Menu

প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক ::‌ মৃত্যু একধরনের ছোঁয়াচে রোগের মত। একজন চলে যায়, বাকিদের মাঝে অস্তিত্ববাদের প্রশ্ন উঠিয়ে যায়। মৃত্যু অদ্ভুত এক সত্যি, চাইলেও অগ্রাহ্য করা যায় না। মানুষকে অদ্ভুতভাবে উদার করে তোলে কেন যেন এই মৃত্যু নামক শব্দটা। আজকে খুব কাছ থেকে মৃত্যু জিনিসটা দ্বিতীয়বারের মত উপলব্ধি করলাম। যা নিজে কয়েকমাস যুদ্ধ করেও উপলব্ধি করতে পারিনি, তা খুব সহজেই অন্যের চলে যাওয়ায় বুঝে উঠি আমরা। আত্মারা চলে গেলে ঘর ভর্তি করে এবং অন্যান্য সবার মাঝে শুন্যতা ফেলে যায় এই তথ্যটি ভুল। নয়ত প্রাণহীন দেহের হাত ধরে কয়েক মুহুর্ত বসে থাকা মানুষটি কেন বোঝে না যে এই শরীরী উত্তাপ, স্পর্শ একবার হারিয়ে গেলে কখনোই ফিরবে না?

একটা গল্প বলি? আমার খুব কাছের একজনের জীবনে ঘটে যাওয়া একটি গল্প। আমি তার নাম বলবো না, বলতে চাইও না। মনে করুন, সে এই নগরীতে থাকে না। এই শহরেও থাকে না। তার একটাই ইচ্ছে সবসময়, কিভাবে একজন অসাধারণ মানুষ হওয়া যায় সব সাধারনতা কাটিয়ে। আমাকে প্রায়ই মাঝরাতে কল দিয়ে বিরক্ত করতো সে এই একটি প্রশ্নের জন্য। কিভাবে অসাধারণ হওয়া যায় এই উত্তর আমার কাছে জানা নেই, বুঝতেই পারছেন যেহেতু আমি নিজেই ভয়ংকর সাধারণ একটি মেয়ে।

আমি এতই সাধারণ যে পথে একটা পাথরকণা পরে থাকলেও মানুষ আমাকে ফেলে সেটাকে লক্ষ্য করবে। সেই আমাকেই খুঁজে পেয়েছিল এই প্রশ্নটির উত্তরের জন্য সে। অথচ সে অসাধারণ একজন মানুষ ছিল। নীল চোখ, কালো চুল, খাড়া নাক, তীব্র সফেদ গায়ের রঙ তাকে স্বভাবতই আলাদা করেছিল আমার চোখে। মনে করি, তার নাম ব্রুনো। কারণ, আমি এখানে গল্প বলতে এসেছি, জীবনের ডায়েরী লিখতে নয়। সে ভবঘুরের জীবন বেছে নিয়েছিল। তার বাবা টলেডো থেকে পরিবার সহ ভ্যালেন্সিয়াতে শিফট করলেও সে থেকে গেছিলো টলেডোতে।

এতে অবশ্য তারা খুশীই হয়েছিলেন। কারণ, ব্রুনো জানে তার স্টেপ মাদার তাকে পরিবারের একজন সদস্য না ভাবতে পারলেই খুশী হয়। ব্রুনো কারো অখুশীর কারণ হতে চায় না। অথচ, অসাধারণ হতে হলে দশজনকে চটিয়ে, নিজের মত হতে হয়। ব্রুনো ভবঘুরে জীবনটাই বেছে নিয়েছিল। সানডের বারের ককটেল পার্টির গ্লাস, মানডে অলিভিয়েরার সাথে রাত কাটিয়ে টুইসডে তে ক্যাসিনো তে টাকা খুইয়ে ওয়েন্সডে তে নিঃস্ব হয়ে ইবিজার সমুদ্র সৈকতে বসে মধ্যরাতে ফোন করে জমিয়ে রাখা একটি প্রশ্নই উগড়ে দেয়া ছিল তার জীবনের একাংশের রুটিন। একটাই প্রশ্ন, “আমি কিভাবে অসাধারণ হবো।”

ব্রুনো ভালো গান গায়। আমি তার মেটাল মিউজিক ভালোবাসি। তার মিউজিক ভিডিও আমাকে ভাবায়। হতে ধরে রাখা একটি কালো গোলাপ ছেড়ে দেয়ার সিনটা আমি রিওয়াইন্ড করে বারবার দেখি। তাকে কি তখন আমার অসাধারণ লাগে একটু হলেও? কে জানে হয়তো!

