Menu

প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক ::‌ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন স্বাধীন গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার বিকাশে বিরাট বাধা। এ আইনের ২০টি ধারাই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে ১৪টি ধারা জামিন অযোগ্য। গণমাধ্যমের হাত-পা বেঁধে রেখে দেশে গণতন্ত্রের বিকাশ সম্ভব হবে না। এ আইন নিপীড়নমূলক, এটা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থি। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভয়াবহতা আমরা উপলব্ধি করছি। গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার বিকাশের লক্ষ্যে যা কিছু করার, আমরা সবকিছু করতে অঙ্গীকারবদ্ধ।

শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনের চামেলী হাউজে সম্পাদক পরিষদ আয়োজিত ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস : ডিজিটাল নজরদারিতে সাংবাদিকতা’ শীর্ষক আলোচনাসভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, গণমাধ্যমের হাত-পা বেঁধে গণতন্ত্রের বিকাশ হবে না। গণতন্ত্রকে হত্যা করা লাখো শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী বলে মনে করি। তিনি বলেন, সাংবাদিক ও গণমাধ্যম দমনে এত আইন কেন?

আমরা এমন কী করি? যার জন্য এত আইন দিয়ে আমাদের বেঁধে দিতে হবে? চলমান পরিস্থিতিতে সাংবাদিকতা পেশা বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সাংবাদিক দমন ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণে তৈরি আইন যদি সংশোধন না হয়, তাহলে আমাদেরকে বাতিলের পথে যেতে হবে।

মাহফুজ আনাম বলেন, আমরা এ দেশকে ভালোবাসি। দেশের উন্নতি-অগ্রগতি চাই। এত প্রতিবন্ধকতার পরও আমরা সাংবাদিকতা করে যাচ্ছি। অতীতের মতো ভবিষ্যতেও গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকতা ও সাংবাদিকদের কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টিতে যথাযথ চেষ্টা অব্যাহত রাখবে সম্পাদক পরিষদ। অচিরেই আমরা এ বিষয়ে একটি অবকাঠামো তৈরি করব।

সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। নোয়াব থেকে এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছি। আমরা মনে করি, ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও বিভিন্ন চাপের পাশাপাশি বাংলাদেশের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে আরও কিছু বিষয় যুক্ত করতে চাই। ৬০, ৭০ বা আশির দশকে সাংবাদিকদের মধ্যে যে ধরনের লিডারশিপ গড়ে উঠেছিল, দক্ষ সাংবাদিক ও সংগঠন ছিল; এখন সেই ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে না। সংবাদপত্রের বিকাশে সাহসী নেতৃত্ব খুবই জরুরি।

সম্পাদক পরিষদের সহসভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবীর বলেন, দেশে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা সমস্যা শতভাগ রাজনৈতিক সমস্যা। যদি আমরা এর সমাধান করতে চাই, তাহলে এটা সবার বোঝার দরকার। তিনি বলেন, কোনো সরকারের আমলেই গণতন্ত্র নিরঙ্কুশভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। আমরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছি। অবরুদ্ধ থেকে মুক্তির জন্য রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির লড়াই সংঘবদ্ধভাবে করা দরকার।

সম্পাদক পরিষদের কোষাধ্যক্ষ ও মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, সেলফ সেন্সরশিপ যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে, সেখানে কী বলব? কিছুই বলার নেই। বিভাজন থাকলে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ভয়কে জয় করতে সম্মিলিত প্রচেষ্টা লাগবে, নতুবা এ ভয় যুগ যুগ থাকবে। তিনি আরও বলেন, এই দেশে আমাদের যদি কিছু করতে হয়, সেমিনারে বক্তব্য দিয়ে কোনো লাভ হবে না। আমার মনে হয়, বিপজ্জনক অবস্থায় আছি। দেখছি দেখছি না, শুনছি শুনছি না, লিখছি লিখছি না। আবার একজন লিখলে অন্যজন বলে দেখছেন কী লিখেছে। এরপর শুরু হয়ে যায় অ্যাকশন।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, আমাদের সম্মিলিতভাবে একটি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ সাংবাদিকরা এককভাবে নিজেদের রক্ষা করতে পারবে না। সমাজকে সম্পৃক্ত করতে হবে। আমরা যদি নীতি-নৈতিকতা মেনে ভালো সাংবাদিকতা করি, তাহলে নাগরিক সমাজও সম্পৃক্ত হবে বলে আশাবাদী। তিনি বলেন, ৫০ বছরে একজন সাংবাদিক হত্যার বিচার হয়নি। আইনের প্রয়োজন আছে তবে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্র নির্দিষ্ট করা দরকার।

সম্পাদক পরিষদের সহসভাপতি ও ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলেন, লিখতে পারি; কিন্তু যা লিখতে চাই তা পারছি কি না, সেটাও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুক্ত সাংবাদিকতা করতে চাই। ইউনিয়ন বিভক্ত হলেও সবাইকেই সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। সরকার যতদিন খুশি থাকুক। ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করবে তাতে সমস্যা নেই। আমরা মুক্ত গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার সুষ্ঠু পরিবেশ চাই।

নবম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নে সম্পাদক পরিষদের নেতাদের কাছে দাবি জানিয়ে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ওমর ফারুক বলেন, সরকার নজরদারি করে আর আমরা যদি নীতি-নৈতিকতায় ঠিক না থাকি, তাহলে সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে না। সাংবাদিকতা ও রাজনীতি পাশাপাশি জড়িত হওয়ার ফলে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। যারা সংগঠনের কর্মীদের রুটি-রোজগারে সোচ্চার, সেই আমরাই বিভক্ত!

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (একাংশ) সভাপতি এম আব্দুল্লাহ বলেন, কেন্দ্র থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যায়েও মাঠের সাংবাদিকদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। সাংবাদিক হত্যার বিচার হয় না বলেই দেশে এই সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (একাংশ) সভাপতি কাদের গণি চৌধুরী বলেন, কণ্ঠরোধের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট। এটি সাংবাদিকসহ দেশের মানুষকে ভয় দেখানোর ফাঁদ। এটাকে আমি আইন বলতে চাই না। সভ্য সমাজে এই কালো ও অসভ্য আইন বাতিলের দাবি জানাই।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি নজরুল ইসলাম মিঠু বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়ার পরও ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট ২০১৮ আইন পাশ করেছে। ফলে অধিকাংশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের যেসব ধারা গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার বিরোধী, তা বাতিলের দাবিও জানান তিনি।

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আখতার হোসেন বলেন, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট ছাড়াও আরও বিভিন্নভাবে সাংবাদিকদের নজরদারিতে রাখা হয়। আমি মনে করি, সবার আগে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

অনুষ্ঠানে সম্পাদক পরিষদের সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, আজকের পত্রিকার সম্পাদক ড. গোলাম রহমান, ইনকিলাব সম্পাদক এএমএম বাহাউদ্দীন, সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু, প্রকাশিতব্য প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকার সম্পাদক মোস্তাফিজ শফি প্রমুখ। আলোচনা অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।

প্রবাস বাংলা ভয়েস/ঢাকা/ ১৭ মে  ২০২২ /এমএম