলে আমাদের বিশ্বাস। কারণ ভোটাররা যদি ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা পালন না করেন বা ব্যর্থ হন, তাহলে ওইসব মার্কামারা প্রার্থীই আবার বিজয়মাল্য গলায় দিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিলে তৎপর হয়ে উঠবেন। আর তখন পরিবর্তন বলতে কিছুই চোখে পড়বে না। যে লাউ সেই কদুই থেকে যাবে। সুতারাং ভোটাররা সাবধান!

২.

ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনকেও এবার অগ্নিপরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে। নির্বাচন কমিশনের ওপর যাতে জনগণের আস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় তার জন্য যা কিছু করণীয় তার সবকিছুই করতে হবে। কোনোরূপ ভোট জালিয়াতি, ভোট কারচুপি হলে নির্বাচন কমিশন শুধু প্রশ্নবিদ্ধ হবে তাই নয়, জনগণ তাদের ওপর সম্পূর্ণ আস্থা হারিয়ে ফেলবে। অতীতে যা কিছু ঘটার ঘটেছে, যে যা করার করেছেন, যে যা বলার বলেছেন, কিন্তু আর নয়।

দেশ ও জাতি যাতে কোনোরূপ দুই নম্বরি নির্বাচন প্রত্যক্ষ না করেন, নির্বাচন কমিশনকে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আর সে জন্য নির্বাচন কমিশনকে কোমর শক্ত করে মেরুদণ্ড সোজা রেখে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হবে। কারণ অতীতে নির্বাচন নিয়ে অনেক কথা হয়েছে, অনেক ঘটনা ঘটেছে, খোদ নির্বাচন কমিশনের ভেতর থেকেই একেকজন ভিন্ন ভিন্ন বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছেন, যার ফলে জনগণও বিভ্রান্ত হয়েছেন, বিব্রত হয়েছেন।

সুতরাং নির্বাচনসংক্রান্ত সব ধরনের বিভ্রান্তি দূর করাও নির্বাচন কমিশনের জন্য দায়িত্ব ও কর্তব্য হয়ে পড়েছে। সব ধরনের বিভ্রান্তি দূর করে রাজধানীর দুই সিটি নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন নতুন করে আত্মপ্রকাশ করবে, তেমনটিই আমাদের প্রত্যাশা। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নেই বলে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে এতদিন যেসব কথাবার্তা বলা হচ্ছিল তার একটা যুতসই জবাব প্রদানের সুযোগ এসেছে বলেও আমরা মনে করছি। আশা করি, নির্বাচন কমিশন সুযোগটি হাতছাড়া করবে না।

বর্তমান অবস্থায় দেশের মানুষও দেখতে চান কারা সঠিক কথাটি বলছেন। কারণ সরকারি দলের প্রার্থী এবং বিরোধী দলের প্রার্থী উভয়েরই দাবি, তাদের নিজ নিজ পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং দেখাই যাক না কেন, কোন দল বা কাদের প্রতি গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। আর এ বিষয়ে দুই সিটি নির্বাচনে সুষ্ঠু ভূমিকা পালন করে সঠিক ঘটনার প্রতিফলন ঘটিয়ে নির্বাচন কমিশনই আমাদের আসল ঘটনা দেখতে, শুনতে ও বুঝতে দেবে বলে আশা রাখি।

সেই সঙ্গে এটাও প্রমাণ হয়ে যাবে, বর্তমান রাজনীতির ময়দানে কে বা কারা চ্যাম্পিয়ন। মোট কথা, ১ ফেব্রুয়ারির দুটি সিটি নির্বাচন সঠিকভাবে এবং সঠিক পথে অনুষ্ঠিত হওয়া দেশ ও জাতির সঙ্গে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর জন্যও অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ দেশের দুটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তিই নিজেদের সবচেয়ে জনপ্রিয় বলে দাবি করে চলেছে। আর নির্বাচনসংক্রান্ত যেসব কথাবার্তা চালাচালি হয়, নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে যা বলা হয়, তাতে করেও দেশের মানুষ হাঁপিয়ে উঠেছেন।

এ অবস্থায় যেহেতু রাজধানীর দুটি সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে, যেখানে সর্বাধিকসংখ্যক জ্ঞানী-গুণী শিক্ষিত মানুষের অবস্থান, সর্বাধিকসংখ্যক ধনী লোকের বসবাস, সর্বাধিকসংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সর্বসেরা বিদ্যাপীঠগুলোর অবস্থান এবং সেখানকার ছাত্র-শিক্ষক-অধ্যাপকদের অবস্থান, সেহেতু এ নির্বাচনেই আমরা জেনে নিতে চাই বর্তমান অবস্থায় রাজনীতির ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তার ব্যারোমিটার কোন দিকে? তবে সে ক্ষেত্রে অবশ্যই একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

বাংলানিউজসিএ/ঢাকা/ ২৫ জানুয়ারি ২০২০ /এমএম


Array