Menu

বাংলানিউজসিএ ডেস্ক :: মানুষ যখন কোনো কর্ম সম্পাদন করার জন্য কায়িক বা মানসিক শক্তি ব্যয় করে তখন তাকে শ্রম বলে। জগৎ সংসারে বেঁচে থাকার জন্য মানুষকে কোনো না কোনো কাজ করে বেঁচে থাকতেই হয়। শ্রমের মূল্যায়নের কথা উঠলেই আমরা কর্মক্ষেত্রের ৮ ঘণ্টা বেতন মাফিক কাজকেই বুঝি। হতে পারে তা দৈনিক হিসাবে বা মাসিক। অনেক সময় ত্রিমাসিক, বছরব্যাপীও এ হিসাব-নিকাশ হয়ে থাকে। এভাবে চলছে শতাব্দী ও যুগান্তরে। সেই প্রচলিত ধারায় এখনো যে শ্রমটি বিরাজমান।

কিন্তু যে সময়টিতে শ্রমের এত মূল্য সেখানে আমাদের মা ,বোন, খালা, ফুফু, মামি, নানী, দাদী গৃহিণীদের নেই কোনো কাজের মূল্য এবং স্বীকৃতি। এ কাজের মূল্য হিসেবে শুধু ভালোবাসা হলেও অনেকের কপালে তাও জুটেনা।গবেষকেরা বলছেন, কর্মজীবী একজন নারী দিনে গড়ে তিন ঘণ্টার বেশি ঘরে কাজ করেন। পুরুষকে করতে হয় দেড় ঘণ্টার কম। অন্যদিকে বাইরে কাজ করেন না এমন নারী প্রায় ছয় ঘণ্টা গৃহস্থালির কাজ করেন। পুরুষ করেন দুই ঘণ্টার কম।

সূত্রে জানা যায়, দেশে ৪৩ শতাংশের বেশি নারী পুরোপুরিভাবে গৃহস্থালির কাজে যুক্ত। পুরুষ ১ শতাংশের কম। দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনে (জিডিপি) নারীর অবদান ২০ শতাংশ। তবে গৃহস্থালির কাজকে জাতীয় আয় পরিমাপের পদ্ধতিতে (এসএনএ) যোগ করা গেলে, জিডিপিতে নারীর অবদান দাঁড়াবে ৪৮ শতাংশ।বর্তমান সময়েও বহাল ও জায়গা করে আছে তা হলো গৃহিণীদের সংসারপ্রেম। সম্পর্ক বা ভালোবাসার বিনিময়েই যে শ্রমের মূল্য। অথচ নেই যে পেশায় এক দিনেরও ছুটি। একটু অবসর বা পেনশনের নেই কোনো ব্যবস্থা। তবুও তারা একমনে তা করে যাচ্ছেন এবং বলতে দ্বিধা নেই, এরা আসছেন বলেই এখনো পারিবারিক প্রথা প্রচলিত আছে। আছে ঘরে ফেরার সুখ।

নারীরা বলেছেন, ঘরের কাজের সঙ্গে অর্থের সম্পর্ক নেই। আছে আবেগ, দায়িত্ববোধ আর ভালোবাসা, যার কোনো মূল্য হয় না। অন্যদিকে একদল নারীরা বলছেন, একজন নারী ঘরের মধ্যে প্রতিদিন যে কাজ করছেন, এর মূল্যায়ন না হওয়ায় অর্থনীতিতে নারীর অবদান আড়ালে থেকে যাচ্ছে।আর এ নিয়ে কথা হয় ভোলার কয়েকজন আদর্শ গৃহিণীদের সঙ্গে। তাদের একজন রাজিয়া সুলতানা (শিল্পী)। কথায় আছে- যে রাঁধে সে চুলও বাধে। রাজিয়া সুলতানাও সেরকম একজন। তিনি পেশায় একজন শিক্ষক। তিনি শিক্ষক প্রশিক্ষকও। এছাড়াও তিনি শিক্ষকদের সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে দায়িত্বও পালন করে আসছেন। শুধু এখানেই শেষ নয় হস্তশিল্পেও তিনি পটু। এতসব কাজের মাঝেও তিনি গৃহস্থালির কাজ নিজেই করেন। কাজকে ভালোবেসেই তিনি ঘরও সামলান।

