প্রিয় আব্বা, প্রতিবারই তো তোমাকে আমি টেক্সট মেসেজ পাঠাই। কিন্তু কেন জানি না, সেসব কথার মধ্যে একটা কৃত্রিমতা থেকে যায়। মনে হয়, মনের সবটুকু অনুভূতি ঠিকমতো পৌঁছায় না। তাই ভাবলাম, এবার তোমাকে একটা চিঠিই লিখি।
ছোটবেলায় তোমার মুখে কতবার শুনেছি, দাদুভাইয়ের লেখা একেকটা চিঠি বিদেশে তোমার স্কুলে পৌঁছাতে প্রায় মাসখানেক সময় লেগে যেত। কিন্তু তুমি বলতে, সেই এক মাসের অপেক্ষার পর খামটা হাতে পাওয়ার যে আনন্দ, তার মিষ্টতা নাকি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। সেই মিষ্টি অনুভূতির একটু ছোঁয়া তোমাকেও দিতে চাই বলেই আজ এই চিঠি।
একটা কথা তোমাকে না বললেই নয়, আব্বা।
অপারেশন থিয়েটার থেকে যখন আমাকে স্ট্রেচারে করে রিকভারি রুমে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন এক ঝলকের জন্য তোমাকে দেখেছিলাম আমি। জানি, তুমি অনেক চেষ্টা করেছিলে নিজেকে সামলে রাখতে। কিন্তু তোমার ছলছল করা চোখ দুটো আমাকে ফাঁকি দিতে পারেনি, আব্বা।
তুমি আমার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলে। তোমার ঠোঁটে কোনো কথা ছিল না, কিন্তু চোখভরা ছিল সীমাহীন আদর, দোয়া আর সাহস। আমার চোখও ভিজে উঠেছিল। সেই নোনা জলগুলো মুছে যখন আবার চোখ খুললাম, তখন দেখলাম তুমি আর সেখানে দাঁড়িয়ে নেই।
তোমার জায়গায় আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আমার ছেলে, আমার মেয়ে আর আমার সহধর্মিণী।
সেই মুহূর্তেই যেন বুঝতে পারলাম, তুমি তোমার সমস্ত দায়িত্ব আর ভালোবাসা নিঃশব্দে ওদের হাতেই তুলে দিয়ে গেছ। আর তুমি আজও আছ—ওদের স্পর্শে, ওদের দোয়ায়, আর আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে।
তোমাকে হারানোর পর বেশ কিছু সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু আজ, যখন আমি সেই একই পথ দিয়ে হেঁটে চলেছি যেটা তুমি একদিন হেঁটেছিলে, তখন তোমার অনুপস্থিতির ভার যেন আরও বেশি অনুভব করি।
লোকেরা বলে ক্যান্সার একটি যুদ্ধ। কিন্তু নিজের শরীরের ভেতরে বাস করা এক অদৃশ্য শত্রুর সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করার যে অসীম ক্লান্তি, তার জন্য কেউ কখনও প্রস্তুত করে না।
এখন আমি বুঝতে পারি, প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সাহসের মুখোশ পরে আমাদের সামনে দাঁড়াতে তোমার কতটা নীরব সাহসের প্রয়োজন হতো। নিজের ভয়গুলো বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখে আমাদের আশ্বস্ত করা কত কঠিন ছিল। প্রতিটি মেডিক্যাল স্ক্যান, প্রতিটি চিকিৎসার ধাপ, আর প্রতিটি বমি বমি ভাবের মুহূর্ত আমাকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করায় তুমি ঠিক কতটা কষ্ট সহ্য করেছিলে।
তুমি অসুস্থ থাকাকালীন আমি যখন কখনও বিরক্ত হয়েছি বা ধৈর্য হারিয়েছি, তার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আজ আমি বুঝতে পারি, শুধু শ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকাটাই তখন কত বড় এক সংগ্রাম ছিল।
কিন্তু এই একই লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে আমি তোমার সঙ্গে এক অদ্ভুত অথচ অপূর্ব এক বন্ধনও খুঁজে পেয়েছি। যখন মনে হয় আর পারছি না, তখন তোমার সেই নীরব শক্তির কথা মনে পড়ে, যে শক্তি দিয়ে তুমি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে গিয়েছিলে। তুমি আমার ধৈর্য, সাহস আর সহনশীলতার আদর্শ।
এই রোগটি হয়তো আমাকে ভেঙে দিতে চাইছে, কিন্তু একই সঙ্গে এটি আমাকে জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা দিচ্ছে—কীভাবে প্রতিকূলতার মাঝেও দৃঢ় থাকতে হয়। মনে হয়, এ যেন তোমার কাছ থেকে পাওয়া শেষ এবং সবচেয়ে মূল্যবান উপহার।
আমি তোমাকে ভাষায় প্রকাশ করার চেয়েও অনেক বেশি মিস করি। শুধু ইচ্ছে হয়, এই কথাগুলো যদি তোমাকে সামনাসামনি বলতে পারতাম। তবুও আমি জানি, এই লড়াইয়ের প্রতিটি পদক্ষেপে তুমি আমার সঙ্গেই আছ।
অনন্ত ভালোবাসায়,
তোমারই ছেলে, শূন্য ❤️
প্রবাস বাংলা ভয়েস/কানাডা/০৬ জুন ২০২৬/এএ





