Menu

প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক ::  ‘আমাদের নানা মত থাকতে পারে, নানা পথ হতে পারে, তবে জাতীয় প্রেস ক্লাবকে আমাদের গণতান্ত্রিক অবস্থায় রাখতে হবে। এখানে যেমন গণতান্ত্রিক স্রোতধারা বয়ে ছিল জাতির নানা ক্লান্তিকালে, আজও আমাদের সে ধারা রক্ষা করতে হবে।

এখান থেকে যেমন স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন হয়েছে, গণতন্ত্রের জন্য লড়াই-সংগ্রামের দিক-নির্দেশনা এসেছে আমাদের সেটাকে আরও এগিয়ে নিতে হবে। পাশাপাশি আমাদের নানা মত ভুলে পেশাগত দায়িত্বের জায়গাতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, তবেই সংকট, সমস্যা নিরসনে সমাধান আসবে।’

মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের ৬৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘জাতীয় প্রেস ক্লাবের ৬৬ বছর ও বাংলাদেশের সাংবাদিকতা’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব কথা বলেন দেশ বরেণ্য সাংবাদিকরা। তারা আরও বলেন, জাতীয় প্রেস ক্লাবের ঐতিহ্য, সাংবাদিকতার মান, নৈতিকতা ও সাংবাদিকদের আইনি সমস্যার দিকগুলোর দিকে লক্ষ্য রেখে এগিয়ে যেতে হবে।

প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি ও যুগান্তর সম্পাদক সাইফুল আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত। সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন প্রেস ক্লাব সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন, সাবেক সভাপতি এমপি শফিকুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম হেলাল, বাসসের সাবেক এমডি হারুন হাবিব, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সভাপতি মোল্লা জালাল, বিএফইউজের সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল, মহাসচিব আবদুল জলিল ভুইয়া, প্রেস ক্লাবের সিনিয়র সহসভাপতি ওমর ফারুক, সহসভাপতি আজিজুল ইসলাম ভুইয়া, সাবেক সাধারণ সম্পাদক স্বপন কুমার সাহা, কামরুল ইসলাম চৌধুরী, যুগ্ম সম্পাদক শাহেদ চৌধুরী ও মাইনুল আলম, নির্বাহী কমিটির সদস্য জাহিদুজ্জামান ফারুক, কুদ্দুস আফ্রাদ, কল্যান সাহা, ডিইউজে সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুল আলম খান তপু, আশরাফ আলী, ডিইউজের যুগ্ম সম্পাদক খায়রুল আলম, সিনিয়র সাংবাদিক সোহরাব হাসান, শফিকুল করিম সাবু, আলমগীর মহিউদ্দিন, রাশেদ চৌধুরী, পবিত্র কুন্ডু, কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজ, মুফদি আহমেদ প্রমুখ।

অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রবন্ধ পাঠ করেন বাসসের সাবেক এমডি হারুন হাবিব ও বাসসের সাবেক প্রধান সম্পাদক আমানউল্লাহ।এর আগে প্রেস ক্লাব সভাপতি সাইফুল আলমের নেতৃত্বে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান সাংবাদিক নেতারা। সেমিনার শেষে কেক কেটে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর উদ্বোধন করা হয়।

প্রেস ক্লাব সভাপতি বলেন, আমরা সেই উত্তরাধিকার বহন করছি, যা আমাদের গৌরবান্বিত ও মহিমান্বিত করেছে। আমরা বিশ্বাস করি জাতীয় প্রেস ক্লাব বহু মত ও পথের মানুষের এক বহুলৌকিক সমাবেশ ঘটিয়েছে। জাতীয় প্রেস ক্লাব গণতন্ত্র ও সহিষ্ণুতার আধার। অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল সমচেতনার ধারক জাতীয় প্রেস ক্লাব একটি বিশ্বাস এবং আস্থার নাম। কেন মানুষের এই আস্থা প্রতিষ্ঠানটির প্রতি! কেনইবা প্রেস ক্লাবের প্রতি ভরসা এতটা! প্রেস ক্লাব কি অনেক ক্ষমতাধর যে তাদের সমস্যার সমাধান করে দেবে? মানুষ এখনও বিশ্বাস করে, প্রেস ক্লাবের সামনে যাব। মানববন্ধনে দাঁড়াব।

