প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক :: সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের আলোকে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া রোববার শুরু হয়েছে। ৩০ কার্যদিসের জন্য তৈরি করা হয়েছে এই সিলেবাস। এতে পাঠ্যবই থেকে পাঠ নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। বাড়িতে বসে নির্ধারিত পাঠ থেকে শিক্ষার্থীরা বিষয়ভিত্তিক ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ (কাজ) করে নিজের শিক্ষকের কাছে জমা দেবে। শিক্ষকেরা তা মূল্যায়ন করবে। তবে এর উপর শিক্ষার্থীর পরবর্তীতে শ্রেণিতে উত্তীর্ণ-অনুত্তীর্ণ হওয়া নির্ভর করবে না।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সদস্য (কারিকুলাম) অধ্যাপক ড. মশিউজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, এই সিলেবাস তৈরির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীকে শ্রেণি ও বয়স অনুযায়ী শিখন সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা দেয়া। করোনা মহামারীর কারণে শ্রেণির কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। বাড়িতে নিজেরা নির্ধারিত পাঠগুলো পড়ার পর শিক্ষকের দেয়া অ্যাসাইনমেন্ট করে জমা দেবে। মাধ্যমিকের পাশাপাশি মাদ্রাসা এবং কারিগরি স্তরের জন্যও সংক্ষিপ্ত সিলেবাস করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অধিদফতরগুলো তা বাস্তবায়ন করছে। গত ১৭ মার্চ দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
১৪ নভেম্বর পর্যন্ত এই ছুটি আছে। এই বাস্তবায়তায় বন্ধ আছে শিক্ষার্থীর প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক সরাসরি পাঠদান। এ কারণে সেপ্টেম্বরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার লক্ষ্যে এনসিটিবি তিনটি পরিকল্পনা তৈরি করেছিল। ৭৩, ৫০ এবং ৩০টি কার্যদিবস ধরে তৈরি করা সেসব পরিকল্পনায় ডিসেম্বরে লেখাপড়া শেষ করে ১ জানুয়ারি নতুন বছরের শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর করার মতো পাঠ নির্ধারিত ছিল। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় সরকার বার্ষিক পরীক্ষা বাতিল করেছে। তবে শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয় শিখনের দিক সমুন্নত রাখতে অ্যাসাইনমেন্ট প্রবর্তন করেছে। এজন্য উল্লিখিত তিন বিকল্পের মধ্যে শেষেরটিই শিক্ষা মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করছে বলে এনসিটিবি সূত্র জানিয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) শনিবার বিষয়ভিত্তিক ও শ্রেণি অনুযায়ী পাঠপরিকল্পনা প্রকাশ করে। এতে শিক্ষকের জন্য ৭টি নির্দেশনা আছে। সেগুলো হচ্ছে শিক্ষার্থীকে প্রতি সপ্তাহে ৩টি করে অ্যাসাইনমেন্ট দিতে হবে; নির্ধারিত বিষয়ের প্রস্তাবিত অ্যাসাইনমেন্ট জমা নেয়া, মূল্যায়ন, পরীক্ষকের মন্তব্যসহ শিক্ষার্থীকে দেখানো এবং পরে প্রতিষ্ঠানে সেটি সংরক্ষণ করার কাজ ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করতে হবে; এই কার্যক্রমে প্রতিটি শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে; তারা সাদা কাগজে লিখে জমা দেবে; অ্যাসাইনমেন্টের আওতায় ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন, সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন, সৃজনশীল প্রশ্ন, প্রতিবেদন প্রণয়ন ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত আছে; অভিভাবক বা তার প্রতিনিধি স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে প্রতি সপ্তাহে একদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অ্যাসাইনমেন্ট সংগ্রহ করবেন এবং জমা দেবেন। মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. এসএম গোলাম ফারুক যুগান্তরকে বলেন, সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের পাশাপাশি শিক্ষক, শিক্ষা কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের জন্য নির্দেশনা প্রকাশ করা হয়েছে। সেটির আলোকে তারা সরকারের এই শিক্ষাদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবেন।
এনসিটিবির সদস্য অধ্যাপক মশিউজ্জামান বলেন, সংক্ষিপ্ত সিলেবাস তৈরির ক্ষেত্রে তিনটি দিক বিবেচনা করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে, যেসব পাঠ আগের শ্রেণিতে শিক্ষার্থী পড়ে এবং পরের শ্রেণির পাঠের জন্য দরকার নেই তা বাদ দেয়া হয়েছে। যে পাঠ পরের শ্রেণিতে পাবে কিন্তু শিক্ষার্থীর জানা দরকার তা রাখা হয়েছে। আর যা পরে দরকার আগে পড়েনি তাও রাখা হয়েছে।