প্রত্যেক থার্ডসডে তে একটি চার্চের কাছে গিয়ে আমাকে ছবি তুলে পাঠায়। ঈশ্বরের বেদীর মোমবাতির ম্লান আলোয় চিরন্তন ক্লান্ত ঈশ্বরের ক্রুশবিদ্ধ এই বেদিতেই এক রাতে নবজাতক ব্রুনোকে ফেলে গেছিলো তার মা একটি ঝুড়িতে। সাথে একটি চিরকুট, চিরকুটে ব্রুনোর বাবার এড্রেস। ব্রুনোর বাবার প্রাক্তন বান্ধবী আগাতার অযাচিত সন্তান, যাকে নিয়ে তার ভবিষ্যতে ঝুঁকি নিতে রাজি ছিল না সে। ব্রুনোর জায়গা হলো বাবার সংসারে একজন আগন্তুক হিসেবেই।

-‘কেন আসো এখানে প্রত্যেক উইকে?’

-“আই লাভ ট্যু কাম হিয়ার!”

আমি বুঝি, ব্রুনো কেন আসে চার্চে। আচ্ছা, ব্রুনো কি একই প্রশ্ন জমিয়ে রেখেছে তার মায়ের জন্য? জন্মদাত্রী মায়ের এই আচরণ কি তার মাকে তার কাছে অসাধারণ ভাবেই উপস্থাপন করেছে চেতনায়? ছেড়ে যাওয়া কি অসাধারণ কিছু?

এরই মাঝে কেটে যায় কয়েকমাস। ব্রুনো নিখোঁজ হয়ে যায়। আমিও আর খুঁজিনি। ব্যস্ত ছিলাম আমার জীবনে, আমার খুব সাধারণ জীবনটায়।

এবার আসি অন্য গল্পে। এই গল্পেও একজন ছেলে আর তার মায়ের ভূমিকা আছে। ছেলেটির মায়ের জগৎ জুড়ে তার এই ছেলেটিই থাকে আজকাল। জীবনের একটা ক্ষেত্রে গিয়ে সে ছেলেটিকেই আকড়ে ধরে ছিল। ছেলেটিও মায়ের টানেই অনিচ্ছার সেই ধূসর গৃহে ফিরত। গভীর রাতে তার মা ভাত বেড়ে বসে থাকতো পাশে। আর সাথে ছিল বকুনি, “আমারে শান্তি দিবি না রে তুই? হ্যা? এত রাইত কইরা বইসা থাকি, তাড়াতাড়ি ফিরতে পারস না?”

ছেলেটি দ্রুতহাতে খেয়ে যায়। ভাই ভাবীরা ঘুমিয়ে গেছে কখন। কার দায় একটি ভবঘুরে ছেলের জন্য মায়া পুষে রাখব? মায়া পুষে রাখার কাজ একমাত্র মায়েদেরই হয়। এই যে, এখন আবার কেউ ব্রুনোর জন্মদাত্রী মা আগাতার প্রসঙ্গ আনবেন না প্লিজ। আমি সবই বলবো। আগে এই ছেলেটি আর তার দুঃখিনী মায়ের গল্প বলি?

এই মা তার ছেলের জন্যই দিনের একটা বিশাল অংশ খরচ করতো চিন্তায় চিন্তায়। ছেলের বিয়ের জন্য মেয়ে খোজা, ছেলের পছন্দের খাবার জোগাড় করে অসুস্থ শরীরে রান্না করা, ছেলে রাত করে ফিরলেও তার অপেক্ষায় জেগে থাকা কি চাট্টিখানি কথা বলুন? অথচ সেই মা-টাই দুম করে মরে গেল একদিন। রাত পেরোতেই সদ্য ভোরে অন্ধকারে পাড়ি জমালো মা-টা। ছেলেটি জানলো, অন্ধকারের আরো এক ধাপ কেমন হয়।

আমি গেছিলাম তার মায়ের ডেডবডি দেখতে। আমার কাছে সেই মুখ ঘুমন্ত মুখের চেয়ে কোন অংশে কম মনে হয়নি। আমার ভয় করেনি, গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠেনি। আমার ইচ্ছে করেছে তাকে জাগিয়ে দিতে, যেন স্পর্শ করলেই জেগে উঠবেন তিনি। এই মুহুর্তে মৃত্যুর মত কঠিন সত্যকে আমার মানতে ইচ্ছে করছে না। অবশ্য, সবসময় সবকিছু মানতে নেই। আসুন, ভুলে যাই এখন এদের কথা। কারণ, এতক্ষণে নিখোঁজ ব্রুনো ফিরে এসেছে গল্পে। ফোনের ওপ্রান্তে উল্লাসে ফেটে পরতে পরতে বলেছিল, “ভাবতে পারো নীতুল, আমি এখন মিলিয়ন ইউরোর মালিক?”

