প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক :: বুয়েট শিক্ষার্থী ফারদিন আত্মহত্যা করেছে দাবি করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের দেওয়া বক্তব্যের পর এসব দাবির স্বপক্ষে র্যাব এবং ডিবি বুয়েট শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন তথ্য প্রমাণাদি দেখিয়েছে। এতে মোটামুটি সন্তোষজনক উত্তর পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) শিক্ষার্থীরা।শনিবার সন্ধ্যায় বুয়েটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সংবাদ সম্মেলন করে এ কথা জানান বুয়েট শিক্ষার্থীরা। একইসঙ্গে ফারদিন হত্যা নিয়ে কর্মসূচি আপাতত স্থগিত ঘোষণা করেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা জানায়, ডিবির কাছে করা তাদের প্রথম প্রশ্ন ছিল—ময়নাতদন্তের পর চিকিৎসক জানিয়েছিলেন, ফারদিনের বুকে ও মাথায় অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন ছিল। তবে এখন কীভাবে আত্মহত্যার আলাপ এলো?প্রশ্নের উত্তরে ডিবি তাদের জানায়, ডাক্তারের সঙ্গে তারা কথা বলেছেন। ডাক্তার তাদের বলেছেন, এই আঘাতের ধরনটা অনেকটা কিল-ঘুষির মতো। এখানে কোনো কাটাছেঁড়ার বিষয় ছিল না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটা ছিল রক্ত জমাট বাঁধার মতো। জামা কাপড় ছিঁড়ে যায়নি। ডাক্তার বলেন, উপর থেকে লাফ দেওয়া হয় যদি, তবে স্রোতের ধাক্কায় স্প্যানে ধাক্কা খেয়ে কিংবা পানিতে লাফ দেওয়ার কারণেও এই ধরনের আঘাতের চিহ্ন আসতে পারে। সুতরাং, ওই চিহ্নের উপর ভিত্তি করে ডাক্তারও বলছেন যে, এটা যে আত্মহত্যা নয়, তা শতভাগ নিশ্চিত হয়ে বলা যায় না।
ডিবির কাছে করা তাদের দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিলো—সিসিটিভি ফুটেজ থেকে ডিবি যে দাবি করছিলো, সেই লোকটাই ফারদিন, এর ভিত্তি কোথায়?
জবাবে ডিবি জানায়, ফারদিনের শেষ কন্ট্রাক্ট পাওয়া গেছে, যাত্রাবাড়ি থেকে লেগুনায় উঠতে দেখা যায় ফারদিনকে। সেই লেগুনা তাকে তারাবোর দিকে অর্থাৎ সুলতানা কামাল ব্রিজের অপজিট পাশে নামিয়ে দেয়। ফারদিনের লোকেশন, ওই লেগুনা ড্রাইভারের লোকেশন—এগুলো ক্রসচেক করে ডিবি প্রমাণ পেয়েছে যে, বিষয়টি সত্য। ফারদিন যে জায়গা থেকে লাফ দেয়, সেই জায়গা থেকেই তার লোকেশন ট্র্যাক করা হয়। ডিবি মনে করছে, ওই একই সময়ে, একই জায়গা থেকে অন্য একজনের লাফ দেওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। এ ছাড়া, ওই সময়ের পরই ফারদিনের মোবাইল অফ হয়ে যায়। এর ১৫-২০ মিনিট পর ফারদিনের হাতঘড়িও বন্ধ হয়ে যায়।
ডিবির কাছে করা শিক্ষার্থীদের তৃতীয় প্রশ্ন ছিলো—ফারদিন যে সেদিন বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছিলেন, তার কোনো সলিড প্রমাণ আছে কি না?
