Menu

 

প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক :: আমাদের শরীর জ্বালানি হিসাবে প্রধানত দুটি জিনিস ব্যবহার করতে পারে- গ্লুকোজ ও কিটোন বডি। স্বাভাবিক অবস্থায় শক্তি বা ক্যালরির মূল উৎস থাকে গ্লুকোজে, যা আসে শর্করা থেকে। দেহকে শর্করা সাপ্লাই দেওয়া বন্ধ করে দিলে তা চর্বি ভেঙে ভেঙে কিটোন বডি তৈরি করে জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করতে শুরু করে। কেউ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ক্যালরি গ্রহণ করলে তা দেহে চর্বি আকারে জমা হয় ও তার শারীরিক ওজন বাড়ে।

কিটো ডায়েটের মূলনীতি হলো দেহে শর্করা সাপ্লাই কম দিয়ে তেল চর্বি সাপ্লাই করা, অর্থাৎ দেহকে কিটোন বডি থেকে (গ্লুকোজের পরিবর্তে) শক্তি সংগ্রহের অভ্যাস করানো। যেহেতু কিটোন বডি চর্বি থেকে আসে, সুতরাং খাদ্যের এবং দেহের চর্বি গলিয়ে কিটোন বডি তৈরি হয়ে হয়ে দেহের ক্যালরি চাহিদা মেটাতে থাকবে; ফলে ওজনও কমে যাবে-এই হলো আশা।

বর্তমান সময়ে দ্রুত ওজন কমানোর ক্ষেত্রে এ ডায়েট জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের দৈনন্দিন শক্তির বেশিরভাগই আসে কার্বোহাইড্রেট থেকে। বাকি ১৫-২০ শতাংশ প্রোটিন এবং ২৫-৩০ শতাংশ পূরণ হয় ফ্যাট থেকে। তবে কিটো ডায়েটে এ মাত্রা ভিন্ন। একজন ব্যক্তি যখন কিটো ডায়েট করেন, তখন তিনি দৈনন্দিন ৭৫ শতাংশ গ্রহণ করে ফ্যাট থেকে, ২০ শতাংশ প্রোটিন বা আমিষের মাধ্যমে এবং বাকি মাত্র ৫ শতাংশ পুষ্টি গ্রহণ করে কার্বোহাইডেট-শর্করা থেকে। এমন ধরনের পুষ্টি তালিকা সবার জন্য কল্যাণকর নয়।

কিটো ডায়েট মূলত তৈরি করা হয়েছিল এপিলেপসি বা মৃগী রোগীদের জন্য। মৃগী রোগীদের পুষ্টি চাহিদা মেটানোর জন্য এ ডায়েট চার্টে যুক্ত করা হয় উচ্চ ফ্যাট, অধিক প্রোটিন এবং অল্প কার্বোহাইড্রেড। পরবর্তী সময়ে আরও গবেষণার পর এ ডায়েট মৃগী রোগীদের জন্যও বাতিল করা হয়।

কিটো ডায়েট করার ফলে হয়তো সাময়িকভাবে আপনার ওজন হ্রাস হচ্ছে এবং শরীর থেকে অতিরিক্ত চর্বি ঝরে গিয়ে কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন এ ডায়েট অনুসরণ করলে রক্তের সাধারণ পিএইচ লেভেল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে রক্তে প্রাথমিকভাবে কিটোসিস এবং পরবর্তী সময়ে কিটোএসিডোসিস দেখা দেয়।

প্রাথমিকভাবে তেমন কোনো সমস্যা না হলেও কয়েক সপ্তাহ পর দুর্বল বোধ করা, মাথাব্যথা, শরীর কাঁপা, বুক ধড়ফড়, বমি বমি ভাবসহ কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা এবং ভুলে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। সেইসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হ্রাস, মেজাজ খিটখিটে বা হঠাৎ রেগে যাওয়া, সারা দিন পানির পিপাসা পাওয়াসহ ইত্যাদি পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।

অধিক চর্বি ও প্রোটিন গ্রহণের কারণে ডায়রিয়া হওয়ার আশঙ্কা যেমন থাকে অপর দিকে কিটো ডায়েটে ফাইবারের পরিমাণ কম থাকায় কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা দেখা দেওয়াটাও স্বাভাবিক। এ ছাড়া গর্ভবতী নারী, দুগ্ধদানকারী মা, হরমোনাল ইমব্যালেন্স আছে, আর্থ্রাইটিসের রোগী এমন ব্যক্তিদের জন্য কিটো ডায়েট অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। না জেনে বাড়ন্ত বয়সে এ ডায়েট অনুসরণ করলে অনেক ক্ষেত্রেই ঋতুস্রাবের সমস্যা হয় এবং পরবর্তী সময়ে বাচ্চা ধারণ ক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে। এ ছাড়া প্যানাক্রিয়াসের জটিলতা, হজমশক্তি কমে যাওয়া, ত্বকের উজ্জ্বলতা নষ্ট হয়ে যাওয়া, চুল পড়ে যাওয়ার মতো সমস্যার কারণ হতে পারে কিটো ডায়েট।

তাই না জেনে কোনো বয়সেই কারও জন্য কিটো ডায়েট অনুসরণ করা উচিত নয়। বর্তমানে অনেকেই শুধু ফেসবুক ইউটিউবের তথ্যের ওপর নির্ভর করে নিজেদের জন্য এ ডায়েট প্রয়োগ করতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। নিজের শরীরের চাহিদা না জেনে কিটো ডায়েট করা একটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের থেকে কম কিছু নয়। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত সুষম খাদ্য গ্রহণ ও শরীরচর্চা করলে সুস্বাস্থ্য লাভ করা কঠিন কিছু নয়।

লেখক: মেডিসিন ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ, হেলথকেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লি., শ্যামলী, ঢাকা

প্রবাস বাংলা ভয়েস /ঢাকা/ ১৬ সেপ্টেম্বর  ২০২৫ /এমএম


Array