মাইকে দুটি কথা বলব কিংবা অনশন করব এবং দাবি-দাওয়া জানাব। তাদের বিশ্বাস প্রেস ক্লাবে কথা বললে সেই কথা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাবে। অতীতেও প্রেস ক্লাবে অনেক দাবি-দাওয়া উত্থাপন করা হয়েছে সরকার সেই দাবি মেনেও নিয়েছে। সেই বিশ্বাস ও আস্থার জায়গাটা এখনও প্রেস ক্লাব ধরে রেখেছে। আমরা অন্তত এইটুকু দায়বদ্ধার কথা স্বীকার করি যে, আমাদের উত্তরসূরিদের সেই দায়িত্ব পালন করছি। মানুষের সেই বিশ্বাস ও আস্থার জায়গায় এখনও প্রেস ক্লাব আছে।

তিনি বলেন, আজকের ৬৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এইদিন যেমন আনন্দের তেমনি বেদনারও। গত একবছরে জাতীয় প্রেস ক্লাব ১৮ জন সদস্য হারিয়েছে। এই কারণে আমরা গত পরশুদিন স্বরণসভাও করেছি। প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে এ ধরনের নজির নেই। আমরা তা করেছি এই কারণে যে, তাদের বিয়োগ বেদনা খুবই কষ্টের। প্রতি বছরই আমরা উৎসব করি এবছর করোনার কারণে উৎসব নেই।

কিন্তু আমাদের যে ঐক্য, ভালোবাসা, মায়ার টান ও প্রেস ক্লাবের যে বন্ধন তা কিন্তু আগের মতোই আছে। এই ঐক্য, ভালোবাসা, মায়ার টান ও বন্ধনের ধারাটাই অব্যাহত রাখতে চাচ্ছি আমরা। প্রেস ক্লাবের এই ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছি। কিছু ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে, তারপরও আমরা আমাদের প্রতি যে দায়িত্ব তা পালন করার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। আমাদের হয়তো অনেকের পকেট ভারি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু মানুষের আকৃতি হিসেবে আমরা ছোট হয়ে যাচ্ছি। সেই জায়গাটা থেকে আমাদের বের হতে হবে।

আসুন আমরা অঙ্গীকার করি, মাটির ওপর আমরা হাটব মাথা অনেক উচু করে। জাতীয় প্রেস ক্লাবকে আরও মর্যাদাবান করার জন্য সমস্ত গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক আন্দোলনের সমস্ত কিছুর আধার করতে সবাই একসঙ্গে কাজ করব।

প্রেস ক্লাবের জমির দলিল মাত্র ১৫ দিন আগে হাতে পাওয়া গেছে উল্লেখ করে সাইফুল আলম বলেন, প্রেস ক্লাবের এক দশমিক ৯৯ একর জায়গা আছে দুই দলিলের মাধ্যমে। কিন্তু একটি দলিলের ইজারার মেয়াদ ৩০ বছর আগেই শেষ হয়েছে যার খবর আমরা জানতামই না। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত মিডিয়া কমপ্লেক্সের নকশা রাজউকে অনুমোদনের জন্য পেশ করা হলে জানা গেল আমাদের মূল দলিলই নেই।

ইজারার নবায়নও করা হয়নি এবং খাজনাও দেয়া হয়নি। আমরা সেই সমস্যার সমাধান করেছি এবং এখন যে কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারব। আশা করি কম সময়ে বঙ্গবন্ধু মিডিয়া কমপ্লেক্স হবে। এছাড়া প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের ছবি টানানো এবং প্রেস ক্লাবের ইতিহাস সংরক্ষণ সংক্রান্ত প্রস্তাব ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠকে উপস্থাপন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন প্রেস ক্লাব সভাপতি।

সাবেক সভাপতি শফিকুর রহমান এমপি বলেন, সংবাদপত্রের পরিসর বাড়লেও সাংবাদিকতার মান কিন্তু বাড়েনি। পত্রিকাগুলোতে এখন গল্প লেখা হচ্ছে। সাংবাদিকদের যোগ্যতার উত্তরণ ঘটাতে হবে। ভালো মানের সাংবাদিক হতে হলে প্রচুর বই পড়া এবং লেখাপড়া করতে হবে।

বিএফইউজে সভাপতি মোল্লা জালাল বলেন, সাংবাদিকতা কোনো বায়বীয় জিনিস নয়, এটি আমাদের পেশা। আমাদের মর্যাদা আইনের দ্বারা নির্ধারিত হয়। এখানে অনেক সমস্যা আছে এ ব্যাপারে আমাদের সোচ্চার হতে হবে। আইনের ভিত্তি নির্ধারণ না হলে পেশার জন্য নয় শুধু নেতৃত্বের জন্য ৯২ সালে ইউনিয়ন বিভক্ত হয়েছে। নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্বে সাংবাদিকদের সংকট চলছে। আমাদের দেশের সাংবাদিকরা এত ধনী, টাকার মালিক যা ইউরোপ-আমেরিকাতেও নেই।