জবাবে ডিবি জানায়, ওইদিন রাত ১০টা ৪৫ থেকে ১১টা ৯ মিনিট পর্যন্ত বুয়েটের একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে ফারদিনের কথা হয়। সেই কথোপকথনের সময় ফারদিনকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বলে মনে হয়েছে। ট্র্যাক করা তথ্য বলছে, ওই সময় ফারদিন ছিলো জনসন রোডে। অর্থাৎ, ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর যে ট্র্যাকটা আমরা দেখেছি, ওই সময়টার মধ্যেই সেটি ছিলো। ঘুরতে ঘুরতেই সে ফোনে কথা বলেছে এবং কথার মধ্যে কোনো অস্বাভাবিক কিছু পাওয়া যায়নি।
এরপর ১টা ৫৭ থেকে ১টা ৫৯ পর্যন্ত তার একজন বন্ধুর সঙ্গে মেসেঞ্জারে কথা হয়। সেই বন্ধুর চ্যাট দেখে সেখানেও অস্বাভাবিক কিছু পাওয়া যায়নি।
শিক্ষার্থীদের চতুর্থ প্রশ্ন ছিলো—লেগুনা ড্রাইভার কতদিন আগে ফারদিনকে নামিয়ে দিয়েছিলো, তা সে কীভাবে মনে রেখেছে?
উত্তরে ডিবি জানায়, ওই লেগুনা ড্রাইভারকে আটকের আগে পুলিশ তাকে নজরদারির মধ্যে রেখেছিলো। প্রথমত, তার মধ্যে কোনো অস্বাভাবিক আচরণ পাওয়া যায়নি। দ্বিতীয়ত, আটকের পর লেগুনা ড্রাইভার ঠিক কতজন নিয়ে যাত্রা করেছিলো, সে ব্যাপারে হুবহু কিছু বলতে পারেনি। কারণ, ঘটনা অনেকদিন আগের। তবে সে বলেছে, মোটামুটি ৫/৬ জন ছিলো। তারাবোর ওইখানে, অর্থাৎ ব্রিজের ওই পাড়ে বাজারের কাছে অল্পদুরত্বের দুটো ভিন্ন স্থানে দুইজনকে নামিয়ে দেয়। ডিবির ধারণা, ওই দুইজনের একজন ফারদিন। একারণে লেগুনা ড্রাইভারের সাক্ষ্যকে তারা খুব বেশি একটা সন্দেহ করছে না। লেগুনা ড্রাইভারের কথার সঙ্গে টাইমিং পুরোপুরি মিলে গেছে।
ডিবির কাছে করা শিক্ষার্থীদের পঞ্চম ও সর্বশেষ প্রশ্ন ছিলো—মাদক, চনপাড়া বস্তিসহ বিভিন্ন ঘটনা যে সামনে আসলো, এগুলোর ভিত্তি কী?
শিক্ষার্থীরা জানায়, তারা মূলত ডিবির কাছে এই পয়েন্টে প্রশ্ন করার সুযোগ পায়নি। কারণ, এই বিষয়গুলো নিয়ে ডিবি থেকে আগে কিছু জানানো হয়নি। পরে র্যাবের কাছে যাওয়ার পর এইগুলো নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ হয়।
র্যাব জানায়, তারা যখন প্রথম তদন্ত করা শুরু করে, তখন ৩টি জায়গা থেকে তদন্ত শুরু করে। ১. পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড কি না ২. দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু কি না ৩. আত্মহত্যা কি না। তদন্ত শুরু করার পর ফারদিনের রবি সিমের নম্বর ট্র্যাক করে যে এমন একটি সেলে তার লোকেশন কানেক্ট হয়যায়, যা মূলত চনপাড়ার বেশিরভাগ এলাকা এবং সুলতানা কামাল ব্রিজের অংশবিশেষ কাভার করে। ওইসব ভিত্তিতে র্যাব চনপাড়া এলাকা টার্গেট করে। ওই সময়, চনপাড়া থেকে অনেক সন্ত্রাসীরা এসে দাবি করে, তারা ফারদিনকে হত্যা করেছে। সেই জায়গা থেকে র্যাব তাদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। সেক্ষেত্রে র্যাব তদন্ত করে কিছু না পেলে, সুলতানা কামাল ব্রিজ সংলগ্ন এলাকার দিকে ফোকাস করে।
প্রবাস বাংলা ভয়েস/ঢাকা/ ১৭ ডিসেম্বর ২০২২ /এমএম





