Menu

প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক :: পৃথিবীর পরিবেশ ও খাদ্য উৎপাদনে মৌমাছির ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে সচেতনতা বাড়ছে। তবে মৌমাছি রক্ষায় সাধারণ মানুষ কী করতে পারে, সে বিষয়ে এখনও অনেকের স্পষ্ট ধারণা নেই। এই কারণেই প্রতি বছর পালিত হয় বিশ্ব মৌমাছি দিবস। এই দিনটির মূল লক্ষ্য হলো মৌমাছির গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে জানানো এবং তাদের টিকিয়ে রাখতে সবাইকে উৎসাহিত করা।

বিশ্ব মৌমাছি দিবসের ইতিহাস
বিশ্ব মৌমাছি দিবসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্লোভেনিয়ার বিখ্যাত মৌচাষ বিশেষজ্ঞ অ্যান্টন জানসার নাম। ১৮ শতকে তিনি আধুনিক মৌচাষ পদ্ধতির পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিতি পান। তিনি প্রথমদিকের মানুষদের একজন, যিনি পৃথিবীর পরিবেশে মৌমাছির গুরুত্ব নিয়ে কাজ করেছিলেন। পরবর্তীতে মৌচাষ শুধু পরিবেশ নয়, অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দেখা যায়, অনেক মানুষই মৌমাছির গুরুত্ব বুঝতে পারছেন না। তখন স্লোভেনিয়ান বীকিপার্স অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে জাতিসংঘ বিশ্ব মৌমাছি দিবস ঘোষণার উদ্যোগ নেয়। প্রথমবার দিবসটি পালিত হয় ২০১৮ সালে। জাতিসংঘের মতে, মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের কারণে মৌমাছি আজ বড় হুমকির মুখে। কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার, বনভূমি ধ্বংস, এক ধরনের ফসলের চাষ বৃদ্ধি এবং পরিবেশ দূষণের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে মৌমাছির সংখ্যা দ্রুত কমছে।

কেন মৌমাছি গুরুত্বপূর্ণ
মৌমাছি শুধু মধু দেয় না, তারা পৃথিবীর খাদ্যব্যবস্থার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ বুনো ফুলের গাছ পরাগায়নের জন্য মৌমাছির ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া বিশ্বের প্রায় ৩৫ শতাংশ খাদ্যশস্য উৎপাদনও সরাসরি মৌমাছির পরাগায়নের সঙ্গে জড়িত। ফল, বাদাম, সবজি, তেলবীজসহ অসংখ্য ফসল মৌমাছি ছাড়া স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন সম্ভব নয়।
শুধু মৌমাছিই নয়, প্রজাপতি, বাদুড় ও হামিংবার্ডের মতো অন্যান্য পরাগবাহীরাও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মৌমাছি পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য রক্ষা, খাদ্যসংকট মোকাবিলা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশ্বজুড়ে কৃষিতে মৌমাছির পরাগায়ন সেবার অর্থনৈতিক মূল্য বছরে প্রায় ২৩৫ বিলিয়ন থেকে ৫৭৭ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। অর্থাৎ মৌমাছি না থাকলে অনেক খাদ্যের দাম বাড়ে যেত এবং খাদ্যসংকট আরও তীব্র হতো।

সব মৌমাছি চাক বেঁধে থাকে না
অনেকেই মনে করেন সব মৌমাছি বড় চাক তৈরি করে রানিকে ঘিরে থাকে। বাস্তবে পৃথিবীতে পরিচিত ২০ হাজারের বেশি মৌমাছি প্রজাতির বেশিরভাগই একাকী জীবনযাপন করে। তারা মাটিতে বা গাছের ফাঁপা অংশে বাসা বানায়।

নেচে নেচে যোগাযোগ করে মৌমাছি
মৌমাছির সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্যের একটি হলো তাদের যোগাযোগ পদ্ধতি। তারা বিশেষ ধরনের নাচের মাধ্যমে অন্য মৌমাছিদের জানায় কোথায় ফুল আছে এবং কত দূরে খাবারের উৎস রয়েছে।

মৌমাছির ইতিহাস ১০ কোটি বছরেরও বেশি পুরোনো
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মৌমাছির উৎপত্তি প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি বছর আগে। প্রাচীন জীবাশ্মে এমন মৌমাছির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যাদের শরীরে পরাগ বহনের জন্য বিশেষ লোম ছিল।

মধুর রয়েছে চিকিৎসাগুণ
শত শত বছর ধরে মধু ক্ষত ও পোড়া স্থানে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আধুনিক গবেষণায়ও দেখা গেছে, বিশেষ ধরনের মধু ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধ এবং ক্ষত সারাতে সাহায্য করে।

কেন কমে যাচ্ছে মৌমাছি?
গবেষকরা বলছেন, একাধিক কারণে মৌমাছির সংখ্যা কমছে। এর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, বন ও ফুলের গাছ কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন, বিভিন্ন রোগ ও পরজীবী আক্রমণ এবং নগরায়ণ ও পরিবেশ দূষণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু একটি কারণ নয়, বরং সবগুলো সমস্যার সম্মিলিত প্রভাব মৌমাছির জন্য বড় সংকট তৈরি করছে।
ছোট্ট এই প্রাণীটি ছাড়া পৃথিবীর খাদ্যব্যবস্থা, কৃষি এবং জীববৈচিত্র্য বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই মৌমাছিকে শুধু একটি পোকা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তারা প্রকৃতির ভারসাম্যের অন্যতম প্রধান রক্ষক। বিশ্ব মৌমাছি দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরিবেশ রক্ষার লড়াইয়ে মৌমাছিকে বাঁচানো মানে নিজেদের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত রাখা।

প্রবাস বাংলা ভয়েস/কানাডা/২০ মে ২০২৬/এএ


Array