প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক :: ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণে শীতকালে শিশুরা সর্দি-কাশি, জ্বরে আক্রান্ত হয়ে থাকে। এ সময়ে ভাইরাসজনিত গলা ব্যথা ও ভাইরাসজনিত উদরাময়-ডায়রিয়ার প্রকোপও দেখা দেয়। এ সময় শিশুকে সুস্থ রাখার করণীয় সম্বদ্ধে জানাচ্ছেন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী
ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণে শীতকালে শিশু সর্দি-কাশি, জ্বর, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। শীতে সাধারণভাবে শিশু ভাইরাসজনিত রোগ যেমন—ইনফ্লুয়েঞ্জা, রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাসজনিত শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, ভাইরাসজনিত ডায়রিয়া ও গলা ব্যথা ইত্যাদি অসুখের শিকার হয়। তবে সচেতন থাকলে শিশু বয়সে এসব রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
ইনফ্লুয়েঞ্জা (ফ্লু)
ফ্লু কখনো সখনো গুরুতর অসুস্থতার কারণ হতে পারে। বিশেষত অ্যাজমা, হার্টের জন্ম ত্রুটি বা রোগ প্রতিরোধ শক্তিতে দুর্বল শিশুদের ক্ষেত্রে। প্রধান উপসর্গ হলো—তীব্র কাশি, বমি ও জ্বর। এর অধুনা চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধ, ফ্লু ভ্যাকসিনের ভূমিকা স্বীকৃত।
রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস (আরএসভি) জনিত সংক্রমণ শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে এই রোগ বেশি দেখা যায়। গলা ব্যথা, নাক বন্ধ এবং ছোট শিশুদের কাশি, শ্বাসে সাঁই সাঁই শব্দ—এসব হলো রোগের উপসর্গ। শিশু নিউমোনিয়ার লক্ষণ নিয়ে হাজির হয়। ব্যবস্থাপনায় নতুন অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধের কার্যকর ব্যবহার লক্ষণীয়।
স্ট্রেপটোকক্কালজনিত ফ্যারিনজাইটিস (স্ট্রেপথ্রোট) গলা ব্যথা উপসর্গই মুখ্য। তবে এই গলা ব্যথা ব্যাকটেরিয়া, না ভাইরাসজনিত তা নির্ণয়ে গলা থেকে তরল (থ্রোট সোয়াব) নিয়ে পরীক্ষা করাতে হয়। গলা ব্যথা অসুখের উপসর্গ শুধু ১৫-২৫ শতাংশ ব্যাকটেরিয়াজনিত কারণে হয়ে থাকে। বেশির ভাগই ভাইরাস সংক্রমণজাত, ফলে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রয়োজন থাকে না। তবে ব্যাকটেরিয়াজনিত স্ট্রেপ-থ্রোট অবশ্যই অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগে চিকিত্সা করাতে হয়, তা শিশুকে বাতজ্বরে ভোগা থেকে সুরক্ষা দেয়।
উদরাময়
শীতে শিশু রোটাভাইরাস ও অন্যান্য আন্ত্রিক জীবাণুর সংস্রবে বমি, ডায়রিয়া নিয়ে হাজির হয়।
শিশু যাতে পানিস্বল্পতায় না পড়ে, সে জন্য ডায়রিয়া বা বমির প্রথম থেকেই খাবার স্যালাইন খাওয়ানো শুরু করা উচিত। সঙ্গে বুকের দুধ পান ও স্বাভাবিক খাবার খাওয়ানো অব্যাহত রাখা। শিশুর রোটাভাইরাসজনিত ডায়রিয়া প্রতিরোধে দেড় মাস বয়স থেকে মুখে খাওয়ার টিকাদান কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
ব্রংকিওলাইটিস
