নীলুফা আলমগীর :: যাকাত ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের একটি স্তম্ভ। আরবি শব্দ যাকাত অর্থ পরিচ্ছন্নতা বা পরিশুদ্ধতা। প্রতেক স্বাধীন পূর্ণবয়স্ক মুসলমান নর-নারীকে প্রতি বছর নিজের আয় ও সম্পত্তির একটি নির্দিষ্ট অংশ, যদি তা ইসলামী শরিয়ত নির্ধারিত সীমা (নিসাব পরিমাণ) অতিক্রম করে তবে তা গরিব- দুঃখীদের মধ্যে বিতরণের নিয়মকে যাকাত বলা হয়। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় জীবন যাত্রার অপরিহার্য প্রয়োজন পুরণের পর সম্পদ পূর্ণ এক বছরকাল অতিক্রম করলে ঐ সম্পদ থেকে নির্দিষ্ট অংশ আল্লাহর নির্ধারিত খাতে ব্যয় করাকে যাকাত বলা হয়। যাকাত আদায় করা স্বচ্ছল মুসলমানের প্রতি সৃষ্টিকর্তার এক অলঙ্ঘনীয় নির্দেশ।
ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী বাৎসরিক আয়ের ২.৫% যাকাত দিতে হয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের হিসাব অনুসারে যাকাতের পরিমাণ হচ্ছে ৭.৫ তোলা স্বর্ণ কিম্বা ৫২.৫ তোলা রৌপ্য অথবা এর সমপরিমাণ অর্থ।
পবিত্র কোরআন শরিফের বিভিন্ন সুরায় যাকাতের গুরুত্ব বর্ণনা করা হয়েছে।
“তোমরা নামাজ কায়েম কর, যাকাত দাও এবং রাসুলের আনুগত্য কর, যাতে তোমরা অনুগ্রহ-ভাজন হতে পার।” (সুরা নূর-৫৬)
“তোমরা সালাত আদায় কর এবং যাকাত দাও। তোমরা নিজের জন্য আগে যে সৎকর্ম প্রেরণ করবে, তা আল্লাহর কাছে পাবে। তোমরা যা কিছু কর, নিশ্চয় আল্লাহ তা প্রত্যক্ষ করেন। ” (সুরা বাকারা-১১০)
“হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের বৈধ উপার্জন এবং আমি তোমাদের জন্য ভূমি থেকে যে শস্য উৎপন্ন করি তা থেকে আল্লাহর নির্দেশিত পথে ব্যয় কর।” (সূরা বাক্বারা- ২৬৭)
“যারা সালাত আদায় করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও পরকালে ঈমান রাখে আমি তাদেরকে মহাপুরষ্কার দিব।” (সুরা নিসা-১৬২)
“তাদের সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করুন, যার দ্বারা আপনি তাদেরকে পবিত্র করবেন এবং পরিশোধিত করবেন, আপনি তাদের জন্য দোয়া করবেন। আপনার দোয়াতো তাদের জন্য চিত্ত স্বস্তিকর। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” (সুরা তাওবা-১০৩)
পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন শরিফে যাকাত শব্দটি ৩২ বার উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে হজ্ব এবং যাকাত শুধুমাত্র শর্তসাপেক্ষে সম্পদশালীদের জন্য আবশ্যিক করা হয়েছে। কিছু মুসলিম দেশে যাকাত আবশ্যিক হলেও বাংলাদেশে যাকাত ঐচ্ছিক। শরিয়ত মোতাবেক নিম্নলিখিত ব্যক্তিগন যাকাত পাওয়ার জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হয়।
১) ফকির যার নিসাব পরিমাণ সম্পদ নেই
২) মিসকিন বা নিঃস্ব ব্যক্তি যার কাছে এক বেলা খাবারও নেই।
৩) ঋণগ্রস্ত মুসলিম
৪) অসহায় মুসাফির
৫) যাকাত উত্তোলন, সংরক্ষণ ও বন্টণের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ
৬) ইসলাম গ্রহণ করতে ইচ্ছুক অমুসলিম
৭) নতুন মুসলিম যার ঈমান এখনো পরিপক্ক হয়নি
৮) ক্রীতদাস এবং বন্দী মুক্তির জন্য।
যাকাতের শর্তসমূহঃ স্বাধীন, পূর্ণবয়স্ক মুসলিম নর-নারীর কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে কতিপয় শর্তসাপেক্ষে তার উপর যাকাত ফরজ হয়ে থাকে।
১) সম্পদের উপর পূর্ণ মালিকানা
