বাংলানিউজসিএ ডেস্ক :: করোনা-উত্তর বিশ্ব দুর্ভিক্ষের মুখে পড়বে- এমন পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। এতে সবচেয়ে বেশি সংকট সৃষ্টি হবে খাদ্য নিয়ে। আর দেশের ফসল উৎপাদনসহ কৃষক, কৃষি শ্রমিক ও সংশ্লিষ্টদের জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে এ খাত।
এমন আশঙ্কা থেকে সরকার স্বাস্থ্য খাতের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে কৃষিকে। আগামী তিন বছরের জন্য অর্থ বিভাগ এ খাত নিয়ে একটি মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা করেছে। এর আওতায় কৃষি খাতে ৯৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।
মধ্যমেয়াদি কৃষি খাতের বেশ কয়েকটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে পরিবেশবান্ধব ও ব্যয়সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর কর্মসূচি। এর মাধ্যমে কৃষির উৎপাদন আরও বাড়ানো হবে। যেখানে পরিবেশের কোনো ক্ষতি বা নষ্ট হবে না। পাশাপাশি ব্যয়ও হ্রাস পাবে কৃষকের। পরিকল্পনায় আছে কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণ করার বিষয়টিও।
এতে সুবিধা হবে কমসংখ্যক কৃষক অধিক পরিমাণ ফসল উৎপাদন করতে পারবেন। এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং কৃষিজমির ব্যবহার বৃদ্ধি করা হবে। বর্তমানে অনেক কৃষিজমি পড়ে আছে, ব্যবহার হচ্ছে না।
এসব জমি চাষাবাদের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি কৃষি কার্যক্রমে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিতকরণ, কৃষিতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং বংশগতি বিজ্ঞান নিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির জনপ্রিয়করণ কর্মসূচিও গ্রহণ করা হবে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে কৃষি খাতে জোর দিতে হবে। এক্ষেত্রে কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তরুণদের দিয়ে গ্রুপ তৈরি করে কৃষকের পণ্য কিনে বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে।
এছাড়া উৎসাহ জোগাতে ১০ টাকার ব্যাংক হিসাবে প্রত্যেক কৃষককে ১ হাজার টাকা উপহার দেয়া যেতে পারে। এতে কৃষক আরও বেশি উৎসাহিত হবেন। কারণ কৃষি খাতই এখন আমাদের অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হবে।
এদিকে করোনাভাইরাসের বিরূপ প্রভাবে বিপর্যস্ত অর্থনীতিতে প্রায় দেড় কোটি লোকের চাকরি হারানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে অপ্রাতিষ্ঠানিক ও শিল্প খাতে। কর্মহীন মানুষের মধ্যে অনেকে ফিরে যাবেন ‘শেকড়ে (গ্রামে)’। আর বিদ্যমান পরিস্থিতি উন্নতি না হলে আশানুরূপ বিনিয়োগ হবে না- এমন পূর্বাভাস আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর।
এতে নতুন করে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে না। পাশাপাশি শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ‘চাকার গতি’ আগের অবস্থায় ফিরে যেতেও দীর্ঘ সময়ের দরকার। এসব খাতের প্রবৃদ্ধি আগামী দিনে আরও কমতে পারে। ফলে বাধ্য হয়ে আগামী দিনে অনেকে জড়িত হবেন কৃষিতে- এমনটি মনে করছেন অর্থ ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা। এজন্য অগ্রাধিকারের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে সরকার নজর দিচ্ছে কৃষিতে।
জানা গেছে, কৃষি খাতে মধ্যমেয়াদি (২০২০-২০২৩) পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে সরকার। এর আওতায় ২০২০-২১ অর্থবছরে এ খাতে ২৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। এছাড়া আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩২ হাজার কোটি টাকা এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে।
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা ১ জুলাই থেকে শুরু হবে। এসব বরাদ্দের বাইরে আগামী অর্থবছরে কৃষি খামার যান্ত্রিকীকরণে ৩ হাজার ১৮০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু করা হবে।
এছাড়া সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি দেয়ার ঘোষণা রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষি পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় ৫ হাজার কোটি টাকা দেয়া হবে। এছাড়া আগামী অর্থবছরেও রাসায়নিক সারের বিক্রয়মূল্য বাড়ানো হবে না। এটি অপরিবর্তিত রাখা হবে।
আর অব্যাহত রাখা হবে কৃষি প্রণোদনা। এছাড়া আগামী অর্থবছরে প্রাণিসম্পদ খাতেও উন্নতি করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ খাতের উন্নয়নে তিনটি প্রযুক্তি উদ্ভাবন, তিনটি প্রযুক্তির হস্তান্তর এবং বিভিন্ন বিষয়ে ৪০টি গবেষণার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা কৃষি খাতের মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় বলা হয়, বিশ্বব্যাপী মহামারী সৃষ্টিকারী করোনার প্রভাব দেশের কৃষিতেও পড়েছে। ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী আমদানি-রফতানি ও সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
এ কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে সৃষ্ট প্রভাব মোকাবেলায় সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে। সেখানে আরও বলা হয়, করোনাভাইরাসের লড়াইয়ে কৃষিও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অন্যতম একটি খাত। কারণ কৃষি দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি।
উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে গ্রামীণ জনগণের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি এ খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে। করোনাভাইরাসের কারণে গ্রামীণ মানুষের জীবনমান বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এজন্য খাদ্য নিরাপত্তা, আয় এবং কর্মসংস্থান সুযোগের লক্ষ্যে এ খাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে কৃষি খাতে প্রায় ৩৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় আরও উল্লেখ করা হয়, বিশ্বব্যাপী করোনা দুর্যোগের কারণে খাদ্য উৎপাদন, আমদানি-রফতানি ও সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। সরকার এ বিষয়ে অত্যন্ত সজাগ।
দেশে পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ নিশ্চিত করতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। আমন থেকে ৭ লাখ ৯৮ হাজার টন সংগ্রহ করা হবে। চলতি বোরো ফসল থেকে ৮ লাখ টন ধান এবং ১১ লাখ ৫০ হাজার টন চাল সংগ্রহ করা হবে, যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ।
বাংলানিউজসিএ/ঢাকা/ ২১ জুন ২০২০ /এমএম