তবে শেষেরটির ক্ষেত্রে শিক্ষকের প্রতি নির্দেশনা থাকবে যে, পরের শ্রেণিতে ধারাবাহিকভাবে পড়ানোর আগে আগের ক্লাসের পাঠের ওপর আগামী বছর সংক্ষিপ্ত পূর্ব-ধারণা দেবেন। এই নির্দেশনা আগামী বছরের শিক্ষক গাইডে থাকবে। এনসিটিবির বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের বিশেষজ্ঞ এবং প্রতি বিষয়ে দু’জন করে শ্রেণি শিক্ষকের একটি করে দল বিষয়ভিত্তিক এই পরিকল্পনা তৈরি করেছে।
অ্যাসাইনমেন্ট গ্রিড : ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটিতে ১৮টি করে অ্যাসাইনমেন্ট দিতে হবে। এর মধ্যে বাংলা, কৃষি/গার্হস্থ্য, ধর্ম ও নৈতিকতা, বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়ে ২টি, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান বিষয়ে ৩টি এবং আইসিটিতে একটি অ্যাসাইনমেন্ট করতে হবে। নবম শ্রেণিতে বাংলায় ২টি, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান বা বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়, পদার্থ, ভূগোল, হিসাববিজ্ঞান, রসায়ন, বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা, ব্যবসায় উদ্যোগে ৩টি করে এবং আইসিটিতে ১টি অ্যাসাইন করতে হবে শিক্ষার্থীদেরকে। মাউশির ওয়েবসাইটে (http://www.dshe.gov.bd) বিস্তারিত সিলেবাস পাওয়া যাচ্ছে।
রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ফৌজিয়া বলেন, একটি সুচিন্তিত সিলেবাস দেয়া হয়েছে। আমরা এটি অনুসরণ করছি। এই সিলেবাসে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা, যদি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়। তবে করোনা পরিস্থিতির শুরু থেকেই আমরা শিক্ষার্থীদের অনলাইন এবং সামাজিক যোগাযোগেরমাধ্যম ব্যবহার করে পাঠদান করেছি। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া যতটা সম্ভব অব্যাহত রাখা হয়েছে। এই সিলেবাস আমাদের কাজ আরও সহজ করবে।
মাঠপর্যায়ে নির্দেশনা : গত ২৫ অক্টোবর মাউশি থেকে এ ব্যাপারে একদফা নির্দেশনা প্রকাশ করা হয়। তাতে বলা হয়, কোভিড-১৯ সংক্রমণ রোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রত্যক্ষ শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ আছে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকাকালীন সংসদ টেলিভিশনে প্রচারিত ‘আমার ঘরে আমার স্কুল’ প্রোগ্রামের মাধ্যমে পাঠদান এবং স্কুল পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অনলাইন শ্রেণি পাঠদান ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমেও পাঠদান অব্যাহত রেখেছেন শিক্ষকরা।
এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কতটুকু শিখন ফল অর্জন করল তা মূল্যায়ন করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ মূল্যায়ন যেন তাদের ওপর কোনো মানসিক ও শারীরিক চাপ সৃষ্টি করতে না পারে, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা নিজেরাও যেন তাদের পাঠ অগ্রগতি ও দুর্বলতা সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারে। এতে মোট আটটি নির্দেশনা দিয়েছিল মাউশি। এগুলোর মধ্যে আছে- অ্যাসাইনমেন্ট প্রদান/গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধান শ্রেণিভিত্তিক কর্মসূচি নির্ধারণ এবং আলাদাভাবে প্রদান/গ্রহণের ব্যবস্থা করবেন।
এক্ষেত্রে অনলাইনের সাহায্যে/সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে প্রতিষ্ঠান প্রধান/অভিভাবক নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অ্যাসাইনমেন্ট প্রেরণ ও গ্রহণ করবেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অ্যাসাইনমেন্ট ছাড়া মূল্যায়ন সংক্রান্ত অন্য কোনো কার্যক্রম (যেমন পরীক্ষা গ্রহণ, বাড়ির কাজ দেয়া ইত্যাদি) করতে পারবেন না। আরও বলা হয়, অ্যাসাইনমেন্ট মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের দুর্বল দিক চিহ্নিত করবেন এবং পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে সেগুলোর ওপর বিশেষ নজর দিয়ে কাঙ্ক্ষিত শিখন ফল অর্জনের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
প্রতিষ্ঠান প্রধানরা শিক্ষকদের মূল্যায়নসহ অ্যাসাইনমেন্টগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা করবেন। কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে স্থানান্তরিত শিক্ষার্থীরা নিকটবর্তী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অ্যাসাইনমেন্ট সংগ্রহ/জমা প্রদান করতে পারবে। সে ক্ষেত্রে অভিভাবক/শিক্ষার্থী তার নিকটবর্তী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করবেন। নির্দেশনা বাস্তবায়নে সব আঞ্চলিক উপ-পরিচালক, জেলা শিক্ষা অফিসার, উপজেলা/থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার সমন্বয় করবেন।
প্রবাস বাংলা ভয়েস/ঢাকা/ ০২ নভেম্বের ২০২০/এমএম