শীতকালে সাধারণত ভাইরাসজনিত সংক্রমণের কারণে এই রোগের সূচনা। এটা মূলত দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের অসুখ। তিন থেকে ছয় মাস বয়সে এই রোগের প্রকোপ বেশি। ব্রংকিওলাইটিস অসুখে ফুসফুসে জালিকার মতো ছড়িয়ে থাকা বায়ু চলাচলের নালিগুলোর প্রদাহ ঘটে। উপসর্গাদির মধ্যে আছে নাকবন্ধ ভাব, নাক দিয়ে জল ঝরা, সামান্য কাশি ও জ্বর। এসব উপসর্গ এক থেকে দুই দিন স্থায়ী হয়। পরবর্তী সময়ে কাশির মাত্রা বাড়ে, শ্বাসে শাঁই শাঁই শব্দ শোনা যায়। শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে ঘাড় ও বুকের নিচের অংশের মাংসপেশি দেবে যায়, নাসারন্ধ্রের দুই পাশ ওঠানামা করতে থাকে। শিশু সব কিছু বমি করে দেয়। পানিস্বল্পতাজনিত সমস্যার সৃষ্টি হয়। শিশু খুব অস্থির, খিটখিটে, ক্লান্ত বা নিস্তেজ হয়ে পড়ে। ঠোঁট-নখ নীলচে বর্ণ ধারণ করতে পারে।
শিশুর নিউমোনিয়া : বোঝার উপায়
শিশু কাশি বা শ্বাস-প্রশ্বাসের অসুবিধা নিয়ে এলে কয়েকটি লক্ষণ পরীক্ষা করে দেখতে হবে।
দ্রুত শ্বাসহার:
⬤ দুই মাসের নিচের বয়সে প্রতি মিনিটে ৬০ বা বেশি।
⬤ দুই মাস থেকে এক বছর বয়সে ৫০ বা বেশি।
⬤ এক থেকে পাঁচ বছর বয়সে প্রতি মিনিটে ৪০ বা তার বেশি হলে।
মারাত্মক নিউমোনিয়ার বিপজ্জনক লক্ষণ
⬤ বুকের দুধ পানরত বা ঘুমানো বা শান্ত অবস্থায় যদি শিশুর বুকের নিচের অংশ ভেতরের দিকে দেবে যায়।
⬤ শিশু ভালোভাবে খাচ্ছে না, বুকের দুধ পানে অসমর্থ।
⬤ কষ্টকর শ্বাস-প্রশ্বাস, হেড নোডিং— মাথা দুলে দুলে ওঠা।
⬤ শিশু কেমন যেন নিস্তেজ।
⬤ জিহ্বা, ঠোঁট নীলচে বর্ণের।
⬤ কম অক্সিজেন স্যাচুরেশন, বিশেষত ৯২ শতাংশের নিচে থাকলে।
চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা
⬤ বুকের দুধ পানরত শিশুর ঘন ঘন বুকের দুধ চালিয়ে যাওয়া।
⬤ ছয় মাস বয়স থেকে শিশুকে নিয়মমাফিক ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়াতে হবে।
⬤ স্বাভাবিক খাবার ও বেশি বেশি তরল খাবার ও পানীয় পান করানো।
⬤ নিরাপদ উপায়ে কাশি প্রশমনে তুলসী পাতার রস, নিরাপদ মধু, লেবু মিশ্রিত পানি খাওয়ানো।
⬤ বিশ্রাম, লবণ জলের গর্গরা।
⬤ জ্বর ও শিরঃপীড়া উপশমে প্যারাসিটামল।
⬤ শিশুর মারাত্মক নিউমোনিয়ার বিপজ্জনক লক্ষণ দেখা গেলে ত্বরিত হাসপাতালে পাঠানো। এ ধরনের আক্রান্ত শিশুকে অক্সিজেন, শিরায়/মাংসপেশিতে অ্যান্টিবায়োটিকস, শিরায় স্যালাইন ও মনিটরিং ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন থাকে।
প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাদি
⬤ শিশুকে সময়মতো ও নিয়মিত টিকা প্রদান। ইপিআই শিডিউলে থাকা পিসিভি, ডিপিটি-হিব, এম আর টিকা শিশুর নিউমোনিয়া প্রতিরোধে সুরক্ষা দেয়।
⬤ শিশুর অপুষ্টি রোধে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধু মায়ের দুধ পান, ন্যূনতম দুই বছর বয়স পর্যন্ত বুকের দুধ পান চালিয়ে যাওয়া এবং ছয় মাস বয়স থেকে সুষম পরিপূরক খাবার প্রদান। ফিডার-বোতলে না খাওয়ানো।
⬤ শিশুকে ধূমপানমুক্ত, আলো-বাতাসপূর্ণ, ঘিঞ্জিবিহীন পরিবেশে রাখা।
⬤ বারবার হাত ধোয়ার অভ্যাস রপ্ত করানো।
⬤ অসুস্থ ব্যক্তির হাঁচি, কাশি বা ব্যবহূত টিস্যু, খেলনা ইত্যাদি থেকে শিশুদের দূরে রাখা।
⬤ জ্বরের সাসপেনশন (প্যারাসিটামল) ও খাবার স্যালাইনের প্যাকেট ঘরে রাখা।
⬤ দ্রুত অসুস্থ হয়ে গেলে কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে, তা আগেভাগে বিবেচনায় রাখা।
⬤ বেশির ভাগ শীতকালীন অসুখ স্বল্প সময়ের। শিশু তা থেকে আপনা-আপনি সেরে ওঠে। এ সময় শিশুর সঙ্গে মিলে একসঙ্গে বই পড়া, গান শোনা বা গাওয়া উচিত। তা শিশুর মনোবল অটুট রাখে, তার রোগ প্রতিরোধক শক্তির উজ্জীবন ঘটায়।
প্রবাস বাংলা ভয়েস /ঢাকা/ ১৯ ডিসেম্বর ২০২৩ /এমএম