তিনি বলেন, নারীর গৃহস্থালির কাজ জিডিপিতে না হোক, অন্তত একটা হিসাবেও যদি আসত, তাহলে জানা যেত একজন নারী ঘরে যে কাজ করছেন, তা বাইরে করলে কত পেতেন? কিংবা একজন নারী ঘরে সন্তান লালন-পালনের বাইরেও নৈমিত্তিক যেসব কাজ করছেন, সেগুলো অন্য কাউকে দিয়ে করালে কত টাকা খরচ হতো? এতে নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আসত বলে তিনি মনে করেন।গৃহিণী সম্পা। তিন সন্তানের জননী। স্বামী সরকারি কর্মকর্তা। তিনি জানান, তাদের দাম্পত্য জীবনের বয়স এবার ২০ পেরিয়ে যাবে। এই দীর্ঘ পথ চলায় তাকে এক হাতেই সামলাতে হয়েছে সংসার। স্বামীর অনুপস্থিতিতে বাজার করা, ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা, ঘর গৃহস্থালির কাজ সব একার দায়িত্বেই দিতে হয়েছে সামাল। দুই হাতেই ঘরে-বাইরে যাবতীয় কাজ সারতে হয়। প্রাপ্তিতা এটুকু যে, তিন সন্তানই যথাযথ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে যাচ্ছে। তারা দেশ ও জাতির মঙ্গল বয়ে আনবে।

আরেকজন জননী তাসলিমা বেগম। তিন সন্তানের মা। স্বামী প্রবাসী। দু-চার বছর পরপর ১ মাসের জন্য দেশে আসেন। প্রতি মাসে সংসার খরচ বাবদ পাঠান টাকা। কিন্তু তাসলিমার নিজস্ব যে একটা খরচ থাকতে পারে, স্বামী এ ব্যাপারে থাকেন নিরুত্তাপ। তিনি জানান, এ নিয়ে অনেক বাগবিতণ্ডা হয়েছে। স্বামী কৌশলে বারবারই বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। উত্তরে শুধু শুনতে হয়েছে, তোমার সংসার, তোমার ছেলে-মেয়ে। তোমার হাত দিয়েই তো সব খরচ করো। এখান থেকে নিজের জন্য কিছু বের করে নিও।

তাসলিমা আফসোস করে বলেন, তবুও বলে না আলাদাভাবে কিছু নিও। সন্তানরা বড় হচ্ছে। বাড়ছে ওদের খরচের পরিসর, দায়িত্ব ও ব্যস্ততা। তিনি শুধু গোনা টাকা, মাঝে মধ্যে ফোনে কথা বলে দায়িত্ব সম্পন্ন করেন। সময় বের করে নিজে যে একটা কিছু করব তাও পারছি কই! সব দিক মিলিয়ে নিজেকেই দিতে হচ্ছে ছাড়। সে হোক আর্থিক, মানসিক, শারীরিক সব বিষয়েই। শুধু পারিবারিক সুখ, সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের চিন্তা মাথায় রেখে সকাল ৬টা থেকে মধ্যরাত অবদি নিরলস পরিশ্রম করে যায় এই মা।

শুধু শিল্পী, সম্পা আর তাসলিমা নয়। সকল নারীরাই ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ আর আবেগের তাড়নায় বিনা পারিশ্রমিকে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে কয়েকজন শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, খেয়াল করলে দেখা যায় যে প্রায়ই ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় এ বিষয়টি ওঠে আসছে। সম্মানী না দিলেও গৃহিণীদের গৃহকর্মের মূল্যবোধে করছে পুরুষরাও। কারণ এদের মা, বোন, মেয়েও তো একজন নারী, যাদের প্রতি সমবেদনা আছে। আছে অকৃত্রিম ভালোবাসা, দায়িত্ববোধও।

আসল কথা হচ্ছে, দিন দিন এ দায়িত্ববোধের প্রতি মানুষ সচেতন হচ্ছেন। স্ত্রীর কাজে হাত লাগাচ্ছেন। তাকে বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন। মাস শেষে সংসার খরচের পাশাপাশি হাতে দিচ্ছেন পছন্দনীয় উপহার, কিছু টাকা। বছরে একবার কেউ কেউ যান পারিবারিক সফরেও, যা গৃহিণীদের মানসিকভাবে যেমন ভালো রাখে নিত্যদিনের একঘেয়েমি ঘুচিয়ে চলার পথকেও আনন্দদায়ক করে।

বাংলানিউজসিএ/ঢাকা/ ০২ মে ২০২০/এমএম


Array