সম্পদের উপর যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য সম্পদের মালিকানা সুনির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন। যে সমস্ত সম্পদের মালিকানা সুস্পষ্ট নয়, সে সকল সম্পদের কোন যাকাত নেই, যেমনঃ সরকারি মালিকানাধীন সম্পত্তি, জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য ওয়াক্ফকৃত সম্পদের উপর যাকাত ধার্য হবে না। তবে ওয়াক্ফ যদি কোন ব্যক্তি বা গোত্রের জন্য হয়, তবে তার উপর যাকাত দিতে হবে।
২) সম্পদের উৎপাদনক্ষম হওয়া
যাকাতের জন্য সম্পদকে উৎপাদনক্ষম হতে হবে। যেমন, গরু, মহিষ, ব্যবসায়ের মাল, নগত অর্থ।
যে সমস্ত মালামাল নিজের প্রবৃদ্ধি সাধনে সক্ষম নয় সেসবের উপর যাকাত ধার্য হবে না। যেমনঃ ব্যক্তিগত ব্যবহারের মালামাল, চলাচলের বাহন।
৩) মৌলিক প্রয়োজনাতিরিক্ত সম্পদ থাকা
সারা বছরের মৌলিক প্রয়োজন মিটিয়ে যে সম্পদ উদ্বৃত্ত থাকবে, শুধুমাত্র তার উপরই যাকাত ফরজ হবে।
৪) ঋণমুক্ততা
যদি সম্পদের মালিক এত পরিমাণ ঋণগ্রস্থ হন যা, নিসাব পরিমাণ সম্পদ তার চেয়ে কম।
৫) সম্পদ এক বছর আয়ত্তাধীন থাকা
নিসাব পরিমাণ সম্পদ এক বছর নিজ আয়ত্তাধীন থাকা যাকাত ওয়াজিব হওয়ার পূর্বশর্ত।
বিশেষ ক্ষেত্রে যাকাতঃ
১) অপ্রাপ্তবয়স্ক ও পাগলের যাকাত
সম্পদের মালিক অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে তার যাকাত তার আইনানুগ অভিভাবককে আদায় করতে হবে।
২) যৌথ মালিকানাধীন সম্পত্তির যাকাত
কোন সম্পদের যৌথ মালিকানা থাকলে সম্পদের প্রতেক অংশীদার তাদের স্ব স্ব অংশের উপরে যাকাত দেবেন, যদি তা নিসার পরিমাণ বা তার অতিরিক্ত হয়।
৩) নির্ধারিত যাকাত
যাকাত নির্ধারিত হওয়া স্বত্তেও পরিশোধের আগেই সম্পদের মালিকের মৃত্যু হলে তার উত্তরাধিকারগণ অথবা তার তত্ত্বাবধায়ক তার সম্পত্তি থেকে যাকাত দেবেন।
৪) তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে ন্যস্ত সম্পদের যাকাত
মালিকের পক্ষ থেকে নিযুক্ত আইনানুগ তত্ত্বাবধায়কের কাছে সম্পত্তি ন্যস্ত থাকলে মালিকের পক্ষে উক্ত তত্ত্বাবধায়ক যাকাত পরিশোধ করবেন।
৫) বিদেশস্থ সম্পদের যাকাত
যাকাত ওয়াজিব হওয়ার কারণে সম্পত্তি অন্য দেশে থাকলেও তার উপর যাকাত দিতে হবে।
যাদেরকে যাকাত দেয়া যাবে নাঃ
১) নিসাব পরিমান মালের অধিকারী বা ধনী ব্যক্তি
২) সম্পদশালী নাবালক পুত্র-কন্যা
৩) কুরাইশ গোত্রের বনু-হাশিম এর অন্তর্গত আব্বাস, জাফর,আকীল (রাঃ) এর বংশধর
৪) অমুসলিম ব্যক্তি
৫) যে সব প্রতিষ্ঠানে ধনী-গরীব সবাই সেবা পায়
৬) দরিদ্র পিতা-মাতা, সন্তান, দাদা-দাদী, নানা-নানী, স্বামী-স্ত্রী
৭) প্রতিষ্ঠানের বেতনভুক্ত কর্মচারী
8) উপার্জনক্ষম ব্যক্তি যদি উপার্জন ছেড়ে দিয়ে নামাজ-রোজা ইত্যাদি নফল ইবাদতে মশগুল থাকে।
৯) উপার্জনক্ষম অলস ব্যক্তি
১০) নিজ চাকর-চাকরানীকে যাকাতের টাকায় বেতন-ভাতা দেয়া যাবে না।
অতএব, যাকাত হচ্ছে বরকত,পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা, শুদ্ধতা- সুসংবদ্ধতার সম্মিলন। যাকাত একে অপরের প্রতি সহানুভূতি বৃদ্ধি ও সমাজের ভ্রাতৃত্ববোধ গঠনে এক অনন্যসাধারণ ভূমিকা পালন করে থাকে। দরিদ্রতা বিশ্বমানবতার প্রধান সমস্যা। সমাজ থেকে স্থায়ীভাবে দরিদ্রতা দূর করার জন্যই ইসলাম যাকাত ব্যবস্থা চালু করেছে। একদিকে যাকাত প্রদান ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত, আবার অন্যদিকে যাকাত হচ্ছে দারিদ্র বিমোচনের স্থায়ী ও চিরন্তন বিধান। যাকাত বিত্তবান ও বিত্তহীনের মাঝে সেতু বন্ধন তৈরী করে। আসুন আমরা এই রমজান মাস এবং আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে সবাই অসহায় গরীব-দুঃখীদের মাঝে আমাদের বাড়তি আয়ের অংশ বিলিয়ে দিয়ে ওদের আনন্দের সাথে আমাদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেই।
বাংলানিউজসিএ/ঢাকা/ ২৬ মে ২০১৯/ইএন