একদিন চার্চের কাছেই হুইলচেয়ারে ফিরে আসেন আগাতা। সাথে তার কেয়ারটেকার। হাতে কালো গোলাপ। ব্রুনো এই দৃশ্যটা স্বাভাবিভাবেই নিয়েছিল যেন সে জানতো একদিন তার মা ফিরে আসবেই। সব অতীতই তার অবশিষ্ট, উচ্ছিষ্টের টানে ফিরে আসেই। আগাতার এই শেষ দিনগুলোতে অতীতের ফেলে আসা ছেলেকেই খুঁজেছিল তার এই দুচোখ। আর ব্রুনোর ভবঘুরে মন খুঁজেছিল অসাধারণত্ব।

তাই হসপিটালের শেষ দিনটিতে উপস্থিত হয়, মায়ের ক্যানুলা লাগানো রোগা হাতে শেষ স্পর্শে মুছে দিয়েছিল অতীতের একটি পাপ। মা মরে গেছে। জ্বি, এখানে মা বলতে আমি আগাতার কথাই বলছি। সিমেট্রিতে কালো পোশাকে ব্রুনো তার মায়ের শেষকৃত্যেও অটল ছিল। যেন কেউ মরেনি, কেউ ছেড়ে যায়নি, কিছু বদলায়নি, কিছু শেষ হয়ে যায়নি শুধুমাত্র একটি গল্প ছাড়া। সে গল্প আগাতার কাছে ছিল অবশিষ্ট, ব্রুনোর কাছে উচ্ছিষ্ট। শান্তি, স্বস্তি এবং আনন্দ একটাই, গল্পটা শেষ এখানেই। শুধু পরদিনই ব্রুনোর কাছে একজন লইয়ার যান উইল নিয়ে যে ব্রুনোর মায়ের রেখে যাওয়া অঢেল সম্পদের মালিক এখন ব্রুনো।

এই আনন্দের খবর বলতে গিয়ে উচ্ছাসের বাড়াবাড়ি দেখিয়েছে ব্রুনো।

“ওহ গড, আই এম রিচ! ওহ লর্ড, আই এম রিচ!”
আমি ফোনের এই প্রান্তে মুচকি হেঁসেছিলাম।

তারপর, সেই দুঃখিনী মা আর ছেলের গল্পে আসি। এই গল্পটাও শেষ। গল্প যেমনই হোক, শেষ হওয়ার জন্যেই গল্পের শুরু হয়। ছেলের বাড়ির পেছনেই কবর হয় মায়ের। ছেলেটির রাতে ঘুম হয় না। গোটা বাড়ি জুড়ে হাসনাহেনা ফুলের তীব্র গন্ধ, টিনের চালে টিপটপ বৃষ্টি। যখন তার মাকে সমাহিত করা হয়, তখন ঝুম বৃষ্টি ছিল। কলাপাতায় ঢেকে রাখা কবরটায় কি মায়ের দেহে পচন ধরে গেছে? এই প্রশ্ন ছেলেটিকে ভালো থাকতে দেয় না, ঘুমোতে দেয় না।

এই একই প্রশ্ন এবার আমি ব্রুনোকে করেছিলাম। ব্রুনো আমাকে উত্তর দিয়েছিল নিরুত্তাপ গলায়, “কেউ কেউ তো মরে যাওয়ার আগেও পচে যায়। বেচেঁ থেকেও স্মৃতিতে পচতে থাকে আজীবন। সে মরে গেলেই কি পচনের গন্ধ মুছে যায়?”

শুনেছি, ব্রুনো সেই উইলটা পুড়িয়ে ফেলেছিল। অসাধারণ হওয়ার নেশা তাকে আর বিত্তশালী হতে দিলো না। জেনিসের সাথে রাত কাটিয়ে, পরদিন জুয়ায় শেষ সম্বল ঘড়িটা খুইয়ে তাকে আবার দেখা গেছে ইবিজার সমুদ্রের কাছে। একটি অসাধারণ ভবঘুরে যুবকের গল্প,

একজন মা হারানো সদ্য হাসনাহেনা ফুলের গন্ধে চোখের জল শুকিয়ে আসা ঘুমন্ত যুবকের গল্প,কিংবা, মৃত্যু নামক শব্দের দুটি রূপের গল্প আজ এই রাতে অন্ধকারে থাকতে থাকতেই শেষ করি। কিছু গল্প অন্ধকারেই থাকুক, আলোতে খুঁজে নিবেন এদের আপনারাই।

প্রবাস বাংলা ভয়েস/ঢাকা/ ০৭ জুলাই ২০২১ /এমএম