প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক :: প্রাচীন মিশরের ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের অন্যতম বিস্ময়কর নিদর্শন রাজা তুতেনখামেনের সমাধি আবিষ্কারের ১০৪ বছর পূর্ণ হয়েছে বুধবার (৪ নভেম্বর)। ১৯২২ সালের এই দিনে মিশরের দক্ষিণাঞ্চলীয় লুক্সরের কিংস ভ্যালি বা রাজাদের উপত্যকায় আবিষ্কৃত হয় প্রায় তিন হাজার বছরের পুরোনো এই সমাধি। প্রত্নতত্ত্বের ইতিহাসে এটিকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ইতিহাসে ‘বালক রাজা’ হিসেবে পরিচিত তুতেনখামেন মাত্র নয় বছর বয়সে প্রাচীন মিশরের ফারাও বা রাজা হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেন। আনুমানিক ১০ বছর রাজত্ব করার পর খ্রিষ্টপূর্ব ১৩২৩ সালের দিকে মাত্র ১৮ বা ১৯ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ ও মিশরবিদ হাওয়ার্ড কার্টারের নেতৃত্বে দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ১৯২২ সালের ৪ নভেম্বর সমাধিটির প্রবেশপথ আবিষ্কৃত হয়। এরপর ২৬ নভেম্বর কার্টার ও তাঁর দল সমাধির ভেতরে প্রবেশ করেন। সমাধির অন্তর্গত শেষ কক্ষটি আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করা হয় ১৯২৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি।
প্রাচীন মিশরের বহু রাজকীয় সমাধি সময়ের ব্যবধানে লুটেরাদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তুতেনখামেনের সমাধিটি প্রায় অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়। ফলে এর ভেতরে সংরক্ষিত বিপুলসংখ্যক মূল্যবান প্রত্নবস্তু প্রাচীন মিশরের রাজকীয় জীবন, ধর্মীয় বিশ্বাস, শিল্পকলা ও সমাধিসংক্রান্ত আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে নতুন তথ্য জানার সুযোগ তৈরি করে।
সমাধি থেকে পাঁচ হাজারেরও বেশি মূল্যবান সামগ্রী উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে বিখ্যাত স্বর্ণের মৃত্যুমুখোশ, বিশুদ্ধ সোনার তৈরি রাজকীয় কফিন, অলংকার, রথ, আসবাবপত্র, অস্ত্র, মূর্তি এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের নানা উপকরণ। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এসব ঐতিহাসিক নিদর্শনের পাশাপাশি সমাধির ভেতরেই পাওয়া যায় ফারাও তুতেনখামেনের মমি।
সমাধি আবিষ্কারের পর বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপক গুরুত্ব পায় এবং প্রাচীন মিশরের সভ্যতা, শিল্প ও ইতিহাস নিয়ে আন্তর্জাতিক আগ্রহ বহুগুণে বেড়ে যায়। বিশেষ করে তুতেনখামেনের স্বর্ণের মৃত্যুমুখোশ বিশ্বজুড়ে প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার অন্যতম পরিচিত প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
তবে তুতেনখামেনকে ঘিরে শুধু আবিষ্কারের বিস্ময়ই নয়, নানা রহস্যও দীর্ঘদিন ধরে মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। তাঁর সমাধি আবিষ্কারের পর কথিত ‘ফারাওয়ের অভিশাপ’ নিয়ে নানা গল্প ছড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি অল্প বয়সে তাঁর মৃত্যুর কারণ নিয়েও ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মধ্যে দীর্ঘদিন আলোচনা চলে।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় তাঁর মমির সিটি স্ক্যান এবং ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়েছে। এসব পরীক্ষার ফলাফলে তাঁর শারীরিক দুর্বলতা, জন্মগত কিছু স্বাস্থ্যসমস্যা এবং ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। গবেষকদের একটি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পায়ের হাড় ভাঙার পর সৃষ্ট জটিলতা এবং গুরুতর ম্যালেরিয়া তাঁর মৃত্যুর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তাঁর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে গবেষণা ও বিতর্ক এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।
বর্তমানে তুতেনখামেনের সমাধি মিশরের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনস্থল। লুক্সরের কিংস ভ্যালিতে অবস্থিত এই সমাধি দেখতে প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক পর্যটক আসেন। প্রাচীন মিশরের পিরামিড, মন্দির ও অন্যান্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের পাশাপাশি তুতেনখামেনের সমাধিও দেশটির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও পর্যটনশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ফারাউ রাজা তুতেনখামেনের সমাধি আবিষ্কারের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কমেনি। বরং এই আবিষ্কার প্রাচীন মিশরের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস উন্মোচনে নতুন দিগন্ত সৃষ্টি করেছে। আজও ‘বালক রাজা’ তুতেনখামেন এবং তাঁর স্বর্ণভাণ্ডার প্রাচীন মিশরের ঐশ্বর্য, শিল্পকুশলতা ও সভ্যতার গৌরবের এক অনন্য প্রতীক হয়ে আছে।
প্রবাস বাংলা ভয়েস/কানাডা/০৫ নভেম্বর ২০২৬/এএ