আবার আমাদের দেশের সাংবাদিকরা এত অসহায়, অর্থ সংকটে থাকেন যা আফ্রিকার কোনো দেশে নেই। এসবের কারণ এখানে সমন্বয়হীনতার অভাব রয়েছে, নেতৃত্বের লোভ রয়েছে। আমরা কেন এত দলে বিভক্ত হব, আমাদের বিভক্তের কারণে আমরা মালিকপক্ষকে তেমন চাপ দিতে পারি না। আবার সরকারও চায় গণমাধ্যম শক্তিশালী না হোক, সেটা যে সরকারই হোক না কেন। আমাদের ঐক্য প্রয়োজন যার মাধ্যমে আমরা সবাই সবাইকে সহযোগিতা করতে পারি।

মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, জাতীয় প্রেস ক্লাব বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন, স্বাধীন বাংলাদেশ ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় উপত্যকার মতো। সারা দেশে যখন স্বৈরতন্ত্রে নিমজ্জিত ছিল তখন এই প্রেস ক্লাবেই গণতন্ত্রের চর্চা হতো। আগে আমরা দেখতাম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নড়বড়ে তবে শিক্ষা ছিল শক্তিশালী, এখন তার বিপরিত ঘটছে।

একই অবস্থা সাংবাদিকতার, গণমাধ্যমের প্রসার ঘটলেও আগের সাংবাদিকতা বা নৈতিকতা নেই। আমাদের প্রিন্ট মিডিয়ার একটা ওয়েজবোর্ড থাকলেও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া কোম্পানির অধীনে। সেখানে আজ কারও চাকরি চলে গেলে কোম্পানি আইনে তার শূন্য হাতে ফিরতে হয়, এটা আমাদের দেখা উচিত। এক সময় গণতন্ত্রের ধারা এখান থেকেই প্রবাহিত হতো নানা মত থাকা সত্ত্বেও।

আমাদের সেটা ধরে রাখতে হবে, আস্থার জায়গাটা আরও শক্ত করতে হবে। আমাদের ভিন্নমত থাকতেই পারে, কিন্তু প্রেস ক্লাবে গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত থাকবে। তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের ইতিহাস রচনা এবং প্রতিষ্ঠা সদস্যদের পরিচিতি দৃষ্টিনন্দন জায়গায় উপস্থাপনের দুটি প্রস্তাব তুলে ধরেন।

প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, আমরা এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী একটা স্মরণ সভার মাধ্যমে শুরু করেছি যেটা অত্যন্ত কষ্টের। করোনার কারণে আমরা আমাদের ১৮ জনকে হারিয়েছি। এখানে আমাদের মিলন ঘটত, সবাই সবাইকে সম্মানের চোখে দেখত। এখনও আস্থার জায়গাতে কোনো ভাঁজ পড়েনি এখানে, নারী-পুরুষে কোনো ভেদাভেদ নেই ক্লাবে। তবে আমরা স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব বিষয় নিয়ে কোনো দিন আপস করিনি আর করতেও চাই না।

হারুন হাবীব বলেন, সাংবাদিকতার পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হলে অবশ্যই আমাদের নিজেদের অধিকতর যোগ্য করে তুলি, মহান পেশাকে মহিমান্বিত করি, এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে স্বমর্যাদায় সামনে এগিয়ে নেই। আমরা যেন আদর্শিক হই, রাজনীতির সহনশীল সংস্কৃতি ধারণ করে সমাজকে উত্তরোত্তর প্রগতিশীলতার দিকে ধাবিত করি।

ডিইউজের সভাপতি ও প্রেস ক্লাব ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য কুদ্দুস আফ্রাদ বলেন, মানুষের আস্থার জায়গায় আছে জাতীয় প্রেস ক্লাব। এ কারণেই তারা এখানে আসেন। এটি আমাদের সাফল্য। এটি টিকিয়ে রাখতে হবে। সাংবাদিকতার ভিত মজবুত করতে হলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

প্রবাস বাংলা ভয়েস/ঢাকা/ ২১ অক্টোবর ২০২০/এমএম